বিজ্ঞান মেলা
খুদে বিজ্ঞানীদের নানা উদ্ভাবন, নজরকাড়া প্রদর্শনী
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ২:৫১:৪৩ অপরাহ্ন
ফায়যুর রাহমান :
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নিজেদের শামিল করে বড় সম্ভাবনার কথা জানিয়ে দিল মাদরাসার খুদে বিজ্ঞানীরা| তারা দেখাল বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানোর যন্ত্র, স্মার্ট ফার্মিং সিস্টেম, অটোমেটিক স্ট্রিট লাইট, প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি উদ্ভাবনের কৌশল, লেজার সিকিউরিটি সিস্টেম, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পাওয়ার জেনারেটর, সোলার সিস্টেম, জোয়ার-ভাটার নদীর জন্য হাইড্রোলিক ব্রিজের মত প্রকল্প| তাদের চমকপ্রদ সব উদ্ভাবন বড়দেরও ভাবনার খোরাক যোগাল|
নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় গতকাল বসেছিল খুদে বিজ্ঞানীদের এ মিলনমেলা| বিজ্ঞানের নানা শাখার ১০০টি প্রকল্প স্থান পায় এই মেলায়|
ঘড়ির কাটায় তখন ঠিক ১২টা| মেলায় ঢুকেই দেখা গেল প্রতিটি স্টলের সামনেই কৌতূহলীদের ভিড়| বিভিন্ন বয়সীরা ঘুরে দেখছেন স্টল| তাদেরকে উদ্ভাবনের খুঁটিনাটি বুঝিয়ে বলছেন খুদে বিজ্ঞানীরা| এরপরও প্রশ্ন| দিতে হচ্ছিল সব প্রশ্নের জবাব| তবুও ক্লান্তি নেই; হাসি হাসি মুখ|

অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তামজিদ, জামিল ও হুজাইফা উদ্ভাবন করেছে হাইড্রোলিক ব্রিজ| এটা কীভাবে কাজ করবে? তামজিদ বলে, ‘জোয়ার-ভাটায় তো নদীতে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়, তাই হাইড্রোলিক শক্তি ব্যবহার করে আমরা এর নকশা প্রস্তুত করেছি| পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে হাইড্রোলিক শক্তি ব্যবহার করে ব্রিজটির একাংশ উপর দিকে উঠে যাবে, ফলে নৌযান এর নিচ দিয়ে চলতে পারবে| নৌকো বা জাহাজ চলে গেলে ব্রিজটি আবার আগে অবস্থানে ফিরে যাবে|’
হুজাইফা বলে, ‘প্যাসকেলের সূত্র ব্যবহার করে ব্রিজের মূল অংশ বাতাসের চাপ ব্যবহার করে মডেলে খোলা ও বন্ধ করা হবে| হাইড্রোলিক ফ্লুইড ও বাইরের শক্তি দিয়ে বড় স্কেলে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে|’
কত টাকা লাগবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে? সিঙ্গাড়ায় কামড় বসাতে বসাতে জামিলের উত্তর- ‘দুই হাজার কোটি টাকা হলেই এটা বাস্তবায়ন সম্ভব|’

স্মার্ট ফার্মিং সিস্টেম উদ্ভাবন করেছে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাইফুল্লাহ আল মহসিন| তার সহযোগী মেহরাব আহমদ ও সোহাগ| সাইফুল্লাহ জানাল, কৃষকের ফসল রক্ষায় তার উদ্ভাবন কাজ দেবে| খেতের চারপাশের বেড়ায় বিশেষ পদ্ধতিতে সংযোগ লাইন স্থাপন করতে হবে| যখন গরু-ছাগল বা চোর খেতে ঢুকতে চাইবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃষকের কাছে সিগন্যাল চলে যাবে|

অটোমেটিক স্ট্রিট লাইট উদ্ভাবন করেছে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইসহাক, তাওহিদ ও তাহমিদ| তারা জানাল, ‘রাতে শহরের রাস্তায় সার্বক্ষণিক লাইট জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ অপচয়ের মানে হয় না| অটোমেটিক স্ট্রিট লাইট বাস্তবায়ন করলে বিদ্যুতের সাশ্রয় ঘটিয়ে নিরাপত্তা বজায় রাখা যাবে| রাতের আঁধারে গাড়ি বা মানুষ হেঁটে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ট্রিট লাইট জ্বলে উঠবে|’

লেজার সিকিউরিটি সিস্টেম নিয়ে এসেছে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সায়েম, ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী রকিবুল ও শফিকুল| তারা জানাল, ব্যাংক ও বাসা-বাড়ির নিরাপত্তায় এই সিস্টেম কাজ দেবে| নিরাপত্তা প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অননুমোদিত কেউ এসে ঢুকে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে সিগন্যাল চলে যাবে|

‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার’ নিয়ে হাজির হয়েছে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরাফাত ও রোমান| তারা জানাল, বিদ্যুৎ চলে গেলে সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে| তাদের উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে সূর্যের তাপ ও বাতাসের ঘুর্ণন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে| টারবাইনের ঘুর্ণনে যে শক্তি সৃষ্টি হবে, তা জমিয়ে লোডশেডিংয়ের সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে|
প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি উদ্ভাবনের কৌশল নিয়ে হাজির হয়েছে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী খালেদ সাইফুল্লাহ, হোসাইন আহমদ ও আবু তালহা| তারা জানাল, নষ্ট প্লাস্টিক ও পলিথিন কুঁড়িয়ে বিকল্প জ্বালানি উদ্ভাবন সম্ভব|

এ বিজ্ঞান মেলায় ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা একশ’টির অধিক প্রকল্প উপস্থাপন করে| এসব প্রকল্পের মধ্যে গ্রিণ সিটি নামের পরিকল্পিত মডেল শহর, বর্জ্য পদার্থ দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিকল্পিত নগরায়ন, স্মাট কৃষি ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার্য পানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও কলকারখানায় উৎপাদিত কার্বনকে হ্রাস করে গ্রিণহাউজ প্রভাব কমানো অন্যতম|
জানতে চাইলে পাঠানটুলা জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা লুৎফুর রহমান সিলেটের ডাককে বলেন, ‘আগামী দিনে বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন ও এর অনন্যতা উপলব্ধি করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়াই এ মেলার উদ্দেশ্য|’ তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানের এসব নতুন নতুন প্রকল্প উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখিয়েছে যে, এই মেধাবী প্রজন্মই একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে|’

জামেয়া পরিচালনাকারী সংস্থা দি সিলেট ইসলামিক সোসাইটির সেক্রেটারি জাহেদুর রহমান চৌধুরী বলেন, আগামীর বিজ্ঞানমনস্ক জাতি তৈরিতে এই বিজ্ঞান মেলা সত্যিই আশাব্যঞ্জক| আদর্শ ও শিক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার আরও বাড়াতে হবে| সরকারি প্রণোদনা পেলে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা গবেষণায় অবদান রাখতে সক্ষম হবে|
মেলা ঘুরে দেখে অভিভূত হন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানাও| তিনি শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত প্রকল্প ও তাদের উদ্ভাবনী শক্তির প্রশংসা করে বলেন, এ ধরণের মেলা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে অনেকটাই সহায়ক|



