ঈদের ছুটিতে মুখর ছিলো সিলেটের সবগুলো পর্যটনকেন্দ্র
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:২৫:১৬ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার : ঈদের টানা সাত দিনের ছুটিতে প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিলো সিলেট জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। গত ১৬ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত হোটেল মোটেলগুলো ছিল টইটুম্বুর। বিশেষ করে ঈদের দিন থেকে রোববার পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড় ছিল। ঈদের লম্বা ছুটিকে ঘিরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভ‚মি সিলেটে যেন দীর্ঘ দিন পর উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে আসে। সাদা পাথরের নীল জলরাশি, সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুলের জলারবন, মেঘের রাজ্য জাফলংয়ের সুউচ্চ পাহাড়ি ঝর্ণা, বিছনাকান্দির সবুজ জলরাশি ও পাথর এবং বিভিন্ন চা বাগানের সবুজ প্রকৃতিতে মুগ্ধ হন সিলেটে ঘুরতে আসা ভ্রমণপিপাসুরা।
সিলেটের সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, জাফলং, ডিবির হাওর, পান্তুমাই, চা বাগান, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বিটিআরআই, রমেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, মাধবপুর লেক, কুলাউড়ার কালো পাহাড়, মুরইছড়া ইকো পার্ক, আমানীপুর পার্ক, বড়লেখার মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ও জেলার সবগুলো চা বাগান এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর ও শিমুল বাগান, সর্বত্রই ছিল পর্যটকে লোকে লোকারণ্য। বিশেষ করে সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের ফাইভ স্টার হোটেল থেকে শুরু করে কটেজ, সর্বত্রই ছিল পর্যটকের ঠাঁসা। এই ঈদের ছুটিতে সিলেট অঞ্চলে অন্তত ১০-১২ লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ঈদের ছুটিতে সিলেট নগরীর চা বাগানগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বিশেষ করে লাক্কাতুরা ও মালনিছড়া চা বাগানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সবুজের মাঝে সময় কাটাতে ভিড় করেন হাজারো মানুষ।
ঢাকা থেকে সিলেট ঘুরতে আসা মায়মুনা বলেন, সিলেটের যে সৌন্দর্য তা অন্য কোথাও খুব কমই দেখা যায়। কুমিল্লার রবিউল ইসলাম বলেন, সিলেটের প্রতিটি পর্যটন স্পটই দারুণ, উপভোগ্য।
কুষ্টিয়া থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে আসা কবিরুল বলেন, সিলেটের প্রকৃতি আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। তাই সুযোগ পেলেই সিলেটে আসি।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, বিগত কয়েক বছর মন্দা যাওয়ার পর অনুক‚ল আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে এ বছর পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। ফলে পর্যটকরা স্বাচ্ছ্যন্দে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
এদিকে গত রোববার বিকেলে সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র পরিদর্শন করেন সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি পর্যটকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সাদাপাথরকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে করণীয় বিষয়ে মতামত নেন। এ সময় অতিরিক্ত নৌভাড়া আদায়ের অভিযোগে কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়। মন্ত্রী বলেন, সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এর সুফল দেখতে পারবেন এলাকার মানুষ।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন তৎপর ছিল। ট্যুরিস্ট পুলিশ জাফলং জোনের ইনচার্জ তপন তালুকদার বলেন, পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দে প্রকৃতি উপভোগ করেছেন। পর্যটকের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ সবসময় সোচ্চার ছিল। ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উৎপল কুমার চৌধুরী জানান, পর্যটন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল দিয়েছে পুলিশ। অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত ছিল।
এদিকে ঈদুল ফিতরের ছুটিকে ঘিরে মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্প প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড়ে চায়ের রাজধানীর প্রধান আকর্ষণগুলো উৎসবমুখর হয়ে উঠে। টানা সাত দিনের ছুটিতে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের গÐি পেরিয়ে বড়লেখার মাধবকুÐ জলপ্রপাত পর্যন্ত প্রায় সব পর্যটন স্পটেই দর্শনার্থীদের ঢল নামে। বিশেষ করে জেলাজুড়ে বিস্তৃত চা বাগান, ইকো-পার্ক ও বিভিন্ন রিসোর্টে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের সমাগম লক্ষ্য করা গেছে।
জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশীয় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত অবদানেই এবারের পর্যটক সমাগম ঘটেছে। পাশাপাশি, আগের ঈদ মৌসুমগুলোর তুলনায় এ বছর পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
জেলার কমলগঞ্জ টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক মো. সোহেল আহমেদ বলেন, তুলনামূলকভাবে মন্দা সময়ের পর পর্যটকদের বর্তমান আগমন কিছুটা স্বস্তি এনেছে।
শ্রীমঙ্গল চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ বলেন, লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুÐ জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, হাকালুকি হাওর এবং হামহাম জলপ্রপাতের মতো প্রধান আকর্ষণীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য সমাগম হয়েছে।
অপরদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হাওর জেলা সুনামগঞ্জের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো মুখরিত ছিল। ঈদের দিন থেকে শুরু করে টানা কয়েক দিনের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছুটে আসেন জেলার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। বিশেষ করে জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক), যাদুকাটা নদী, বারেক টিলা, দেশের বৃহৎ জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান ও বিশ্বম্ভরপুরে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে।
এদিকে জেলা সদর উপজেলায় মরমী কবি হাসন রাজার বাড়ি, ডলুরা শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানেও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। স্থানীয় হোটেল-রেস্টুরেন্ট, মোটরসাইকেল, লেগুনা, অটোরিকশা চালকসহ পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মাঝেও বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে।



