জেলা পর্যায়ে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের গণভোট বিষয়ক কর্মশালা
সংবিধানের দুর্বলতা দূর করতেই জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট : বিভাগীয় কমিশনার
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:৫৮:৩৭ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেছেন, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এদেশটি আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের কাছে আমানত হিসেবে রেখে গেছেন। দেশগঠনের কালে যে লক্ষ্য আমাদের পূর্বপুরুষদের হৃদয়ে ছিল- একটি কল্যাণরাষ্ট্র হবে, যে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের অধিকার পুরণ করবে, বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ হবে, শোষণ-বঞ্চনা, নির্যাতন-নিপীড়ন থাকবে না, সমানভাবে সকলের অধিকার থাকবে, সবাই আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকবে, সেটা গত ৫৪ বছরেও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তিনি বলেন, এই অধিকারগুলোর জন্যই এদেশের মানুষ বারবার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, রাজপথে রক্ত দিয়েছে, শাহাদত বরণ করেছে। কিন্তু এতকিছুর পরও রাষ্ট্রগঠনের অভীষ্ট লক্ষ্য ও প্রত্যাশা যেটা ছিল, সেটা পুরণ হয়নি। অথচ সেই প্রত্যাশা পুরণের দায়িত্ব ছিল শাসকশ্রেণীর। কারণ তাদের হাতেই ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তারা জনপ্রত্যাশার কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের প্রত্যাশা পুরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে শোষণ-লুন্ঠন-দুর্নীতি ও অপশাসনের নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) নগরীর ইসলামিক ফাউন্ডেশন অডিটোরিয়ামে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ক জেলা পর্যায়ে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী আরও বলেন, আগামীর বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত হবেন, জাতি তাদেরকে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল দেখতে চায়। ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য’ এই কনসেপ্টই দায়িত্বশীলতা শিখিয়ে দেয়। ফলে জনগণের শাসক যারা নির্বাচিত হবেন, তাদেরকে আমরা রাজাও বলব না, সম্রাটও বলব না- তারা হবেন জনগণের সরকার, দায়িত্বশীল সরকার। তাদের দায়িত্ব হলো সবকিছু জনস্বার্থে ও জনকল্যাণে করা। এজন্য আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি সংবিধান রয়েছে এবং শাসন পরিচালনার জন্য সব রকমের আইনকানুন-বিধিবিধান রয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতাকে সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার জন্য রাষ্ট্রপরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষমতা সংবিধানে বন্টন করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত ৫৪ বছরে জাতির দুর্ভাগ্য হলো- জাতি সবকিছুই রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীকে দিয়েছে, অথচ তারা জনস্বার্থ ও জনকল্যাণের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের আত্মউন্নয়নে ব্যস্ত থেকেছে। সে জন্য জনগণ হয়ে গেছে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার অথবা প্লুরাল নাম্বার। তাদের দেখার কেউ নাই। সবকিছু ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ অথবা গোষ্ঠিস্বার্থে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা ভাঙতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানে এক ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছিল। সংবিধানের এই দুর্বলতা দূর করতেই জুলাই সনদ প্রণয়ন এবং গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে জুলাই সনদ তৈরি করেছে, যেখানে সংবিধানে সুস্পষ্ট কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে- যেগুলো বাস্তবায়িত হলে একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব থেকে রাষ্ট্র বেরিয়ে এসে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হতে পারে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আশরাফুর রহমান।
ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি সিলেটের উপপরিচালক মো. আনোয়ারুল কাদিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলার ইমাম-মুয়াজ্জিনরা অংশ নেন।
প্রধান প্রশিক্ষকের বক্তব্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি যে গণভোট হবে, সেই গণভোটের বিষয়বস্তু ইতোমধ্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে হ্যাঁ এবং না- দুটি অপশন থাকবে। আমরা ইমাম ও খতিবদের মাধ্যমে জনগণের কাছে এই বার্তা পৌছাতে চাচ্ছি যে, জনগণের বিবেকের কাছে আপনারা এই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরুন যে, হ্যাঁ ভোটে সিল মারলে আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে, আর না-তে সিল দিলে কী হবে।
তিনি বলেন, ইমাম ও খতিবরা হলেন সত্যের সাক্ষ্যদাতা। তারা মিম্বরে বসে দৃপ্তকন্ঠে সত্যের সাক্ষ্য তুলে ধরবেন। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি কোনো প্রকার বাধা প্রদান অথবা হুমকি দেয়- তাহলে সাথে সাথে জেলার পুলিশ সুসারকে জানাবেন। মনে রাখবেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা এদেশে ভেসে আসে নাই। এরা এই মাটির সন্তান।



