সিংহাসন : ইতিহাসে শাসকদের উত্থান-পতনের খন্ডচিত্র
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ জুলাই ২০২৫, ৭:০৮:১২ অপরাহ্ন
আরণ্যক শামছ :
অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের প্রথিতযশা কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনির লেখা শাসকদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম। মনে হলো উক্ত প্রবন্ধের সাথে ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও পটভূমির সংযোজন করে একটি নতুন কলমচিত্র উপস্থাপন করা যেতে পারে। এতো বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। শুধু কিছু ঐতিহাসিক মূহুর্তের খন্ডচিত্র অতি সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
প্রথমেই একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করা যাক। ‘ক্ষমতা একজন মানুষকে উন্মোচিত করে।’-রবার্ট ক্যারো।
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে ইতিহাস গড়ে উঠেছে শাসকদের হাত ধরে, যারা কখনো ছিল ইতিহাসের নির্মাতা, আবার কখনো ছিল ধ্বংসকারী। কেউ কেউ এনেছেন ন্যায়বিচার, কল্যাণ ও সোনালি যুগ; আবার কেউ পুরো জাতিকে ভাসিয়েছেন রক্তপাত, অত্যাচার ও দুঃস্বপ্নে। শাসকদের গল্প শুধু সিংহাসনের বা যুদ্ধের নয়; এটি তাঁদের মানব আত্মার প্রতিচ্ছবি, তাঁদের মহত্তম আকাঙ্ক্ষা ও অন্ধকারতম প্রবৃত্তির প্রতিফলনও বটে।
দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক ও কবিরা যুগে যুগে শাসনব্যবস্থার গঠন বিশ্লেষণ করেছেন। কেন মানুষ সিংহাসন চায়? ক্ষমতার হাতে পড়ে মানুষের মনোজগতে কী ঘটে? কেন এত মহৎ শাসকদেরও শেষ পর্যন্ত ট্র্যাজিক পরিণতি হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে রাজপ্রাসাদ থেকে কারাগারে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অধ্যয়নের ঘরে, হৃদয় থেকে মননে। মিশরের ফারাও থেকে শুরু করে আধুনিক একনায়কদের মধ্যে এক বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। অনেক শাসক রাজত্ব করেছেন কেবল রাজনৈতিক কারণেই নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক চালচিত্রে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘ইড’, ‘ইগো’, ও ‘সুপার ইগো’ তত্ত্বের মাধ্যমে এই চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে হয়তো তাঁদের সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি সম্ভব হতে পারে।
এই প্রবন্ধে আমরা সময়ের সীমানা পেরিয়ে দেখব কীভাবে শাসকেরা ক্ষমতায় এসেছেন, কীভাবে তারা ক্ষমতার ব্যবহার বা অপব্যবহার করেছেন, এবং তাদের গল্প আমাদের কী শেখায়। আমরা খুঁজে দেখব তাদের কর্মপদ্ধতির পেছনের যুক্তি, তাদের মোহ, তাদের সৃষ্ট আতঙ্ক এবং তাদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য- আলো বা ছায়া যেটাই হোক না কেন।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে শাসক কখনো রক্ষক, কখনো শিকারি, কখনো নির্মাতা, আবার কখনো ধ্বংসকারী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। গোত্রপ্রধান থেকে সম্রাট, সুলতান থেকে রাষ্ট্রপতি- সব সমাজেই শাসক ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক স্তম্ভ। পুরাণ ও ধর্মীয় বিশ্বাসে শাসক প্রায়ই ছিলেন ঈশ্বরতুল্য। প্রাচীন মিশরের ফারাওরা ছিলেন পৃথিবীর উপর ঈশ্বরের অবতার। কিং সলোমন ছিলেন জ্ঞান ও ন্যায়ের প্রতীক। আলেকজান্ডার মহান পারস্য জয় করে নিজেকে দ্যুতি-মণ্ডিত উপাধিতে ভূষিত করেন। এসব প্রতিমা শাসককে ঈশ্বরিক শক্তিতে পূর্ণ এক অতিমানবিক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরে- যা প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের দেখায় সেইসব স্বৈরাচারীদেরও, যারা ক্ষমতা ব্যবহার করেন নিজেদের তৃপ্তির জন্য, সেবার জন্য নয়। রোমের সম্রাট নিরো, উত্তর কোরিয়ার কিম বংশ, উগান্ডার ইদি আমিন—সবাই তাঁদের কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যেই তাঁদের পতনের পূর্বাভাস বহন করে ক্রমাগতভাবে এগিয়ে গিয়েছিল। এই প্রতিমা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, ক্ষমতা যদি সীমাবদ্ধ না থাকে, তা তখন শাসকদের জন্য বিষ হয়ে ওঠে।
ন্যায়পরায়ণ রাজা ও অত্যাচারী শাসকের মধ্যেকার দ্বন্দ্বই ইতিহাসের রাজনৈতিক বিবর্তনের মূল ধারা।
শাসকদের শাসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে হলে তাঁদের মনস্তত্ত্ব অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করা অতীব জরুরি বিষয়। বিখ্যাত দার্শনিক ও মনোসতত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানবমনের তিনটি স্তর ব্যাখ্যা করেন এইভাবে: ইড (মূল প্রবৃত্তি), ইগো (বাস্তবতা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত) এবং সুপার ইগো (নৈতিকতা)। এই তত্ত্ব দিয়ে শাসকদের আচরণ বোঝা যায়। একটু বিস্তারিতভাবে বললে মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ইড, ইগো এবং সুপারইগো হলো মানুষের মনের তিনটি অংশ। এই তিনটি অংশ ব্যক্তির আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইড হলো মনের আদিম এবং অচেতন অংশ। এটি প্রবৃত্তি, কামনা-বাসনা এবং মৌলিক চাহিদা দ্বারা চালিত হয়। ইড তাৎক্ষণিক তৃপ্তি চায় এবং যুক্তিবোধ বা নৈতিকতার ধার ধারে না। ইগো হলো মনের বাস্তববাদী অংশ। এটি বাস্তবতার নিরিখে ইডের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করে। ইগো যুক্তিবোধ, বিচার-বিবেচনা এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজ করে। আর সুপারইগো হলো মনের নৈতিক এবং বিচার-বিবেচনা বিষয়ক অংশ। এটি সামাজিক নিয়ম-কানুন, মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে কাজ করে। সুপারইগো সাধারণত শৈশবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে অর্জিত মূল্যবোধের মাধ্যমে গঠিত হয়। এই তিনটি অংশ ব্যক্তির মধ্যে সবসময় ক্রিয়াশীল থাকে এবং এদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিত করে।
সংক্ষেপে, ইড হলো ‘আমি যা চাই’, ইগো হলো ‘আমি যা করতে পারি’, এবং সুপারইগো হলো ‘আমার যা করা উচিত’। ইড-চালিত শাসকরা ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ভোগ ও প্রতিশোধের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। যেমন ক্যালিগুলা বা হিটলার। ইগো-নির্ভর শাসকরা কৌশলগত ও বাস্তবতা-ভিত্তিক কাজ করেন। যেমন জুলিয়াস সিজার যিনি আইন সংস্কার করেন, জনকল্যাণে কাজ করেন। সুপার ইগো-চালিত শাসকরা নৈতিকতা ও আত্ম-উপলব্ধিতে পরিচালিত হন। যেমন সম্রাট অশোক। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর যিনি অহিংস ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
শাসকদের এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বোঝায়, নেতৃত্ব শুধুই রাজনৈতিক নয়; এটি আত্মার একটি যাত্রাও বটে।
উত্থানের ধরন ও ছক : ইতিহাসবেত্তারা তাঁদের বিভিন্ন গবেষণাকর্মে ও লেখায় শাসকদের ক্ষমতা লাভের কিছু সুনির্দিষ্ট ধরন উল্লেখ করেন। তার মধ্যে একটি হলো কৌশলগত মেধা। চেঙ্গিস খান দেখতে আগ্রাসী, ঝাঁঝালো, এক যুদ্ধ-উন্মোত্ত নেতা হলেও তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল কৌশল ও সংগঠনে। তিনি বিভিন্ন বঞ্চিত মঙ্গোল, তুষ্কার ও চীনাদের বিভাজিত গোত্রগুলোকে একত্রে বেঁধে তাদের মনে করিয়ে দিলেন যে, তারা কেবল আলাদা-আলাদা গোত্র নয়—তারা মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অঙ্গ। এভাবে তিনি সেক্যুলার-ভিত্তিক ‘এমার্জেন্ট জাতীয়তা’ গড়ে তোলেন, যা তাকে এক মিলিয়নেরও বেশি সৈন্যের স্বয়ংসেবক বাহিনী গঠনে সহায়তা করে। এই জাতীয়তাবাদের দলিল-গঠনে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক ধারাবাহিক কৌশল। কোণঠাসা গোত্রগুলোকে একত্রিকরণ ও অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন প্রতিশ্রুতি, দিয়েছিলেন সম্মান ও ভাগাভাগির সুবিধা।
আর টোকুগাওয়া ইয়েয়াসু? তিনি যুদ্ধের কবলে থাকা জাপানকে শান্তির পথে ফিরিয়ে আনলেন। আন্তঃশাসনিক যুদ্ধ, শিক্ষার বিচ্ছিন্নতা, অঞ্চলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা- এসব বারবার হিংসার চক্র সৃষ্টি করছিলো। তবুও ইয়েয়াসু এক এক করে শাসকদের পরাজিত করে এক কেন্দ্রীয় শোগুনশাহি প্রতিষ্ঠা করেন, যা ২৫০ বছরের শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলে। এই শান্তি ‘পেক্স ইয়েন’-এর মতো নয়। এটা ছিল মানুষের মনে ‘আমরা আবার এক সঙ্গে বাঁচতে পারি’- এই উজ্জীবনী চেতনার এক অভূতপূর্ব আত্মবিশ্বাস। তৎকালীন শাসকদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ঈশ্বরিক বৈধতার দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।
প্রাচীন মিশরে ‘ফারাও’রা শুধু রাজা ছিলেন না। তারা ছিলেন ঈশ্বরের এক প্রতিরূপ, মানে তাদের শাসন শুধু রাষ্ট্রীয় নয়, ছিল ঈশ্বরীয়। এটা ছিল এক ‘কালো-বিশ্বাস’। জনগণকে বুঝানো হত যে এই বিশ্বাস ধারণ না করলে বা মান্য না করলে ‘ঈশ্বর খারাপ মনে করবেন’। সেইসময় সরকার নিজেকে, নিজের শাসনপদ্ধতিকে সবসময় সঠিক বলে মনে করতো। মধ্যযুগেও রাজারা ‘দিব্য অধিকার’ নিয়ে দাবি করতেন। তাদের নিকট ক্ষমতা ছিল ঈশ্বরের উপহার। এই ধারণার প্রবর্তন ও চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে কয়েক’শ বছরের এক মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, যেখানে জনগণ মনে করতো অথবা তাদের বিশ্বাস করানো হতো যে, “শাসকের বিরুদ্ধে গেলে তুমি পাপ করছো।” এই বিশ্বাসশক্তি তখন রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল যে, তখন এইসব বিশ্বাসের প্রতি ক্ষুদ্র অবজ্ঞাও অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সংকট আকারে উপনীত হতো। ‘শাসকের সিদ্ধান্তকে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না, কিংবা হওয়ার অধিকার রাখে না’-এই মনস্তত্ত্ব মানুষের মননে ও মগজে গেঁথে দেয়া হয়েছিল। এর কোনোরকম ব্যত্যয় হলে নেমে আসতো কঠিন ও অবর্ননীয় শাস্তি।
মানুষের ভয় বা আশাকে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল তৎকালীন শাসকদের অন্যতম লক্ষ্য ও কলাকৌশলের প্রধানতম হাতিয়ার। যখন শাসক কিংবা সরকার ভয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন জনমতকে তারা নানাভাবে পরিমার্জন করে। স্তালিন হলেন এই ধারণা বাস্তবায়নকারীদের এক অন্যতম উদাহরণ। প্রভাবশালী পলিটব্যুরো ও গোয়েন্দা পরিকাঠামোর মাধ্যমে তিনি এত তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছিলেন যে “রাজা সঠিক না বললেও, তা ভুল বলা হারাম।” এটি ছিল তাঁর সময়ের একটি স্বতঃসিদ্ধ ধারণা। মানুষের মুখে সমালোচনার শব্দসমূহ গোপন হতে হতে এমন এক ভয়ানক ও ভীতিকর অবস্থার তৈরি করেছিল যে মানুষ স্বাভাবিক কথা বলতেও ভয় পেত। আবার রুজভেল্ট মহামন্দার অন্ধকারেও মানুষের আশা’কে নিজের মতো করে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। “আমরা নিশ্চিতভাবে উন্নতির পথে”-এই মন্ত্র তিনি বিভিন্ন জনসভায় অথবা সাক্ষাৎকারে এত বেশি উচ্চারণ এবং ব্যবহার করতেন যে জনসাধারণ বিশ্বাস করতে শুরু করলো যে, তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হননি এবং তিনি ওই কঠিন সময়েও জনগণের মনে এক মিথ্যা দেশপ্রেমের বীজ গজিয়ে তুলতে সক্ষম হন। সেই সময় জনগণ কে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও আশার মিথ্যা বুলি প্রদান করাকে শাসকশ্রেণী সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতো।
যুগে যুগে শাসকরা মহৎ কর্ম ও নিষ্ঠুরতাকে শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দুটি পরস্পরবিরোধী দর্শনকেও একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিরল দৃষ্টান্তসমূহ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। সম্রাট আকবর তখনকার সমাজে নিজের ধর্মবিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে মানুষের কল্যাণার্তে ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ নামে একটি মানবতাবাদী ধর্মের প্রবর্তন করেন।হিন্দু-মুসলিমকে একত্রিত করতে ফৌজদারি মুসলিম ধর্ম অধ্যাদেশ (ফিরমান), জয়-উল-উলুম, দয়া-অঙ্কুর প্রকাশ করলেন। এতে তিনি শুধু সাম্রাজ্যই গড়েননি- মানুষের হৃদয়েও স্থায়ী ন্যায়ের অনুভূতি গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
অগাস্টাস সিজার রোমকে শুধু ক্ষমতায় বসাননি; আইনের মাধ্যমে শান্তি, বিভাজনহীন ও বিভাগবিহীন যৌথ জীবনের উদাহরণও স্থাপন করেছিলেন। আব্রাহাম লিংকন তাঁর আবেগ ও ভাষার মাধ্যমে দাসপ্রথার অবসান আনলেন—যা ছিল মানবতার এক অনন্য পুনর্গঠনের ইতিহাস।
উপরোক্ত ধারণাসমূহের বিপরীতে যুগে যুগে নিষ্ঠুরতা ও নিপীড়ন ছিল শাসকদের শাসনের প্রধানতম হাতিয়ার।
হিটলার গণহত্যা ও বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অমানবিক অধ্যায় সৃষ্টি করেন। ‘স্তালিন গুলাগ’ ছিল সেই সময়ের ‘আয়নাঘর’। জোসেফ স্তালিনের শাসনামলে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘গুলাগ’গুলুতে জোরপূর্বক মানুষদের বন্দি করে রাখা হতো। এ ছিল একধরনের বন্দিশিবির বা শ্রম শিবির। এই শিবিরগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বন্দী রেখে তাদের কঠিন শ্রম করতে বাধ্য করা হতো। স্তালিনের গুলাগ এবং তার বহুবিধ মনস্তাত্ত্বিক চাপে ও অনাহারে মৃত্যুর পরিমাণ ছিল লক্ষাধিক।
ইতিহাসের ‘কসাই রাজা’ হিসেবে পরিচিত বেলজিয়ামের লিওপোল্ডের ‘কঙ্গোচাপের’ নিপীড়নের চিত্রের সাথে সবাই কমবেশি পরিচিত। লিওপোল্ডের কঙ্গোচাপ বলতে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের কঙ্গো অঞ্চলের ব্যক্তিগত শাসন এবং এর অধীনে সংঘটিত নৃশংসতাকে বোঝায়, যা ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ‘কঙ্গো ফ্রি স্টেট’ নামে পরিচিত ছিল। এই সময়ে, লিওপোল্ড কঙ্গোকে একটি ব্যক্তিগত উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করেন এবং রাবার ও হাতির দাঁতের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য স্থানীয় জনগণের উপর চরম অত্যাচার ও শোষণ চালান, যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
চার্চিল- যিনি ইংল্যান্ডকে কঠিন ও ভয়ংকর সময়ে নেতৃত্ব দিলেও, সেই একই সময়ে উপনিবেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব দেখিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে বিভক্ত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন থাকা সত্ত্বেও তাকে একই সাথে ‘মহান নেতা’ ও ‘উপনিবেশের নির্মম নেতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হত। নেপোলিয়ন ‘নাগরিক-আইনের’ ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং মনে করতেন যে, মানুষের আদর্শিক-আচরণ ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দর্শন ছিল যে, যুদ্ধ না করলে ইতিহাসে স্থান পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর যুদ্ধনীতিতে বারবার সেটাই প্রতীয়মান হয়েছে। এই দুই ব্যক্তির জীবনে একটা অনিবার্য দ্বৈততা আছে। তাদের মানবিক ও রাষ্ট্রীয় দিক এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে “শাসক কখনোই শুধুই ত্রাণকর্তা নয়, বরং মাঝে মাঝে তারা নিজেরাই ত্রাস হয়ে ওঠে”-এই সত্যকে চিত্রিত করে।
শাসকদের ট্র্যাজিক পরিণতি ও শিক্ষা: বলা হয়, অহংকার পতনের মূল। যুগে যুগে শাসকদের পতনের ইতিহাস অহংকারের রক্ত দিয়ে মাখা। লুই ষোড়শ ভালো শাসন করলেও নেতৃত্বচ্যুত হন অত্যধিক অহংকারজনিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। জনগণ তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, দেশজুড়ে বিপ্লব সৃষ্টি করে এবং ক্ষমতাচ্যুত করে। সাদ্দাম হোসেন নিজেকে এক অলৌকিক নেতা মনে করতেন। তার এই অহংবোধই তাঁকে তার নিজের অহমের আগুনে দগ্ধ করে ফেলেছিল। পশ্চিমারা তাঁর এই অহমবোধকে ভালোভাবে নিতে পারেনি। তাই তাদের পরিকল্পিত চক্রান্তের শিকার হয়ে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন ও ফাঁসির যুপকাষ্ঠে নিজেকে বলিদান দিতে বাধ্য হন। জুলিয়াস সিজার তাঁর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও দম্ভের কারণে ঘনিষ্ঠদের হাতে নিহত হলেন। লিবিয়া’র রাজা গাদ্দাফি প্রিয় জনগণের হাতে নির্মমভাবে ও নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন।
শাসকদের এই করুণ পরিণতি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, নেতা যদি মানুষের অন্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত না করে, তবে বুঝতে হবে তাঁর পতনের ডিক্রি তাঁর নিজের নির্মাণের মধ্যেই লুকানো আছে। শাসকদের পতন প্রায়শই বাইরের হামলায় নয়—বরং তাঁদের নিজের অহংকার, তাদের বিশ্বাসভঙ্গের কারণে ও জনগণের চূড়ান্ত প্রতিরোধের ফলেই ঘটে।
দার্শনিক ও ইতিহাসবিদদের চোখে শাসন : ম্যাকিয়াভেলি অধ্যাপনা করতেন; কিন্তু মনে করতেন, শাসককে ভালোবাসা অপেক্ষা ভয় পাওয়া উচিত। কারণ ভয়ের মূল প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব সহজে নিঃশেষ হয় না; তবে মানুষের হৃদয়ে ভালবাসা মিশে গেলে তা ধ্বংসের পথে চলে যেতে পারে। ইবনে খালদুন এর মতে, প্রতিটি শাসনের উত্থান, বিলাসিতা ও পতন হলো একটি চক্র। যখন মানুষের আধ্যাত্মিকতা দুর্বল হয়, তখন রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়। ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু মনে করেন, যখন শক্তি এক জনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় তখন একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়। শাসনের নিরঙ্কুশ শক্তির-একাগ্রতা একই বিভাগের উপর ন্যস্ত হলে পরিণত হলে রাষ্ট্র নিজেই নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের শাসকদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা এই দৃশ্য বারবার দেখতে পাই।
আজকের বেশিরভাগ রাষ্ট্রনেতা যেন অতীতের একনায়কদের এক ছায়াবৃত আধুনিক সংস্করণ। লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, গণতন্ত্রেও ব্যক্তি পূজা, গুজব, বিভাজনমূলক ভাষণ ইত্যাদি বিদ্যমান। বর্তমানে প্রযুক্তি ও নজরদারির আধিপত্য এতোই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে যে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন মানুষের কন্ঠরোধের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শেষ বিচারে, ক্ষমতা আশীর্বাদ ও অভিশাপ উভয়ই। যিনি এটি ধারণ করেন, তাঁর উচিত বিনয়, দূরদর্শিতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে শাসন করা। সত্যিকারের মহান শাসক তিনিই, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝেন। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তিনি, যিনি নিজেকে অমর ভাবেন।
শাসকদের গল্প, শেষমেশ, মানবতারই গল্প। তাদের কর্ম স্মরণে রেখে, তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, আগামী দিনের নেতৃত্বে আমরা আরও ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারি।
শাসকরা মরণশীল, কিন্তু তাদের শাসনের পরিণতি অমর হয়ে থাকে। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, ইতিহাস নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্ত করে না, কিন্তু নিজস্ব ছন্দে বারবার ফিরে আসে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।



