আল বিদা মাহে রমজান- মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মার্চ ২০২৬, ৫:৩৫:০২ অপরাহ্ন
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের উৎসবমুখর মাস রমজানুল মোবারকের আজ ২৩ তম দিন। বনি আদমের মধ্যে মানবীয় উন্নত স্বভাব-চরিত্র তৈরির মাধ্যমে আল্লাহর পছন্দের প্রতিনিধি বানাবার যতসব কলাকৌশল, কর্মপদ্ধতি রয়েছে তা সবই এ রমজানে আল্লাহ তায়া’লা রেখেছেন। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানব জীবনের নেতিবাচক দিকসমূহ – যেমন লোভ- লালসা, কামনা-বাসনা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রী কাতরতা, গীবত চর্চা, পরনিন্দা, অন্যের হক আত্মসাৎ করা, সুদ, ঘুষ, মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা, জুলুম জবরদস্তি, মিথ্যা মামলা দেয়া, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ সকল প্রকার পাশবিক প্রবৃত্তি দমনের জন্য রুহানী ও আত্মশক্তি অর্জিত হয়। ফলে ব্যক্তি মন মানসে ও সমাজ জীবনে কল্যাণ, শান্তি, স্থিতিশীলতা, পবিত্রতা ও আত্মশুদ্ধির ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়।
সম্মানিত সিয়াম পালনকারী! আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, মানুষকে পাপ ও অপরাধ প্রবণতার দিকে যে জিনিসগুলো ঠেলে দেয় তন্মধ্যে অন্যতম হলো -(ক) শয়তান (খ) কু-প্রবৃত্তি (গ) আল্লাহদ্রোহী সমাজব্যবস্থা।
আল্লাহ তায়া’লা মানবসমাজকে অপরাধমুক্ত রাখার জন্য বিধান দিয়েছেন দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে’। (আনকাবুত ৪৫) সেজন্য এটিকে প্রাত্যহিক পাঁচবার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে লক্ষ্য হলো তাক্বওয়ার অধিকারী মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তাক্বওয়া মূলত: নিজের জন্য নিজেই প্রহরী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের সাধনায় এ তাক্বওয়া ভিত্তিক সমাজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই অপরাধ প্রিয়, বর্বর সে জাহিলী সমাজ পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক শান্তি প্রিয় সুন্দর সোনালী সমাজে পরিণত হয়েছিল। পুলিশ, প্রহরী, গুপ্তচর, গোয়েন্দা নিয়োগ দিয়ে যে সমাজ অপরাধমুক্ত করা একেবারেই অসম্ভব ছিল, শুধু তাক্বওয়া নামীয় মহাশক্তির বলে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অপরাধমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছিলেন। সিয়ামের মূল লক্ষ্যই হলো মানবমনের মুকুরে তাক্বওয়ার বীজ বপন করার মাধ্যমে এমন এক আত্মশক্তি সৃষ্টি করা যা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। যার ফলে ক্ষুৎপিপাসায় ওষ্ঠাগত প্রায় সিয়াম পালনকারী ব্যক্তি গোপনে পৃথিবীর সকল চোখকে ফাঁকি দিয়ে যথার্থ সুযোগ লাভ করেও পানি ও খাদ্যের দিকে হাত বাড়ায় না। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সুখ শান্তি ও স্বাদকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আখিরাতের শাস্তি ও আল্লাহর দরবারের জবাবদিহিতার জন্য সার্বক্ষণিক সন্ত্রস্ত ও ভীত থাকবে। সিয়ামের মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে সুশৃঙ্খল করার অনুশীলন হয়।
বোখারী শরীফে মা আয়শা (রা) থেকে বর্ণিত ‘তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ)-এর অবর্তমানে এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মুসিবত অবতীর্ণ হয় তা পেট পুরে খাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল। কেননা মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি হলে শরীর সতেজ হয়ে ওঠে। আত্মা সংকীর্ণ হয়। প্রবৃত্তি বল্গাহীন রূপ পরিগ্রহ করে’। অপরাধ সংঘটিত যাতে না হয়, সিয়াম সে পথ বন্ধ করে দেয়। নিয়ন্ত্রিত যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তির ক্ষেত্রে সিয়াম বড় ভূমিকা পালন করে। অবৈধ যৌনচর্চার পথ রূদ্ধ করে একটি সুশীল ও শ্লীল সমাজ প্রতিষ্ঠিত করাই হচ্ছে সিয়ামের মূল কাজ। ধৈর্য সৃষ্টি, ধৈর্য শক্তি বৃদ্ধির জন্য সিয়ামের ভূমিকা সর্বাধিক কার্যকর। অপরাধ সংঘটিত করতে ধৈর্যহীনতা বহুলাংশে দায়ী। প্রতিশোধ নেয়া ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সমুহ শক্তি, সুযোগ থাকার পরও শুধু সিয়ামের সম্মানে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, মারামারি, ঝগড়াঝাঁটি পরিহার করার প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জিত হয়। সত্যবলার অনুশীলন, মিথ্যা পরিহার করার প্র্যাকটিস এ মাসে বেশি হয় । অবশেষে এ কথা বলা যায় যে, অপরাধ মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যে সমস্ত গুণ, বৈশিষ্ট্য, প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন প্রয়োজন সিয়ামই হচ্ছে ঐ সমস্ত প্রশিক্ষণের এক বলিষ্ঠ প্রয়াস। আল্লাহ তায়া’লা আমাদেরকে অপরাধ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে সিয়াম সাধনার তাওফীক দিন। আমীন।



