ওসমানী মেডিকেল কলেজে ‘হেপাটোবিলিয়ারি প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট’ বিষয়ক বিশেষ সেমিনার
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:০৬:৫৮ অপরাহ্ন
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে হেপাটোবিলিয়ারি ও প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি এবং লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মৌলিক বিষয় নিয়ে বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় কলেজের লেকচার গ্যালারি-১-এ ‘Learn from a Legend’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে বাংলাদেশের প্রখ্যাত হেপাটোবিলিয়ারি প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী উপস্থিত ছিলেন। তিনি চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সামনে আধুনিক লিভার সার্জারি (লিভার রিসেকশন), বাইল ডাক্ট রিকনস্ট্রাকশন, প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি (রিসেকসন) এবং লিভার ট্রান্সপ্লান্টের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা তৌফিক আহমেদ, সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. খালেদ মাহমুদ, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোস্তাক উদ্দিন আহমেদসহ সার্জারি ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ। এছাড়া মিড-লেভেল চিকিৎসক এবং এমবিবিএস চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সেমিনারে অংশ নেন।
বক্তব্যের শুরুতে নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী। তিনি জানান, ১৯৬৮ সালে তিনি এই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধীনে ডিসটিংশন ও অনার্সসহ এমবিবিএস পাস করেন । একসময় যে গ্যালারিতে তিনি ছাত্র হিসেবে ক্লাস করেছেন, পরবর্তীতে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে লেকচার দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ৪৯ বছর পর একই গ্যালারিতে ফিরে আসাকে তিনি নিজের জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশের প্রথম হেপাটোবিলিয়ারি ও প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৯৯ সালে বারডেম হাসপাতালে। পরবর্তীতে উক্ত হাসপাতালে ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রথম সফল লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করেন।
সেমিনারে তিনি বলেন, হেপাটোবিলিয়ারি ও প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত ও দ্রুত বিকাশমান শাখা। লিভার, গলব্লাডার, বাইল ডাক্ট ও প্যানক্রিয়াস পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হওয়ায় এসব অঙ্গের জটিল রোগের চিকিৎসায় সঠিক অ্যানাটমি ও বিশেষায়িত সার্জিক্যাল জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিভার সার্জারি সম্পর্কে তিনি বলেন, আধুনিক সার্জারিতে লিভারের সেগমেন্টাল অ্যানাটমি জানা অপরিহার্য। লিভারের আটটি সেগমেন্টের প্রতিটির রক্ত সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্বতন্ত্র। তাই টিউমার বা রোগের অবস্থান নির্ণয় এবং অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনায় সেগমেন্টভিত্তিক অ্যানাটমি অনুসরণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, লিভারের অসাধারণ রিজেনারেশন ক্ষমতার কারণে নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে লিভারের বড় অংশ অপসারণের পরও অবশিষ্ট অংশ পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর লিভারের কার্যক্ষমতা, টিউমারের বিস্তার এবং অপারেশনের পর কতটুকু সুস্থ লিভার অবশিষ্ট থাকবে—এসব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
গলব্লাডার ক্যান্সার , বাইল ডাক্ট ইনজুরি, প্যানক্রিয়াটিক সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সার্জিক্যাল বিষয় গুলো সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করেন।
সেমিনারের শেষ পর্যায়ে তিনি লিভার ট্রান্সপ্লান্টের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট end-stage liver disease-এর ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট অনেক সময় রোগীর জীবন রক্ষার প্রধান চিকিৎসা। তবে এটি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা হওয়ায় বিশেষায়িত চিকিৎসক, নার্স, অবকাঠামো এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রয়োজন।
নিজের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী জানান, সৌদি আরবের কিং ফাহাদ হাসপাতালে সার্জন হিসাবে কর্মরত অবস্থায় প্রথম জটিল লিভার রিসেকশন প্রত্যক্ষ করে, তিনি হেপাটোবিলিয়ারি সার্জারির প্রতি গভীরভাবে আগ্রহী হন । পরে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালযয়ে বিশ্বের প্রথম সফল লিভিং ডোনার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন প্রোফেসর রাসেল স্ট্রোং এর অধীনে হেপাটোবিলিয়ারি ও প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি এবং লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বিষয়ে ফেলোশিপ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে জাপানের টোকিও ও কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালযয়ে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। দেশে ফিরে হেপাটোবিলিয়ারি প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি এবংপরবর্তীতে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম শুরু করেন।
তরুণ চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “শুধু অপারেশন করার দক্ষতা নয়, রোগী নির্বাচন, অ্যানাটমি সম্পর্কে জ্ঞান এবং সম্ভাব্য জটিলতা সম্পর্কে পূর্বানুমান—একজন ভালো সার্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা একজন অভিজ্ঞ ও কিংবদন্তি সার্জনের কাছ থেকে সরাসরি অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।




