সিলেটে বহুতল ভবনের লিফট ব্যবহার কতটা ঝুঁকিমুক্ত?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ৪:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন
আহমাদ সেলিম :
সিলেট নগরীতে অধিকাংশ বহুতল ভবনে লিফট রয়েছে। এ সকল লিফটের ভেতর দীর্ঘ সময় আটকে থাকা, দরজা বার বার খুলে যাওয়া অথবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাবার মতো ঘটনা ঘটছে। কিন্তু, বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। আবার কখনো যে ঘটবে না, তারও নিশ্চয়তা নেই। সিলেটসহ সারাদেশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর বহুতল ভবনের লিফট ব্যবহারের বিষয়ে মানুষ কতটা সচেতন-এ নিয়ে সচেতন মহলে নানা আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) ভেতর সরকারি-বেসরকারি-ব্যক্তি মালিকানাধীন বহু হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে-যেগুলোতে লিফটের সুবিধা রয়েছে। আর সুউচ্চ ভবনে উঠানামার কাজে লিফ্টের কোন বিকল্পও নেই। কিন্তু সরকারি- বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ভবনে যে লিফ্টগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোতে প্রায় সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকার পরও দীর্ঘ সময় লিফ্টের ভেতর আটকে থাকারও অভিযোগ মেলে।
একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, সিলেট নগরীর ভেতর লিফ্ট ব্যবহৃত হচ্ছে-এমন ভবনের সংখ্যা শতাধিক। সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে পুরাতন এবং নতুন ভবনে অন্তত ২০টিরও অধিক লিফ্ট রয়েছে। নতুন এবং পুরাতন ভবনে সকাল থেকে রাত অবধি কয়েক হাজার মানুষ লিফ্ট ব্যবহার করেন। রোগীদের অতিরিক্ত চাপের ফলে কিছু লিফট প্রায়শ অকেঁজো হয়ে পড়ে। যেগুলো ভালো অবস্থায় রয়েছে, সেগুলো কতটা নিরাপদ, কতটা ঝুঁকিমুক্ত-এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নগরীর ভেতর অন্তত শতাধিক বেসরকারি পর্যায়ের হাসপাতাল রয়েছে। আছে একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যেগুলো ক্লিনিকের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারি, রোগী, রোগীর স্বজনদের সারাক্ষণ সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়াও অভিজাত বাণিজ্যিক ভবনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিফ্ট ব্যবহার হয়ে থাকে জিন্দাবাজার এবং আশপাশ এলাকাতে। শুধু জিন্দাবাজার এলাকায় লিফট আছে, এমন ভবনের সংখ্যা অন্তত পনের থেকে বিশটি হবে। বাণিজ্যিক থাকায় এই
বিপনিবিতানগুলোতে প্রতিনিয়ত মানুষকে লিফট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ সকল ভবনে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ঘটনা না ঘটলেও ঘন ঘন শোনা যায় ত্রুটির খবর।
প্রতিদিনই কোনো না কোনো সময় বিপত্তি ঘটছে এই লিফটটিতে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে উপরে ওঠার সময় হঠাৎ কেঁপে বন্ধ হয়ে যায়। দশ থেকে বিশ মিনিট ওই অবস্থায় লিফ্টে আটকে থাকতে হয় অনেককে-এ রকম অভিযোগ আসে প্রায় সময়। অনেক ভবনে লিফ্ট অপারেটর থাকলেও তারা নিজেরাও লিফট পরিচালনায় ভয়ে ঘাবড়ে যান, হিমশিম খান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিন্দাবাজারের একটি ভবনের লিফট অপারেটর জানান, লোডশেডিং হলে কখনো কখনো ১৫-২০ মিনিট লিফ্টের ভেতরে বসে থাকতে হয়। অনেক সময় দরজা অটো খুলে যায় বার বার। বড় দুর্ঘটনা না ঘটলেও এ ধরনের ঘটনা আগামীতে আরও বড় বিপর্যয়ের আভাস দিচ্ছে বলে আশঙ্কা অনেকের।
সিলেট ওসমানী হাসপাতালের একাধিক বিভাগের চিকিৎসকদের ভাষ্য, ‘সকালে ভালো চললে বিকেলে সমস্যা দেখা দেয়। মানুষও সচেতন নয়। কেউ একতলা থেকে দুতলায় যাবে, সেখানেও তিনি লিফটের জন্য অপেক্ষা করেন। তবে হাসপাতালের পুরনো ভবনের লিফটগুলো বেশি পুরনো।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিন্দাবাজার এলাকার একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের ব্যবসায়ীরা বলেন, অনেক বিপনিবিতানের লিফটগুলোতে ত্রুটি রয়েছে। লিফটগুলোর বয়স বিশ বছর পেরিয়ে গেছে। তারা বলেন, অটো জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সংযোগ হতে বিলম্ব হয়। এ অবস্থায় শিশু সন্তান নিয়ে লিফটে ওঠা অভিভাবকরা বেশি ভয় পান। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলো এই সমস্যাগুলো মেনে নিতে পারেন না।
অন্তত বিশ বছরের পুরনো জিন্দাবাজারের একটি বাণিজ্যিক ভবনের একজন ব্যবসায়ী বলেন, গত দুই মাস ধরে আমাদের ভবনের ভেতরের লিফ্টটিও সমস্যা করছে। প্রায় সময় বন্ধ থাকে। তবে দুর্ঘটনা ঘটেনি।
আল হামরা শপিং সিটির ব্যবসায়ী ইর্শাদ আলী বলেন, ‘বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটার পর সবাই নড়ে বসে। কিন্তু এর আগে সচেতন হয় না। নিয়ম হলো লিফ্টগুলো নিয়মিত সার্ভিসিং করানো। কিন্তু, বছরে একবারও আমরা সেটি দেখি না।’
লিফটের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা হলে ব্লু-ওয়াটার শপিং সিটির জেনারেল ম্যানেজার মলয় দত্ত মিঠু বলেন, লিফট তদারকির জন্য আমাদের মার্কেটে সার্বক্ষণিক লোক রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা সবসময় সচেতন। তবে আমাদের মতো সেবাগ্রহিতাদেরও সচেতন হওয়া দরকার। অনেক সময় দেখা যায়- একজন যাবে নিচে, কিন্তু তিনি নিচে-উপরে দুই বাটনেই কল দিয়ে রেখেছেন। আবার অনেক সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সাথে সাথে আবার যখন বিদ্যুৎ চলে আসে তখনও লিফ্ট কিছুটা স্বাভাবিক গতি হারায়।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, লিফটের প্রাণ হচ্ছে সেন্সর। কিন্তু ভবনে যখন নিম্নমানের লিফট লাগানো হয়, তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। অনেকে আবার মাসের পর মাস সার্ভিসিং করেন না।’
সার্বিক বিষয়ে সিলেট ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ডি ডি) মো. শফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, ছয় মাস অন্তর অন্তর সার্ভিসিং করা দরকার। যারা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন, যারা বিদ্যুৎ লাইনের দায়িত্বে আছেন তারা কতটা দক্ষ সেটাও একটা বিষয়। পুরাতন লিফ্ট হলে সেগুলোর সার্ভিসিং করা জরুরি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সিলেটের জনৈক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লিফটগুলো ইন্সটল (চালু) করার পর দীর্ঘদিন ধরে সার্ভিসিং করা হয় না। ফলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। আর এই সমসাগুলো আমাদের ইঙ্গিত দেয় সচেতনতার। কারণ ছোট ছোট সমস্যাগুলো একসময় বড় আকার ধারণ করে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। নইলে বিপদ বয়ে আনতে পারে চোখের পলকে।




