সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবরে ক্ষোভে ফুঁসছেন বিয়ানীবাজারবাসী
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ আগস্ট ২০২৫, ৪:৩৭:১৯ অপরাহ্ন
শহিদুল ইসলাম সাজু, বিয়ানীবাজার (সিলেট) থেকে : সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির দৃশ্যমান কোন কাজ শুরু হয়নি। উল্টো এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন বিয়ানীবাজারসহ আশপাশ এলাকার সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উদ্যোগে গৃহিত সিলেট-চারখাই-শেওলা চারলেন মহাসড়ক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি ৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২ হাজার ৮৮৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। বাকি ১ হাজার ৩৭০কোটি ২৫ লাখ টাকা সরকার কর্তৃক দেয়ার কথা।
সিলেট সদর, দক্ষিণসুরমা, গোলাপগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলার উপর দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় একনেক। ওই বৈঠকে ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়ককে চারলেনের আধুনিক মহাসড়কে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রকল্পটির বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতাকে দায়ি করা হয়েছে। তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, জেলা প্রশাসকের সদিচ্ছা থাকলে ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যার দ্রূত সমাধান সম্ভব।
ক্ষুব্ধ লোকজন প্রকল্প সম্পর্কে জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তকে ‘নেতিবাচক’ উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানের মতো কর্মসূচি পালন করেছেন।
গত বুধবার দুপুরে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে বিয়ানীবাজার উপজেলা নাগরিক কমিটির উদ্যোগে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে শেওলা স্থলবন্দরের সাথে সংশ্লিষ্ট চারলেন সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সিলেট-ঢাকার সাথে এতদঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হওয়ার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে বলে উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, জাতীয় গ্রীডে গ্যাস সরবরাহকারী বিয়ানীবাজারকে কোনভাবে বঞ্চিত করা যাবেনা। প্রবাসী বহুল জনগুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হওয়ার পরও এখানকার জনসাধারণ নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত। সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির ১০ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়নি। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উদ্যোগে গৃহিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি ৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়।
একটি সূত্র জানায়, গত ২৯ এপ্রিল সিলেট জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রকল্পটির ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, সীমান্তবর্তী দুই উপজেলার অল্প কিছু যাত্রী পরিবহন ছাড়া এ পথে বড় ধরনের যান চলাচল নেই। তাই আপাতত চার লেন সড়ক নির্মাণ জরুরি নয় এবং এতে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটতে পারে। এই মতামত জেলা প্রশাসক গত ৮ মে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের সেই সিদ্ধান্তের খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে চার উপজেলার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বিয়ানীবাজার উপজেলা নাগরিক কমিটির উদ্যোগে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর দেয়া স্মারকলিপিতে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা ফয়জুল ইসলাম, সেক্রেটারি মোহাম্মদ আবুল কাশেম, জামায়াত নেতা আহমদুর রহমান খান ও মাসুম আহমদ চৌধুরী প্রমুখ স্বাক্ষর করেন।
এর আগে গত ১২ আগস্ট বিকালে শেওলা স্থলবন্দর সড়কের দুবাগ বাজারে বিয়ানীবাজার উপজেলার সর্বস্তরের নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ দাবি জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে সিলেট-চারখাই-শেওলা চারলেন মহাসড়ক প্রকল্প’র ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জেলা প্রশাসকের পাঠানো ভূমি বরাদ্দ সভার সিদ্ধান্ত বাতিল এবং প্রকল্প নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একইভাবে গত ১০ আগস্ট সর্বস্তরের বিয়ানীবাজার উপজেলাবাসীর ব্যানারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে সিলেট-চারখাই-শেওলা চারলেন সড়ক প্রকল্পটি দ্রুত শুরু করার দাবি জানানো হয়। এতে অংশ নেন জকিগঞ্জের বারহাল ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ, বিয়ানীবাজার উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি কাজী আবুল কাশেম, চারখাই ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আমীর হোসেন চৌধুরীসহ ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষজন।
এদিকে, সিলেটের উন্নয়নে বৈষম্য ও চরম অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। গত ১৪ আগস্ট অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমে তিনি বিবৃতি পাঠান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সিলেট-চারখাই-শেওলা’ মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নামে- ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত চারলেনে উন্নীত প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও সম্প্রতি সিলেট বিদ্বেষী কিছু স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তার যোগসাজশে ওই প্রকল্পটি বাতিল করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।
অযৌক্তিক অজুহাতে প্রকল্প বন্ধ করার অপচেষ্টার নিন্দা জানিয়ে সেলিম উদ্দিন বলেন, সিলেট-চারখাই-শেওলা স্থলবন্দর রোডের অবস্থা এতই নাজুক, প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনা ঘটছে। এ আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বড়লেখা, জুড়ি, কুলাউড়া উপজেলার লাখ লাখ জনসাধারণ যাতায়াত করে থাকেন। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ‘শেওলা স্থলবন্দর’ দিয়ে বাংলাদেশের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের কাজেও এ মহাসড়কটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো অজুহাতে কর্নপাত না করে অবিলম্বে সিলেট-চারখাই-শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত চার লেনের আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।




