ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত সিলেট
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১:১৩:০৪ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
টেকটোনিক প্লেটের বাউন্ডারি সিলেটের কাছাকাছি থাকায় এ অঞ্চল ভূমিকম্পের সবচাইতে বেশী ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি ডাউকি ফল্ট, সিলেট ফল্ট, ত্রিপুরা ফল্টের অবস্থানও সিলেটের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার ঝুঁকির কারণ বেশী বলে মন্তব্য করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমদ। তার মতে, ডাউকি ফল্টের ভিতরে কিংবা বাইরে ভূ-কম্পন অনুভূত হলে সিলেটের জন্য তা হবে বিপজ্জনক। নরসিংদির মাধবদীতে গত শুক্রবার ৫.৭ মাত্রার ভূ-কম্পন অনুভূত। এতে কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু ও অর্ধ সহস্রাধিক লোক আহত হয়েছেন। রাজধানীর আগারগাঁও ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ৩০ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পে নরসিংদী ছাড়াও ঢাকা, গাজিপুর ও সিলেট অঞ্চলসহ দেশের অধিকাংশ এলাকা কেঁপে উঠে। এ অবস্থায় ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত সিলেট এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সিলেট নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর প্রাথমিক সার্ভে হলেও ডিটেইল(পুরোপুরি) সার্ভে এখনো হয়নি। নগরীতে পর্যাপ্ত খালি জায়গারও অভাব রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ড. মুশতাককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলের মানুষ আর যাই হোক বন্যা নিয়ে বেশী মাতামাতি কিংবা চিন্তা করে বেশী। কিন্তু, ডাউকি ফল্ট যে আমাদের একেবারে কাছাকাছি তা নিয়ে একবারও চিন্তা করি না। শুধু ভূমিকম্প হলে কিছুদিন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে তা আবার থেমে যায়।
এ প্রসঙ্গে ড. মুশতাক বলেন, ভূমিকম্প সিলেটের জন্য একটি নিয়মিত আইটেম হওয়া উচিত। এজন্য একটি প্রেসার গ্রুপ তৈরি করতে হবে। যারা কিনা নতুন ভবনের ডিজাইন থেকে শুরু করে ভবন বানানোর পুরো বিষয়টি মনিটরিং করবে। ঝুঁকিতে থাকা সিলেটে ভূমিকম্পের ক্ষয়-ক্ষতি কমাতে নতুন ভবনের ডিজাইন থার্ড পার্টি (তৃতীয় পক্ষ)-কে দিয়ে ভেটিং করানোর পরামর্শ তার। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন-এরই মধ্যে ভেটিং পদ্ধতি চালু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, সিসিক এলাকায়ও অনুরুপ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। কুমিল্লা থেকে অনেক ভবনের অনুমোদনের কাগজপত্র শাবিপ্রবিতে পাঠানো হয় বলেও জানান তিনি। অনুমোদনের সময় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক)-এর হয়তো স্ট্রাকচারাল ডিজাইন চেক করার লোকের সংকট থাকতে পারে। থার্ড পার্টি দিয়ে ভেটিং করালে সিটি কর্পোরেশন ফি নির্ধারণ করে দিতে পারে। এজন্য সিসিকের কোন বাড়তি অর্থও খরচ হবে না। বিপরীতে সংশ্লিষ্ট পার্টি একটি সার্র্টিফিকেট পাবে। তার আশংকা ডাউকি ফল্টে যে কোন সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে। মাধবদীর এক্সেনশনও সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত বলে জানান এ অধ্যাপক।
ড. মুশতাক বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদেরকে অবশ্যই কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। পর্যাপ্ত খালি জায়গা না রেখে ভবন নির্মাণ করলে ভূমিকম্পে উদ্ধার কাজ চালানো যাবে না-মানুষকে এ বিষয়টি বোঝাতে হবে; তাদেরকে মোটিভেট করতে হবে।
সিলেটের নিচে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সাধিত হবে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি
শাবিপ্রবি’র সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অপর অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম ঝুঁকি এড়াতে সিলেট নগরীর সকল বাসা-বাড়ি নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণের তাগিদ দেন। সিলেটের নিচে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের সতর্কতার ওপর জোর দেন।
ভূমিকম্পের ক্ষয়-ক্ষতিরোধে সিলেট নগরীর বিল্ডিংগুলোর কোডিং ডাটাবেজ তৈরি, ইভাকুয়েটিং ম্যাপিং (পর্যাপ্ত খালি জায়গার ব্যবস্থা), পর্যাপ্ত ভলান্টিয়ার তৈরি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার তাগিদ দেন। তিনি জানান, ২০২১ সালে সিসিকের উদ্যোগে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাঙ্গা হয়েছিল। বাকিগুলোর বিষয়ে এখনো কোন আপডেট নেই। সিলেটের নতুন ভবনগুলো অনেকটা বিল্ডিং কোড অনুসরণেই নির্মিত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, শংকা পুরাতন ভবন নিয়ে। এসব ভবন অনেক আগের তৈরী। এজন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
তুরস্কের কয়েক বছর আগের ভূমিকম্পের বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, সেখানে মান্ধাতার আমলের বেশীরভাগ ভবনের ক্ষয়-ক্ষতি বেশী সাধিত হয়েছে।
আটকে আছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জরিপ
সিসিকের একজন প্রকৌশলীকে থার্ড পার্টি নিয়োগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬ এবং বিএনবিসি’র রুলস-রেগুলেশনস মেনেই সিলেট নগরীতে নতুন বিল্ডিং নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। বর্তমানে সিসিকের তালিকাভুক্ত প্রকৌশলী ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির স্বাক্ষরে মূলত নতুন ভবন অনুমোদনের আবেদন করা হয়। আবেদিত ভবনগুলো ‘ভূমিকম্প প্রতিরোধক’ মর্মে সংশ্লিষ্টরা লিখে দেন। এরপরই ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়।
সিসিকের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে নগরীতে ২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এর মধ্যে শাবিপ্রবি’র প্রকৌশলীরা ৯টি ভবনে প্রাথমিক সার্ভে (জরিপ) করে এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পেয়েছেন। এ ৯টি ভবনই ব্যক্তিমালিকানাধীন জানিয়ে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ সার্ভে চালানোর জন্য এসব ভবন মালিককে অর্থায়ন যোগানের তাগাদা দেয়া হলেও তারা তাতে রাজি হয়নি। এ কারণে এটি আটকে আছে বলে জানায় ওই সূত্র।
জরিপের সাথে সংশ্লিষ্ট শাবির অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমদ বলেন, তাদের মাধ্যমে মূলত কয়েকটি ভবনের প্রিলিমিনারি সার্ভে হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি ভবনকে রেট্রোফিটিং(নির্মিত স্ট্রাকচারের ক্যাপাসিটি বাড়ানো) করতে হবে। প্রতিটি কম্পোনেন্ট ধরে ধরে এসব ভবনের ডিটেইলড অ্যাসেসম্যান্ট করার তাগিদ এ অধ্যাপকের।
সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি তালিকা তাদের কাছে রয়েছে। আজ সোমবার বিকেল ৩টায় সিসিকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।




