সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের তারকা সাংসদ খোন্দকার আব্দুল মালিক
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ৫:৪৪:৩৪ অপরাহ্ন
নজরুল ইসলাম বাসন :
মরহুম খোন্দকার আব্দুল মালিক (১৯২০-২০০৭) সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক তারকা রাজনীতিবিদ ছিলেন। তেতলির আহমদপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। উনার বড় দুই ভাই ছিলেন আইনজীবী এবং একজন ছিলেন আইন সভার সদস্য। ১৯৭৯ সালে মরহুম খোন্দকার আব্দুল মালিক যখন বিএনপির নমিনেশনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন তখন কৌতূহলবশত তার সম্পর্কে যা জেনেছি তাহলো, তিনি লেখাপড়া শেষ করে এয়ারফোর্সে জয়েন করেছিলেন, চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তিনি ব্যবসা বাণিজ্যে খুব উন্নতি করেছিলেন বলেও শুনেছি। তাকে মাঝে মধ্যে আমাদের স্কুলে আসতেও দেখেছি। সেই গল্পই এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে বলবো।
প্রভু নয় বন্ধু এবং দেশ ও কৃষ্টি নিয়ে ছাত্র আন্দোলন
আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন এস এস সি’এর সিলেবাসে দেশ ও কৃষ্টি ও আয়ুব খানের লেখা প্রভু নয় বন্ধু বইটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফ্রেন্ড নট মাস্টার্স বইটি আয়ুব খানের নামে লেখা হলেও অনেকে বলেন এটি পাকিস্তানের বাঙালি বিদ্বেষীদের মস্তিষ্কপ্রসূত এই বই। এই বই দুটি নিয়ে সারা দেশ আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল। তখন আমাদের সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলের ছাত্ররাও এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মরহুম সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ও স্কুল কর্তৃপক্ষ উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে অভিভাবকদের নিয়ে সভা করতেন। প্রধান শিক্ষকের আমন্ত্রনে সমাজের শ্রেণী পেশার নেতৃবৃন্দ ও অভিভাবকদের উপস্থিতি থাকত ঐ ধরনের সভায়। তখন খোন্দকার আব্দুল মালিক সাহেবও আমাদের স্কুলে আসতেন, তিনি ছিলেন সুদর্শন স্মার্ট এবং গুছিয়ে কথা বলতেন। তখনও তিনি রাজনীতিতে ছিলেন না ছিলেন ব্যবসায়ীদের নেতা, সিলেট চেম্বার অব কমার্স গঠনের ব্যাপারে তার দুরদর্শী ভূমিকার কথা সংশ্লিষ্টদের জানা আছে।
সিলেটে আয়ুব খানের উপর পাদুকা বর্ষণ ও ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান
১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালে আয়ুব বিরোধী ও স্বাধিকার আন্দোলনে উত্তাল ছিল সারাদেশ, এই ১৯৬৭ সালের দিকে সিলেটে ঘটেছিল আরেক ভিন্নধর্মী ঘটনা, মরহুম প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান এসেছিলেন সিলেটে, সিলেট সার্কিট হাউসের বারান্দায় হাফ দেয়াল দিয়ে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় ভাষণ দেয়ার স্থানও নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান যখন ভাষণ দিতে উঠলেন তখন তার উপর আচমকা পাদুকা বর্ষিত হলো। সিলেটে আয়ুব খানের উপর জুতা নিক্ষেপ এই ঘটনা পরবর্তীতে ইতিহাসের এক অনন্য সংযোজন হয়ে রয়েছে। তবে এ নিয়ে মূলধারায় কোন তথ্য পাওয়া যায়না। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মূলত ১৯৬২ সাল থেকেই আয়ুব মোনেম বিরোধী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে এর পরিণতিতে ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল আয়ুবকে বিদায় নিতে হয়, তবে তিনি বিষফোঁড়া রেখে যান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে।

এরপরের ইতিহাস সংক্ষেপে বলতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৭০ সালে নির্বাচন দেন। বিজয়ী দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দেয়া হল না। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করলো, মেজর জিয়া চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।
জাতীয় রাজনীতিতে শহীদ জিয়া ও বিএনপি
৯ মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে শেখ মুজিবুর রহমান অস্থায়ী আওয়ামী লীগ সরকার এর প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদের নিকট থেকে নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গঠন করলেন। তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন প্রেসিডেন্ট হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক সেনা অভ্যুত্থানে মুজিব সপরিবারে নিহত হলেন।
বাকশাল সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাককে অভ্যুত্থানকারীরা প্রেসিডেন্ট পদে বসালেন। আওয়ামী লীগের সংসদ তখনও বহাল ছিল। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে ৩রা নভেম্বর আরেকটি সেনা অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মোশতাককে সরিয়ে দেয়া হল। তারা প্রধান বিচারপতি সায়েমকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বসান। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে সিপাই জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে আনা হয়। বিচারপতি সায়েম সরকার জেনারেল জিয়াকে সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব দেন। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেন এবং তিনি জেনারেল জিয়াকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার দেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়া দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তার রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে গণভোট দেন ৭৭ সালে, এই গণভোট হ্যাঁ/না ভোট হিসেবে ইতিহাসে সংযুক্ত রয়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া রাজনীতিতে আসেন অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, সিপিবি ও মোজাফফর ন্যাপ ছাড়া দেশের অন্যান্য দল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগ দেয়। এই সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিচ্ছন্ন পেশাজীবী নেতৃস্থানীয় মানুষকে তার সাথে কাজে সম্পৃক্ত করেন। সিলেট চেম্বার অব কমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খোন্দকার আব্দুল মালিকও এর মধ্যে একজন ছিলেন।
সিলেটে বিএনপি’র রাজনীতিতে খোন্দকার আব্দুল মালিক
১৯৭৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী জেনারেল জিয়া, বিপুল ভোটে আওয়ামী সিপিবি ন্যাপ জোটের প্রার্থী জেনারেল ওসমানীকে পরাজিত করেন। ১৯৭৯ সালে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্ট জিয়া গঠন করে জাতীয়তাবাদী দল পরে যা বিএনপি হিসাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থান করে নেয়। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে সিলেট ১ আসন থেকে বিএনপির নমিনেশন পান মরহুম খোন্দকার আব্দুল মালিক, তিনি মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজী (মই) ও বাবরুল হোসেন বাবুল (নৌকা) কে পরাজিত করে ধানের শীষের বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ সামরিক আইন জারী করে, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ মরহুম খোন্দকার আব্দুল মালিক সিলেটে ৭ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন। কোন ধরনের লোভ লালসা প্রলোভন তাকে বিএনপির’ রাজনীতি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে একমাত্র তিনি সিলেট থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদি সাধারণ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য পদে জয়লাভ করেছিলেন। ঐ সংসদেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিল পাশ করে বিএনপি।
১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টি ১৯৯৪ সালে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে। বিএনপি ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতি চালু করে। কৌশলগত দিক দিয়ে এতে আওয়ামী লীগ লাভবান হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করলেও জাতীয় পার্টি ও আসম আব্দুর রবের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয়। পরবর্তী নির্বাচন হয় ২০০১ সালে এই নির্বাচনে সিলেট-১ থেকে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ২০০৭ সালে খোন্দকার আব্দুল মালিক ইন্তেকাল করেন। আমি যখন সিলেট জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও আলমগীর কুমকুম তখন জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। আমাদের শ্রদ্ধেয় খোন্দকার আব্দুল মালিক চাচা ছিলেন আমাদের এলাকার এমপি। তিনি ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের পুত্রসম স্নেহ করতেন। খুবই স্মার্ট ছিলেন, ছিলেন স্পষ্টবাদী। তিনি যা সঠিক মনে করতেন তাই করতেন, আপোস করার কোন বাতিক তার মধ্যে ছিল না।
এখনও একটি ঘটনার কথা আমার মনে আছে, ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিলেটের বন্দরবাজারে আওয়ামী লীগের মিছিলের সম্মুখে তার জীপ গাড়ি পড়ে যায়। ছাত্রলীগের কিছু দুষ্কৃতকারী তার উইলিস জীপটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তিনি থানার ওসিকে সাফ বলে দেন, তার জীপ জ্বলে গেছে যাক তবে নির্দোষ কাউকে যেন মিথ্যা মামলায় জড়ানো না হয়। তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করতেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি করতেন না। শহরের জিন্দাবাজারে আমাদের যুবদল ও ছাত্রদলের অফিস, তিনি আমাদের অফিসে আসলে আমরা খুব খুশী হতাম। পিতৃসম এই মানুষটির নিকট থেকে আমরা যে স্নেহ পেয়েছি তা কখনো ভুলার নয়। পরপারে আল্লাহ যেন তাকে শান্তিতে রাখেন এবং বেহেস্ত নসিব করে।
পুনশ্চ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মরহুম খোন্দকার আব্দুল মালিকের কনিষ্ঠপুত্র খোন্দকার আব্দুল মোক্তাদির আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে সিলেট-১ আসন এ বিএনপি থেকে পুনরায় মনোনয়ন পেয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোট পেয়েছিলেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে খোন্দকার মোক্তাদিরই বিজয়ী হতেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে তিনি ধানের শীষের বিজয় ছিনিয়ে আনবেন বলে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক : অতিথি সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক।



