কলাম
ইরান যুদ্ধক্ষেত্র ও ‘আমেরিকান লাইভ একশন রিসার্চ’
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ মার্চ ২০২৬, ৯:৪১:৩৩ অপরাহ্ন
আরণ্যক শামছ :
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখা হবে এক বিরাট ঐতিহাসিক ভুল। এটি মূলত ইউরেশীয় ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তারের এক মহাযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু। ব্রিকস (BRICS) জোটের সম্প্রসারণ এবং ইরানের সেখানে অন্তর্ভুক্তি ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের জন্য এক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিকসের মূল লক্ষ্য হলো ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলারের একাধিপত্যের অবসান ঘটানো। যদি ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো জ্বালানি শক্তিগুলো ডলারের বদলে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন শুরু করে, তবে মার্কিন অর্থনীতির মূল ভিত্তি ‘পেট্রো-ডলার’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তাই আমেরিকার জন্য এই অঞ্চলটিতে একটি ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা কেবল কৌশলগত নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মধ্যপ্রাচ্য জ্বললে ব্রিকসের অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে, আর এটাই আমেরিকার প্রধান উদ্দেশ্য।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সম্মিলিত সমরাস্ত্রের মোকাবিলা করে নিজের বাহিনীকে অনেক বেশি ‘আপগ্রেডেড’ এবং অভিজ্ঞ করে তুলেছে। বিপরীতে, আমেরিকা সেখানে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না নামতে পেরে তার অত্যাধুনিক এআই (AI), স্পেস টেকনোলজি এবং ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপনগুলোর (DEW) বাস্তব প্রয়োগ বা ‘লাইভ অ্যাকশন রিসার্চ’ করার সুযোগ পায়নি। ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সহায়তায় যে ফ্রন্টটি খোলা হয়েছে, তা মূলত আমেরিকার জন্য এক বিশাল ‘ব্যাটল গ্রাউন্ড ল্যাবরেটরি’। এখানে তারা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা সরাসরি সৈন্য পাঠানোর বদলে তাদের ড্রোন সোয়ার্মিং, স্যাটেলাইট-নির্ভর টার্গেটিং এবং স্বায়ত্তশাসিত যুদ্ধাস্ত্রের চূড়ান্ত ট্রায়াল দিয়ে নিচ্ছে। এটি এক ঢিলে অনেক পাখি মারার মতো এক নিষ্ঠুর কৌশল। ইরানকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে আমেরিকা আসলে চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তির প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকেও পরোক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এতদিন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে মিথ ছিল যে আমেরিকা সবার রক্ষাকর্তা এবং এই অজুহাতে তারা প্রতিটি দেশে মিলিটারি ঘাঁটি বসিয়ে এক ধরনের উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছে; ইরানের এই পাল্টা আক্রমণ সেই মিথকে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে যে, তারা যদি সামরিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তবে আমেরিকার পাহারাদারির আর প্রয়োজন নেই। আর তা ঘটলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকা চিরতরে বিতাড়িত হবে এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। আমেরিকা তাই মরিয়া হয়ে আলোচনার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করছে এবং গোপনে নতুন আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অস্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে শেয়ার বাজারে চলছে এক জঘন্য গোপন খেলা; ট্রাম্পের সোসিয়াল মিডিয়ায় পোস্টের সাথে সাথে শেয়ার বাজার উঠছে আর নামছে, যার আড়ালে একটি বিশেষ ইনসাইডার গ্রুপ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে। এটি যুদ্ধকে কেবল রাজনৈতিক নয়, একটি কর্পোরেট লুণ্ঠনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
এই পরিকল্পনার গভীরতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ইউরেশীয় অক্ষের মেরুদণ্ড হলো চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)। যদি মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়, তবে চীনের এই উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টগুলো কার্যত পঙ্গু বা ‘প্যারালাইজড’ হয়ে যাবে। আমেরিকা খুব ভালো করেই জানে যে, চীনকে অর্থনৈতিকভাবে রুখতে হলে তার বাণিজ্যের পথগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের উস্কানি দিয়ে অত্র অঞ্চলের প্রধান তিন শক্তি—চীন, ভারত এবং রাশিয়াকে ব্যতিব্যস্ত রাখার এক সুগভীর নকশা কাজ করছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড যখন পাকিস্তানকে আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে স্টেটমেন্ট দেন, তখন সেই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ছকটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এই মহাপরিকল্পনার বাইরে নয়। বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে এখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ। ভারত ও চীনের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে আমেরিকা এখানে নিজের ফায়দা লুটে নিতে চায়। মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের ১৯৭১-এর গণহত্যা নিয়ে বিল উত্থাপন বা জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের আড়ালে আসলে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষি কাজ করছে। বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবেশ তৈরি হলে তা কেবল ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে না, বরং চীনের বিনিয়োগকেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই সুযোগে আমেরিকা অত্র অঞ্চলে নিজের সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি স্থায়ী করার অজুহাত পেয়ে যাবে। ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়াকে ধীর বা বন্ধ করার জন্য এই ধরণের আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করা তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই দীর্ঘমেয়াদী লাভ অত্যন্ত গভীর এবং বহুমুখী। তারা কেবল একটি দেশ দখল করতে চায় না, তারা চায় পুরো ইউরেশীয় অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে। ব্রিকসের উত্থানকে থমকে দেওয়া, চীনের রোড ইনিশিয়েটিভকে ব্যর্থ করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনন্তকালব্যাপী অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করতে দ্বিধা করবে না। আমরা এখন যে ‘লাইভ অ্যাকশন রিসার্চ’ প্রত্যক্ষ করছি, তা আসলে এক নতুন সাম্রাজ্যবাদী যুগের সূচনা, যেখানে রক্ত ঝরবে অন্যের ভূমিতে আর প্রযুক্তির উৎকর্ষ ঘটবে পরাশক্তির গবেষণাগারে। এই নিষ্ঠুর দাবাখেলায় ছোট ও উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো কেবল দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার শেষ গন্তব্য এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা।
বর্তমান বিশ্ব এক এমন অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে রণাঙ্গন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি নয়, বরং ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিল, বেইজিংয়ের পলিটব্যুরো এবং সিলিকন ভ্যালির সার্ভার রুম পর্যন্ত বিস্তৃত। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি পৃথিবীকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা ‘দ্য গ্রেট রিসেট অফ জিওপলিটিক্স’ বলে অভিহিত করছেন। মার্কিন কংগ্রেস এবং সিনেটের উচ্চকক্ষগুলোতে এখন যে বিতর্ক চলছে, তা কেবল একটি সামরিক অভিযানের সার্থকতা নিয়ে নয়, বরং আমেরিকান হেজিমনি বা একাধিপত্যের আয়ুষ্কাল নিয়ে। সিনেটররা পর্দার আড়ালে একমত যে, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক আধিপত্যকে রুখতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জ্বালানি ধমনীকে পুরোপুরি পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণে রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এটিই আমেরিকার ‘লং-টার্ম অবজেক্টিভ’ বা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য।
আমেরিকা প্রকৃতপক্ষে চায় এমন এক মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে কোনো একক আঞ্চলিক শক্তি—সেটি ইরান হোক বা তুরস্ক—কখনোই ইজরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বা ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। ইজরায়েলের নিজস্ব লক্ষ্য আবার আরও গভীরে প্রোথিত; তারা কেবল টিকে থাকতে চায় না, বরং তারা চায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে এমনভাবে খণ্ডিত করতে যাতে ‘ওডেড ইনন প্ল্যান’ (Oded Yinon Plan)-এর মতো এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি হয়, যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত থাকবে। এটি কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি একটি আধিপত্যবাদী অস্তিত্বের লড়াই যা আগামী এক শতকের মধ্যপ্রাচ্যকে সংজ্ঞায়িত করবে।
এই সমীকরণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলোর ভবিষ্যৎ এখন সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন। সৌদি আরবের রাজপ্রাসাদে এখন যে ফিসফাস শোনা যায়, তা কেবল তেলের দাম নিয়ে নয়, বরং রাজপরিবারের টিকে থাকা নিয়ে। সমরবিশারদদের মতে, রাজতন্ত্রগুলো এখন এক দ্বিমুখী ফাঁদে বন্দি; একদিকে তারা মার্কিন নিরাপত্তা বলয় থেকে বের হতে পারছে না, অন্যদিকে নিজ দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ তাদের সিংহাসনকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ আসলে একটি মরিয়া চেষ্টা—তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাষ্ট্রকে আধুনিক করার আড়ালে রাজতন্ত্রকে রক্ষা করার এক ঢাল। কিন্তু যদি এই অঞ্চলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে রাজতন্ত্রের পতন হবে তাসের ঘরের মতো, যা জন্ম দেবে এক ভয়াবহ অরাজকতা।
বিশ্ববাজার ও বিশ্ব অর্থনীতি এই মুহূর্তে এক ভঙ্গুর কাঁচের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টগুলোতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, জ্বালানি সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এক ‘অন্ধকার দশকের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ২৫০ ডলারের সীমা স্পর্শ করবে, তখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জিডিপিও সংকুচিত হতে শুরু করবে। এখানে গণতন্ত্রের সত্যিকারের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। পশ্চিমা বিশ্ব যখন গণতন্ত্রের বুলি আউড়ায়, তখন তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের হাতে অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছে কেবল স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নামে। এটিই আধুনিক রাজনীতির চরম দ্বিচারিতা, যেখানে ‘লিবারাল ডেমোক্রেসি’ কে কেবল একটি তাত্ত্বিক বিলাসিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মার্কিন সমরবিশারদদের একটি বড় অংশ এখন ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা সরাসরি সৈন্য পাঠানোর চেয়ে ‘অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধের ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, আকাশপথ এবং সাইবার স্পেস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই একটি রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা তাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে অন্য দেশে গণতন্ত্র রপ্তানি করার তত্ত্বে আর বিশ্বাসী নয়। ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন যুবসমাজ এখন যুদ্ধবিরোধী এবং তাদের মধ্যে একধরনের আইসোলেশনিজম বা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব প্রকট হচ্ছে, যা মার্কিন সিনেটের নীতিনির্ধারণে এক বিশাল চাপ তৈরি করছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা রিলিজিয়াস পারস্পেকটিভ থেকে দেখলে দেখা যায়, এই সংঘাত এখন আর কেবল ভূখণ্ডের নয়, বরং এক ধরনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ বা ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন-এ রূপ নিয়েছে। মেসিয়ানিক বা ত্রাণকর্তার আগমনের ধারণাকে কেন্দ্র করে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিম উগ্রপন্থীরা মনে করছে যে, এই যুদ্ধই হলো সেই অন্তিম লড়াই যা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। এই মানসিকতা যুদ্ধকে রাজনৈতিক সমাধান থেকে সরিয়ে এক উন্মাদনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে যৌক্তিক সংলাপের কোনো স্থান নেই।
বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানদের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন কেবল ফটো সেশনেই সীমাবদ্ধ। পর্দার আড়ালে সবাই এক ভয়াবহ সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে লিপ্ত। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত প্রতিটি জলপথ এখন যুদ্ধের আশঙ্কায় থমথমে। সমরবিশারদরা বলছেন, পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট তারিখে শুরু হবে না, বরং এটি ইতিমধ্যেই ছোট ছোট অনেকগুলো ফ্রন্টে শুরু হয়ে গেছে। তেলের বদলে এখন যুদ্ধ হচ্ছে বিরল খনিজ সম্পদ এবং সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে। যে দেশ প্রযুক্তির এই কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই দেশই আগামী ১০০ বছর বিশ্ব শাসন করবে। আমেরিকা এবং তার মিত্ররা তাই চায় মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ উৎসগুলোকে নিশ্ছিদ্র পাহারায় রাখতে।
অন্যদিকে রাশিয়া এবং চীন এই অবরোধ ভাঙতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। আন্তর্জাতিক আইন এখন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য একটি কারাগার, আর শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য একটি খেলার সরঞ্জাম। যখন পরাশক্তিগুলো তাদের স্বার্থে সীমানা পরিবর্তন করে বা আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, তখন জাতিসংঘের নিরবতা প্রমাণ করে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন মৃতপ্রায়। ব্রাসেলস বা নিউ ইয়র্কের নীতি নির্ধারকরা ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স’ বা বৈশ্বিক শাসন কাঠামো এখন আইসিইউতে শায়িত।
পৃথিবীতে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে?
ভবিষ্যৎ ভাবনার আলোকে বলা যায়, আমরা এক বিশাল ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ বা ডিজিটাল উপনিবেশবাদের দিকে এগোচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হবে তার ল্যাবরেটরি। ড্রোন সোয়ার্মিং থেকে শুরু করে এআই-চালিত কিলিং মেশিন, সবকিছুরই সফল পরীক্ষা হবে এই জনপদে। সাধারণ মানুষের জীবন হবে কেবল বড় বড় টেক জায়ান্টদের জন্য ডেটা পয়েন্ট।
বিশ্ব অর্থনীতিতে আমরা দেখব ‘ডিকার্বোনাইজেশন’ বা কার্বনমুক্ত হওয়ার এক কৃত্রিম চেষ্টা, যা আসলে দরিদ্র দেশগুলোকে জ্বালানি দাসে পরিণত করার একটি কৌশল।
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র হয়তো কয়েকবার পরিবর্তিত হবে, কিছু রাজতন্ত্র ধুলোয় মিশে যাবে এবং নতুন কিছু করপোরেট সিটি-স্টেটের জন্ম হবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মাঝে সাধারণ মানুষের ভাগ্য কোনোদিনই সুপ্রসন্ন হবে না।
সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে যুদ্ধের সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে যাবে; রক্ত ঝরবে কিন্তু মানুষ মরার চেয়ে বেশি সিস্টেম ক্র্যাশ করবে। ব্যাংক থেকে শুরু করে পাওয়ার গ্রিড—সবই হবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন ইরান শর্ত না মানলে তাদের পাওয়ার গ্রিডে হামলা করা হবে, জবাবে ইরানও হরমোজ প্রণালী বন্ধ করে পুরো অঞ্চলের গ্রিড অচল করার হুমকি দিয়েছে।
এই মহাপ্রলয়ের সবচেয়ে করুণ শিকার হবে মানবতা। ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, একবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের ধারণাটিই বিলুপ্ত হতে পারে। তার পরিবর্তে শাসন করবে শক্তিশালী মেগা-কর্পোরেশনগুলো।
আমেরিকা এবং ইসরায়েলের গোপন দলিলপত্রগুলোতে যে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ বা ‘গ্রেটার মিডল ইস্ট’-এর নকশা রয়েছে, সেখানে গণতন্ত্রের কোনো চিহ্ন নেই, বরং আছে সম্পদের ভাগাভাগি। এই মহড়াটি আমরা দেখতে পাই যখন দেখি লোহিত সাগরে মার্কিন নৌবহর প্রহরা দিচ্ছে কিন্তু ফিলিস্তিনি বা ইয়েমেনি শিশুদের ক্ষুধার হাহাকার সেখানে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। দুইশত স্কুল-শিশু বোমা মেরে মেরে ফেলা হলো, কিন্তু পুরো বিশ্ব নির্বিকার।
আফগানিস্তানে ৪০০ রোগিকে হাসপাতালে বোমা হামলায় পাকিস্তান মেরে ফেললো, কিন্তু পুরো পৃথিবী মুখে তালা মেরে বসে থাকল। এটিই হলো সেই রূঢ় বাস্তবতা যেখানে নৈতিকতা কেবল অভিধানে টিকে আছে। আন্তর্জাতিক আইন বলে আর কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব নেই।
এদিকে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও এখন এক ধরণের ‘যুদ্ধ-ক্লান্তি’ কাজ করছে, যা হোয়াইট হাউসের জন্য মাথাব্যথার কারণ। পেন্টাগনের শীর্ষ কর্তারাও এখন ভয়ে আছেন যে, যদি ইরানের মতো কোনো আঞ্চলিক শক্তি সরাসরি পাল্টাপাল্টি পরমাণু হুমকি দেয়, তবে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে যে আতঙ্ক ছড়াবে তা সামাল দেওয়া অসম্ভব হবে। অনেকেই ইতিমধ্যে পদত্যাগ করতে শুরু করেছেন। খোদ রিপাবলিকান পার্টি ট্রাম্প কে সমর্থন করছে না।
এদিকে ট্রাম্প নতুন করে কিউবা আক্রমণের হুমকি দিচ্ছেন; যা হবে ইরান থেকে সরে আসার ‘এস্কেপ গোট’। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে এবং নৈকট্যে অবস্থানের কারণে কিউবা দখল করা ট্রাম্পের জন্য ইরানের চেয়ে শতগুণ সহজ হবে এবং একটি সহজ বিজয় নিয়ে তিনি এপস্টিন ফাইলকে সম্পূর্ণরূপে কবর দিতে সক্ষম হবেন বলে অনেকে মনে করেন।
বিশ্বের বিখ্যাত সামরিক জার্নালগুলো এখন ‘লং-রেঞ্জ প্রিসিশন স্ট্রাইক’ এবং ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস’ (EMP) অস্ত্রের ব্যবহারের কথা বলছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এই ধরণের অস্ত্রের মহড়া চলে, তবে পুরো অঞ্চলের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এর আল্টিমেট গন্তব্য হলো এক বিশাল অন্ধকার যুগ, যেখানে মানুষ আবার আদিম যুগে ফিরে যাওয়ার উপক্রম হবে।
রাষ্ট্রপ্রধানদের জনসম্মুখে দেওয়া বক্তব্যের আড়ালে থাকে লবিস্টদের টাকা আর অস্ত্র ব্যবসার মুনাফা। যখন কোনো রাষ্ট্রপতি শান্তির পায়রা ওড়ান, বুঝতে হবে ঠিক সেই মূহূর্তে তিনি কোনো এক দ্বীপরাষ্ট্রের অস্ত্র কারখানার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এসেছেন। এটিই সেই ‘ডিপ স্টেট’-এর খেলা যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো এই খেলাটি সবচেয়ে ভালো বোঝে, তাই তারা এখন থেকে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা স্বর্ণের ভিত্তিতে লেনদেনের পরিকল্পনা করছে যাতে ডলারের পতন হলেও তারা টিকে থাকতে পারে। কিন্তু মুদ্রার মান থাকলেও যদি ভূখণ্ডই না থাকে, তবে সেই রাজত্বের মূল্য কী?
সবশেষে বলা যায়, আমরা এক এমন সভ্যতার গন্তব্যে পৌঁছেছি যেখানে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমরবিশারদদের রণকৌশল, অর্থনীতিবিদদের গাণিতিক মডেল আর ধর্মতাত্ত্বিকদের ভবিষ্যদ্বাণী—সবই আজ এক রক্তিম বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। আল্টিমেট গন্তব্য হলো এক নতুন ধরণের বিশ্বশাসন ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র নয়, বরং সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স এবং প্রযুক্তিগত অভিজাতরাই হবে পৃথিবীর আসল ঈশ্বর।
আমরা এখন কেবল সেই মহাপ্রলয়ের ড্রামবিট শুনতে পাচ্ছি যা ক্রমে আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এই অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলোর দেখা পাওয়া তখনই সম্ভব, যখন মানুষ শক্তির রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জীবনের মূল্যকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করবে। কিন্তু ইতিহাসের রূঢ় বাস্তবতা আমাদের বলে যে, শান্তি সবসময়ই যুদ্ধের ভস্ম থেকেই জন্ম নেয়। মানুষের তৈরি এই আধুনিক দানব যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, তখন হয়তো কোনো এক সকালে শান্ত সুরমা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কবিরা লিখবেন ধ্বংসের এক নতুন মহাকাব্য। কিন্তু সেই দিন আসার আগে আমাদের প্রতিটি শব্দ হতে হবে এক একটি সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিকুণ্ড কেবল ওই অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি মানবজাতির অস্তিত্বের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি, অনুবাদক।



