রক্ত ও জীবন দিয়ে কেনা সাংবাদিকতা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ৫:২১:৩৬ অপরাহ্ন
ফায়যুর রাহমান :
গত দুই বছরে ফিলিস্তিনের গাজা শহরটি সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মাঠ হয়ে উঠেছে। গণহত্যার প্রমাণ মুছে ফেলতে ইসরায়েলি বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গত দুই বছরে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে খুন হয়েছেন ২৭৪ জন সাংবাদিক। তার মানে রক্ত ও জীবনের দামে আমরা যুদ্ধের সংবাদ পাচ্ছি।
ব্রিটেনের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধে যত সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, সেই সংখ্যাটা আমেরিকান সিভিল ওয়ার, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধ এবং ৯/১১ পরবর্তী আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত মোট সাংবাদিকের সংখ্যার চেয়েও বেশি। তার মানে গাজা হয়ে উঠছে সাংবাদিকদের জন্য ভয়ানক একটি কবরস্থান!
ইতিহাস বড়ই ন্যায়বিচারক। ইতিহাস কেবল সাক্ষীদের প্রতি সুবিচার করবে। গাজায় প্রাণ দেওয়া সাংবাদিকদের নাম মনে রাখবে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস- (IFJ) এর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী গত দুই বছরে ইসরায়েলি সেনারা যে ২২২ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে হত্যা করেছে, ইতিহাস তাদের মনে রাখবে। কিন্তু যে দখলদাররা এই গণমাধ্যমকর্মীদের মিটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা চিরকাল নিন্দিত ও ঘৃণিত থাকবে।
গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধ করেছে ইসরায়েল। তাই সত্য জানার একমাত্র উৎস হয়ে উঠেছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা- যারা প্রায় সবাই ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য, যা (IFJ)-র সঙ্গে সংযুক্ত। তারা প্রায়ই কোনও নিরাপত্তা বর্ম ছাড়াই কাজ করেন, যাদের পরিবারও আশ্রয়হীন। ফলে এরা অনেক সময় ইসরায়েলিদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ইসরায়েলি সেনারা সরাসরি গুলি করে, বোমা মারে। কারণ ইসরায়েলিরা জানে, এদেরকে হত্যা করলে গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট হবে, সত্য তথ্য থেকে দুনিয়াবাসী অন্ধকারে থাকবে।
সাংবাদিকতার ইতিহাসে এত ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ কখনও দেখা যায়নি। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস-(IFJ) ২০২৬ সালের মে মাসে প্যারিসে তার শতবর্ষ উদযাপন করবে- সংস্থাটির নথিতে এত সাংবাদিক হত্যার কোনও রেকর্ড নেই : না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, না ভিয়েতনাম, কোরিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাকে। গাজা তাই সমকালীন ইতিহাসে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ কবরস্থানে পরিণত হয়েছে।
এই যে এত সাংবাদিক হত্যা, এটা কোনো আকস্মিক ট্র্যাজেডি নয়। এটা একটা পরিকল্পিত কৌশল : সাক্ষীদের হত্যা করো, গাজার নাম নিশানা মিটিয়ে দাও, সাংবাদিকতার বয়ানকে (নেরেটিভ) নিয়ন্ত্রণ করো।
সবারই জানা কথা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে প্রবেশে বাধা দেওয়া মানে স্বাধীন বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কণ্ঠরোধ করা। আর যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গাজায় পুনরায় উপনিবেশ গড়ার সংকল্প করেন, তখন নেরেটিভ নিয়ন্ত্রণ করা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা। উপনিবেশ মানে শুধু ভূমি দখল নয়- ধ্বংসস্তূপ, লাশের সারি, বেঁচে থাকা মানুষ ও তাদের কাহিনিগুলোকেও মুছে ফেলা।
ইসরায়েল গাজাবাসীকে পালাতে বলেছে। প্রাণ বাঁচাতে গাজার উত্তর সীমান্ত থেকে গাজা সিটি পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষকে দক্ষিণে পালাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণও নিরাপদ নয় : সেখানে নেই নিরাপত্তা, নেই পালানোর পথ। পরিবারগুলো গাদাগাদি করে আটকে আছে- মাথার উপরে বোমা, আর সামনে সমুদ্রের ফাঁদ- যেখানে যুদ্ধের নৃশংসতা থেকে রক্ষা নাই। সাংবাদিকদের অবস্থাও এর চেয়ে আলাদা নয় : তারা অবরুদ্ধ একটি ছিটমহলে কাজ করতে বাধ্য, যেখানে প্রতিদিন টিকে থাকা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে এতগুলো দেশের স্বীকৃতি দান একটা প্রতীকী ব্যাপার। এটা বহু বিলম্বিত উদ্যোগ। এটা না জীবিতদের রক্ষা করবে, না মৃতদের জন্য ন্যায়বিচার বয়ে আনবে। বিশ্বের কূটনীতি ইতিহাসের পেছনে পেছনে ছুটে চলছে, যখন অপূরণীয় ক্ষতি হয়েই গেছে।
তাহলে এই সাক্ষীদের রক্ষা করবে কে? না, কেউ না। না অচল জাতিসংঘ, না বড় শক্তিগুলো, যারা অস্ত্র সরবরাহ ও নীরবতার মাধ্যমে সহায়তা করছে দখলদারদের। হ্যাঁ, ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা একাই তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন- অবসাদ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।
IFJ তার আন্তর্জাতিক সেফটি ফান্ডের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের সাংবাদিক ও তাদের পরিবারকে সহায়তা করছে। সংস্থাটি সংবাদকর্মীদের দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরে- যেমন সামি আবু সালেম, গাদা আল কুদর প্রমুখ- যাতে তাদের নির্মম বাস্তবতা কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ না থাকে। কয়েক বছর ধরে সংস্থাটি জাতিসংঘে একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের দাবি জানিয়ে আসছে- যা রাষ্ট্রগুলোকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে এবং তাদের হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বাধ্য করবে। যতক্ষণ না এরকম একটি কনভেনশন বাস্তবে আসবে, ততক্ষণ দায়মুক্তি চলমান থাকবে এবং এই অপরাধে সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলি নেতারা নিরাপদ থাকবে।
IFJ বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক প্রেস কার্ডধারী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের মনে করিয়ে আসছে : ‘কোনো সংবাদই মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়।’ এটি কোনো স্লোগান নয়- এটি বেঁচে থাকার নীতি। সাংবাদিকদের কাজ শহীদ হয়ে মারা যাওয়া নয়, নিরাপদে প্রতিবেদন করা। সত্যের প্রয়োজনে তাদের সুরক্ষা দেওয়া দুনিয়াবাসীর সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রতিটি হেলমেট, প্রতিটি বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, প্রতিটি সেফটি ও হোস্টাইল এনভায়রনমেন্ট ট্রেনিং অপরিহার্য।
গাজার গণমাধ্যমকর্মীরা এখন প্রশ্ন করেন : ‘এভাবে চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী?’ প্রমাণ জমা হচ্ছে, সাক্ষ্য গড়ে উঠছে- তবুও কিছুই বদলাচ্ছে না। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া আরও ভয়াবহ। কারণ নীরবতা হল হত্যাকারীদের জয়। এতে তারা বলবে, ‘কিছুই ঘটেনি।’
প্রতিষ্ঠার একশো বছর পরে IFJ তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে। গাজা আজ সাংবাদিকতার কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। যদি আমরা মেনে নিই যে, সাংবাদিকরা সেখানে অবহেলায় নিহত হবেন, তাহলে আমরা অন্য শাসকদের জন্য পথ প্রশস্ত করব- যারা সাংবাদিক হত্যাকে যুদ্ধের স্বাভাবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।
গাজার সাংবাদিকরা মরতে চায়নি। চেয়েছিল নিরাপদে জীবন রেখে বিশ্বকে সত্য তথ্য জানাতে। কিন্তু ইসরায়েল চেয়েছে সত্যকে মুছে ফেলতে। ইসরায়েল তাই সাংবাদিকদের হত্যা করছে। সাংবাদিক হত্যা মানে সত্যকে হত্যা করা। আর সত্যহীন পৃথিবী মানে হত্যাকারীদের আধিপত্য।
আমরা কি হত্যাকারীদের আধিপত্য মেনেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো?
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।




