তলিয়ে গেছে সুনামগঞ্জের হাওরের পাকা ধান : কৃষকদের আহাজারি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ২:৩৭:১৯ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী
কৃষক সুলেমান মিয়া বরাম হাওরে আড়াই একর জমিতে ইরি বোরো আবাদ করেছিলেন। তার জমির ধানও পেকেছিল। কিন্তু শ্রমিক সংকটে সেই ধান আর কাটা সম্ভব হয়ে উঠেনি। অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে তার ধানি জমি। একইভাবে কৃষক আব্দুর রউফ মিয়াও শ্রমিক সংকটে কাটতে পারেননি পাকা ধান। বরাম হাওরে তারও পাকা ধানের জমিও তলিয়ে গেছে। কেবল সুলেমান কিংবা আব্দুর রউফ নয় তাদের মতো বিপুল সংখ্যক কৃষকের পাকা ধান তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টির পানিতে। একমাত্র সম্বল ইরি বোরো ধান হারিয়ে কৃষকরা কাদঁছেন। হাওর পাড়ের কৃষক পরিবারে এখন কেবলই আহাজারি।
গেল দু’দিনের অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর, দিরাই উপজেলার বরাম হাওর, চাপতির হাওর, টাংনির হাওর, শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার অতিবৃষ্টির পানিতে দিরাইয়ের বরাম হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে তোলার চেষ্টায় কৃষকরা
পাগনার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওর, পাখিমারা হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের ধান তলিয়ে গেছে। দিরাই ও শাল্লা উপজেলা সদরের সাথে বিভিন্ন ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম সড়কগুলো এখন কোমর পানির নিচে।
কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির পানিতে একমাত্র সম্বল হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আবার যারা ধান কেটেছেন তারা সেই ধান নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। পানি বৃদ্ধির ফলে বেশির ভাগ এলাকায় ধান শুকানোর ‘খলা’ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
এদিকে, হাওরের উঁচু অংশের কিছু ইরি বোরো ধান এখনো পানির ছোবল থেকে রক্ষা পেলেও বৈরী আবহাওয়া আর বজ্রপাত আতঙ্কে ধান কাটতে পারছেন না। বিভিন্ন হাওরের শতকরা ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হলেও ৪৫ থেকে ৪৮ ভাগ ধান তলিয়ে গেছে।
দিরাই’র বরাম হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সুলেমান মিয়া (৫০) বলেন, বহু আশা-ভরসা নিয়ে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। কত কষ্ট করলাম কিন্তু কষ্টের ফসল আর কাটতে পারলাম না। এই কষ্ট কে দেখবে। এখন সহায় সম্বল হারিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকব এই চিন্তায় আছি।
টাংনির হাওরপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জয়নুল চৌধুরী (৩৫) জানান, হাওরে তিনি কয়েক কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। এবার বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ধান তলিয়ে গেছে। হাওরের বেশিরভাগ ধান এখন পানির নিচে বলে জানান তিনি।
জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সারদা চরণ দাস (৬০) বলেন, সোমবার দিনেও জমিতে পাকা ধান রেখে গেছেন। কিন্তু রাতের বৃষ্টিতে সর্বনাশ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার সকালে এসে দেখেন জমির সব ধান তলিয়ে গেছে। ১৬ একর জমির পাকা ধানের মধ্যে মাত্র চার একর জমির ধান কেটে তুলতে পেরেছেন। বাকি জমির ধান এখন পানির নিচে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত পুরো জেলায় ৭ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ইরি বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দু’দিনের অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২ হাজার ৪৯৮ হেক্টর। গতকাল পর্যন্ত ৯২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে বলে দাবী করলেও কৃষি বিভাগের তথ্যের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
এদিকে, পাকা ধান তলিয়ে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে এ সংক্রান্ত সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের সংখ্যা বা কৃষকের সংখ্যাও নেই। কৃষি কর্মকর্তাদের দায়সারা বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই নানান প্রশ্নের উদ্রেক করছে। অন্যদিকে, গতকাল সকালে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেছে। দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। বাঁধ দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত নয়। স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেছিলেন। এ ছাড়া দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকছিল।
মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘন্টায় সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এই সময়ে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে পানি বেড়েছে ৩৪ সেন্টিমিটার। তবে, ওই সময় পর্যন্ত বিপদসীমার ২১৯ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ এবং ভারতের মেঘালয়ে ভারি থেকে অতি বৃষ্টিতে বন্যা সৃষ্টির আশংকার সতর্কতা জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এজন্যে পাউবোর সকল হাওর রক্ষা বাঁধ পাহারা বসাতে পাউবোকে সুনামগঞ্জের নবাগত জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান নির্দেশ দিয়েছেন।
জানা গেছে, অতিবৃষ্টির পানিতে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় বাঁধ কেটে দিয়ে হাওরের পানি কমানোর দাবি উঠেছে। তবে, আগের তুলনায় নদনদীতে পানির উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি ইরি বোরো মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলার ১২৩ হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। আবাদকৃত জমি থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি বিভাগ।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন, জেলার হাওরের পরিস্থিতি তুলে ধরে দৈনিক সিলেটের ডাককে বলেন, সুনামগঞ্জ জেলার পরিস্থিতি ভালো নয়। চোখের সামনে কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা কাঁদছেন- আহাজারি করছেন। বহু কষ্ট করে, অতিরিক্ত টাকা দিয়েও ধান কাটা শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরের কৃষকের এই অসহায়ত্ব ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সত্যি কথা বলতে গেলে, কৃষকের পাশে কেউ নেই। তার সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ৪৫ থেকে ৪৮ ভাগ বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ২৮ থেকে ৩২ ভাগ ধান কাটা হয়েছে এবং হাওরের উঁচু অংশে কিছু ধান কাটার বাকি আছে। এমন দুরবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে তিনি সরকারের নিকট দাবি জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. ওমর ফারুক গতকাল দুপুরে বলেন, এ পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি ধান কাটা হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে, এই মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বিক বিষয়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ভারত থেকে আসা ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জ জেলার সকল হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিল। হাওরপাড়ের গ্রামগুলো ফসলহারা কৃষকদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে। কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে তখনকার রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সরেজমিনে সুনামগঞ্জ পরিদর্শন আসেন। এর নয় বছর পরে আবারও সুনামগঞ্জের হাওরের বোরোধান তলিয়ে গেছে।




