বিশেষ কলাম
অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পরমাণু অস্ত্রের অনিবার্যতা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১০:০৮:৫০ অপরাহ্ন
আরণ্যক শামছ :
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী যেন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা আমেরিকা নিজেকে বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই অভিভাবকত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য খেলা—যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ, আদর্শগত আধিপত্য এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে দেশে সরকার পরিবর্তন, ষড়যন্ত্র এবং সরাসরি আক্রমণ চলেছে অবিরাম।
এই প্রেক্ষাপটে একটি স্পষ্ট সত্য উঠে এসেছে: যেসব দেশ পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয়েছে, তারা আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের হস্তক্ষেপ থেকে নিজেদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর যারা এই অস্ত্র ত্যাগ করেছে বা কখনো অর্জন করেনি, তাদের ভাগ্য হয়েছে ধ্বংস বা অবমাননার। এই বক্তব্য কোনো আবেগপ্রসূত অভিযোগ নয়; এটি ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ফল।
আজকের পৃথিবীতে যখন ছোট-বড় সব দেশই নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন এই প্রশ্ন অবশ্যম্ভাবী: কীভাবে একটি দেশ আমেরিকার মতো মহাশক্তির চাপের মুখে টিকে থাকতে পারে? উত্তরটি সরল কিন্তু কঠিন—পরমাণু অস্ত্র। এই প্রবন্ধে আমরা ধাপে ধাপে এই যুক্তির যথার্থতা প্রমাণ করব।
প্রথমে দেখব ঐতিহাসিক পটভূমি, তারপর নির্দিষ্ট কেস স্টাডি, বিপরীত উদাহরণ, তাত্ত্বিক ভিত্তি, অর্থনৈতিক মাত্রা এবং অন্যান্য প্রতিরোধের সীমাবদ্ধতা। শেষে আলোচনা করব এই যুক্তির বিরুদ্ধে কিছু গঠনমূলক সমালোচনা এবং বাস্তবসম্মত পরামর্শ। পুরো আলোচনা চলবে যুক্তির ধারাবাহিকতায়, যাতে প্রতিটি পর্যায়ে আপনারা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে, পরমাণু অস্ত্রই আজকের অরাজক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা।
ঐতিহাসিক পটভূমি: হস্তক্ষেপের ধারা :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমেরিকা যেন নিজেকে বিশ্বপুলিশের ভূমিকায় নিয়ে এসেছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের ছায়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে তারা শুরু করেছিল একের পর এক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এই হস্তক্ষেপের মূলে ছিল তেল, খনিজ সম্পদ, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পুঁজিবাদী আদর্শের প্রসার।
১৯৫৩ সালের ইরানে যা ঘটেছিল, তা এর প্রথম স্পষ্ট উদাহরণ। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক তেল সম্পদ জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন। আমেরিকার সিআইএ এবং ব্রিটেনের এমআই-৬ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে তাঁকে উৎখাত করে শাহকে ক্ষমতায় বসায়। ফলে ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পশ্চিমা কোম্পানির হাতে। এই ঘটনার পর ইরান দশকের পর দশক ধরে অস্থিরতায় ভুগেছে, কিন্তু কখনোই আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করে সরকার পরিবর্তন করতে পারেনি।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায়। প্রেসিডেন্ট জ্যাকবো আর্বেঞ্জ জমি সংস্কার করে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির মতো আমেরিকান কর্পোরেশনের স্বার্থে আঘাত করেছিলেন। সিআইএ অপারেশন পিবিএসাকসেস চালিয়ে তাঁকে উৎখাত করে। ফলে গুয়াতেমালায় দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলে, হাজার হাজার মানুষ মারা যায়।
এরপর চিলিতে ১৯৭৩ সালে সালভাদোর আইয়েন্দেকে উৎখাত করে পিনোচেতের স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইয়েন্দে ছিলেন নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক নেতা, যিনি তামার খনি জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন। সিআইএর সমর্থনে সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। এই সব ঘটনায় একটি সাধারণ সূত্র: কোনো দেশ যদি আমেরিকার অর্থনৈতিক বা আদর্শগত স্বার্থে আঘাত করে এবং তার কাছে পরমাণু অস্ত্র না থাকে, তাহলে সেই দেশের সরকার উৎখাত হতে বাধ্য।
এই ধারা থামেনি। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে, ১৯৮০-এর দশকে নিকারাগুয়ায়, ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডায়, ১৯৮৯ সালে পানামায়—প্রতিটি ক্ষেত্রে বামপন্থী বা অ-আমেরিকান সরকারকে লক্ষ্য করে হস্তক্ষেপ হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকার্নোকে উৎখাত করে সুহার্তোকে ক্ষমতায় আনা হয়। আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম, লিবিয়া—এ এক দীর্ঘ তালিকা। ঠান্ডা যুদ্ধকালীন সময়ে একা আমেরিকা ৬৪টি গোপন এবং ৬টি প্রকাশ্য সরকার পরিবর্তনের অভিযান চালিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে অস্ত্র ধ্বংসের মিথ্যা অজুহাতে আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা হয়। ফলে ইরাক আজও অস্থির।
এই সব ঘটনা প্রমাণ করে যে, অ-পরমাণু দেশগুলোর জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপ ছিল সহজসাধ্য। কোনো পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় তারা সিআইএ অপারেশন, অর্থনৈতিক চাপ বা সরাসরি আক্রমণ চালাতে পেরেছে। এই ঐতিহাসিক ধারা থেকে স্পষ্ট যে, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শুধু কূটনীতি বা প্রচলিত সেনাবাহিনী যথেষ্ট নয়।
লিবিয়া: সতর্কবার্তার গল্প :
এবার আসা যাক সবচেয়ে বড় প্রমাণের দিকে। ২০০৩ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লিবিয়ার সম্পূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করে দেন, রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করেন এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ-কে সবকিছু হস্তান্তর করেন। বিনিময়ে আমেরিকা-ব্রিটেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং প্রতিশ্রুতি দেয় যে লিবিয়া এখন নিরাপদ। গাদ্দাফি ভেবেছিলেন, এতে লিবিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মিলে যাবে।
কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্তের সুযোগ নিয়ে ন্যাটো, আমেরিকার নেতৃত্বে, লিবিয়ায় আক্রমণ চালায়। গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়, সরকার পরিবর্তন হয়। লিবিয়া আজও গৃহযুদ্ধের মধ্যে নিমজ্জিত।
এই ঘটনার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছিলেন, “গাদ্দাফি তার সব পরমাণু সরঞ্জাম জাহাজে তুলে পশ্চিমাদের দিয়ে দিয়েছিল। ফলে সে সব হারিয়েছে।” উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তারাও একই কথা বলেন। তারা বলে, “সাদ্দাম হোসেন এবং গাদ্দাফি পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ করার পর ধ্বংস হয়েছে।”
লিবিয়া প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চুক্তি করেও নিরাপত্তা পাওয়া যায় না যদি পরমাণু অস্ত্র না থাকে। গাদ্দাফি যখন অস্ত্র ত্যাগ করেন, তখন তাঁকে ‘মডেল’ বলে প্রশংসা করা হয়েছিল। কিন্তু আট বছর পরই তাঁকে হত্যা করা হয়। এই বিশ্বাসঘাতকতা বিশ্বের অনেক নেতাকে শিক্ষা দিয়েছে: পরমাণু অস্ত্র ছাড়া পশ্চিমাদের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট প্রমাণ যে, পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ মানে আত্মরক্ষার ক্ষমতা ত্যাগ করা।
বিপরীত চিত্র: পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলো :
এবার দেখা যাক বিপরীত চিত্র। যেসব দেশ পরমাণু অস্ত্র অর্জন করেছে, তাদের ভাগ্য একেবারে আলাদা।
উত্তর কোরিয়া ২০০৬ সাল থেকে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী। আমেরিকা বারবার হুমকি দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, কিন্তু কখনো সরাসরি আক্রমণ করেনি। কারণ? পারমাণবিক প্রতিরোধ। উত্তর কোরিয়া নিজেই বলে, “পরমাণু অস্ত্রই আমাদের অস্তিত্বের গ্যারান্টি। লিবিয়ার ভুল আমরা করব না।”
পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে পরমাণু পরীক্ষা চালায়। তারপর থেকে দেশটিতে কোনো বড় সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেনি। ভারতের অবস্থাও একই। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর থেকে ভারতকে কেউ সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। ইসরায়েলের অঘোষিত পরমাণু অস্ত্র তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যদিও এক্ষেত্রে আমেরিকার সমর্থনও মুখ্য। রাশিয়া ও চীন তো মহাশক্তি হিসেবেই আছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো পরমাণু অস্ত্রধারী দেশকে আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করে সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেনি। এটি কাকতালীয় নয়। এটি পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের (Mutually Assured Destruction-MAD) নীতির ফল। একটি ছোট দেশও মহাশক্তিকে আটকে রাখতে পারে যদি তার কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকে। এই তুলনা স্পষ্ট করে দেয় যে, পরমাণু অস্ত্রই একমাত্র শক্তি যা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
তাত্ত্বিক ভিত্তি: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ :
এই বাস্তবতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব এটিকে সমর্থন করে।
কেনেথ ওয়াল্টজের বাস্তববাদ (Structural Realism) বলে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা একটি অরাজক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব নেই। প্রত্যেক দেশকে নিজের শক্তি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। ওয়াল্টজের বিখ্যাত বক্তব্য “More May Be Better” অর্থাৎ পরমাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়লে বড় যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে। কারণ, কেউ কাউকে আক্রমণের সাহস পায় না। ছোট দেশগুলোর জন্য পরমাণু অস্ত্র হলো ‘মহাসমতাকারী’ (great equalizer), যা দুর্বলকে শক্তিশালীর সমকক্ষ করে তোলে।
জন মিয়ারশাইমারের আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ (Offensive Realism) আরও স্পষ্ট। মহাশক্তিরা অন্য দেশের উত্থান রুখতে চায়। কিন্তু পরমাণু অস্ত্র থাকলে সেই উত্থান রোধ করা প্রায় অসম্ভব।
টমাস হবসের দর্শন অনুসারে, রাষ্ট্রগুলো প্রকৃতির অবস্থায় (state of nature) বিদ্যমান, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের শত্রু। এই অবস্থায় শুধু শক্তিই নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। এই তত্ত্বগুলো থেকে বোঝা যায়, পরমাণু অস্ত্র না থাকলে ছোট দেশগুলোর টিকে থাকার পথ সীমিত।
অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মাত্রা :
অর্থনৈতিক দিক থেকেও একই সত্য বিদ্যমান। যেসব দেশ তেল বা খনিজ সম্পদ জাতীয়করণ করেছে বা ডলার-বহির্ভূত বাণিজ্য চেয়েছে—যেমন ইরান, ইরাক, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা—তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। পরমাণু অস্ত্র থাকলে এই চাপ অনেকাংশে কমে যায়, কারণ তখন সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি হবে অসহনীয়।
সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদেরই অংশ। যেসব দেশ আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যায়, তাদের ‘বদরাষ্ট্র’ (rogue state) হিসেবে চিহ্নিত করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কিন্তু পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলো এই চাপ অনেকাংশে প্রতিহত করতে পারে।
কেন ‘একমাত্র’ পরমাণু অস্ত্র?
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে: কেন শুধু পরমাণু অস্ত্র? প্রচলিত সেনাবাহিনী দিয়ে কি প্রতিরোধ গড়া যায় না?
ভিয়েতনাম যুদ্ধের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা শক্তিশালী আমেরিকান বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। কিন্তু তার জন্য তাদের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দিতে হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিয়েতনামের পাশে ছিল চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরমাণু শক্তিধর দেশের সমর্থন। কূটনীতি দিয়ে কিউবা টিকে আছে, কিন্তু ৬০ বছরের নিষেধাজ্ঞায় তাদের অর্থনীতি ধুঁকছে। জোট গঠন করেও শক্তিশালী শত্রুর হাত থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা পাওয়া যায় না।
একমাত্র পরমাণু অস্ত্রই তুলনামূলক কম খরচে উচ্চ প্রভাবের প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এটি না থাকলে বড় শক্তির হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকে।
গঠনমূলক সমালোচনা ও তার জবাব :
এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য—পরমাণু অস্ত্রই সার্বভৌমত্ব রক্ষার একমাত্র নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার—এর বিরুদ্ধে বেশ কিছু যুক্তি রয়েছে। এগুলোকে অস্বীকার না করে বরং খোলামনে আলোচনা করা জরুরি। কারণ, একটি শক্তিশালী যুক্তি কেবল নিজের পক্ষে প্রমাণ নয়, বরং বিপক্ষের সেরা যুক্তিগুলোরও জবাব দিতে পারে।
প্রথম সমালোচনা: দুর্ঘটনা ও অসাবধানতার ঝুঁকি
পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা ও ধারক দেশ বাড়লে যে কোনো সময় ভুলবশত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, ভুল বার্তা বা কমান্ড চেইনের ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনিচ্ছাকৃত পরমাণু যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। ইতিহাসে এমন ভুল বার্তার উদাহরণও রয়েছে। যেমন, ১৯৮৩ সালে সোভিয়েত আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ভুল করে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংকেত দিয়েছিল। শুধু কর্নেল স্তানিস্লাভ পেত্রভের বুদ্ধিমত্তার কারণে সে বার বিশ্ব রক্ষা পেয়েছিল। এই ধরনের ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না।
জবাব: এই যুক্তি সত্য, তবে বাস্তবতা হলো—পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলো এ পর্যন্ত সেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ১৯৪৫ সালের পর থেকে প্রায় ৮০ বছরে কোনো দেশ অনিচ্ছাকৃত পরমাণু যুদ্ধে জড়ায়নি। বরং পরমাণু অস্ত্র থাকার কারণেই বৃহৎ শক্তিগুলো একে অপরকে আক্রমণ করতে সাহস পায়নি। কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস (১৯৬২) ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত, কিন্তু দুই পক্ষই শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছিল কারণ তারা জানত, একটি ভুল ধ্বংস ডেকে আনবে। অন্যদিকে, যেসব দেশের কাছে পরমাণু অস্ত্র ছিল না—ভিয়েতনাম, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া—তারা বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে। তাই দুর্ঘটনার ঝুঁকি মেনে নিলেও, বাস্তবতা বলছে, অ-পরমাণু দেশগুলোর জন্য নিয়মিত ও নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি ভয়াবহ।
দ্বিতীয় সমালোচনা : অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক ধ্বংস
পরমাণু অস্ত্র তৈরি ও সংরক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, দুর্লভ খনিজ সম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ। একটি ছোট দেশ যদি এই প্রতিযোগিতায় নামে, তাহলে তার অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে। উত্তর কোরিয়ার উদাহরণই দেখা যাক—দেশটি পরমাণু কর্মসূচির কারণে তীব্র নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। তাই প্রশ্ন হলো, পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে গিয়ে নিজের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ?
জবাব: এই যুক্তিতে সত্যতা আছে, কিন্তু এর দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, পরমাণু অস্ত্র তৈরি মানেই যে অর্থনীতি ধ্বংস হবে, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভারত ও পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর হয়েও তাদের অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে।
দ্বিতীয়ত, পরমাণু অস্ত্রকে ব্যয় হিসেবে না দেখে ‘বীমা প্রিমিয়াম’ হিসেবে দেখা উচিত। লিবিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, গাদ্দাফি পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ করে অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন, কিন্তু আট বছর পরই তিনি নিহত হন এবং লিবিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অর্থাৎ, পরমাণু অস্ত্র না থাকলে একটি দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন করাও সম্ভব নয়, কারণ যে কোনো সময় বহিঃশক্তি এসে সেই উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক কষ্ট মেনে নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব রক্ষার পথ বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তৃতীয় সমালোচনা : এনপিটি লঙ্ঘন ও বিশ্বব্যবস্থার অস্থিরতা
পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, যেসব দেশ ১৯৬৭ সালের আগে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেনি, তারা মূলত তা তৈরি করতে পারবে না। বিনিময়ে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তি সরবরাহ এবং নিজেদের নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নতুন দেশগুলো এনপিটি লঙ্ঘন করে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে। এতে চুক্তিটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ছে। যদি সব ছোট দেশ পরমাণু অস্ত্র নিতে শুরু করে, তাহলে বিশ্বব্যবস্থা পুরোপুরি অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
জবাব: এনপিটি লঙ্ঘনের দায় কি শুধু নতুন দেশগুলোর? ১৯৭০ সালের পর থেকে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার কমায়নি বরং আধুনিকায়ন করেছে। আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন—কেউই নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি রাখেনি। বরং তারা নিজেদের অস্ত্র নিয়ে অন্য দেশকে হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল, হুমকি দিয়েছে ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে। ফলে অ-পরমাণু দেশগুলো বুঝতে পেরেছে, এনপিটি তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। লিবিয়া এনপিটি মেনেছিল, পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ করেছিল—ফলে কী হয়েছিল তা আমরা দেখেছি। তাই এনপিটি লঙ্ঘন নিয়ে সমালোচনা করার আগে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যতক্ষণ না তারা নিরস্ত্রীকরণে অগ্রসর হচ্ছে, ততক্ষণ অন্যান্য দেশের আত্মরক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করা যায় না।
চতুর্থ সমালোচনা : পরমাণু যুদ্ধের ভয়াবহতা
পরমাণু অস্ত্রের প্রধান সমালোচনা হলো এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। একটিমাত্র পরমাণু বোমা লক্ষ লক্ষ মানুষকে মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারে। যদি বড় কোনো যুদ্ধ বাধে এবং পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তাহলে সমগ্র মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ‘পারমাণবিক শীত’ (nuclear winter) তত্ত্ব বলে, বড় মাপের পরমাণু যুদ্ধের ফলে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারবে না, খাদ্যশস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে, এবং পুরো প্রজাতিই বিলুপ্তির মুখে পড়বে। তাই পরমাণু অস্ত্রের বিস্তারকে উৎসাহিত করা মানে মানবতাকে চরম বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া।
জবাব: এই সমালোচনা সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আবেগঘন। হিরোশিমা-নাগাসাকির পর থেকে আমরা জানি পরমাণু অস্ত্র কতটা ভয়াবহ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এই ভয়াবহতাই পরমাণু অস্ত্রকে প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার বানিয়েছে। যুক্তিটা সহজ: যখন দুই পক্ষের কাছেই এমন অস্ত্র থাকে যা সম্পূর্ণ ধ্বংস নিশ্চিত করতে পারে, তখন কেউ প্রথমে আক্রমণ করতে চায় না। এটাই MAD বা পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের নীতি।
১৯৪৫ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু একই সময়ে, পরমাণু অস্ত্র না থাকা দেশগুলো নিয়মিত যুদ্ধের শিকার হয়েছে। ভিয়েতনামে ৩০ লাখ মানুষ মারা গেছে, ইরাকে ১০ লাখ, আফগানিস্তানে অগণিত। অর্থাৎ, পরমাণু অস্ত্রের অভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রচলিত অস্ত্রে মারা যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন হলো—পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাব্য ভয়াবহতা কি এত বড় যে, তার চেয়ে নিশ্চিত ও চলমান মৃত্যুকে মেনে নেওয়া উচিত? এটি নৈতিক দর্শনের এক কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে দেশগুলো তাদের অস্তিত্ব রক্ষার পথ বেছে নেয়। যতদিন পরমাণু অস্ত্র আছে এবং অন্য দেশের কাছে আছে, ততদিন নিজেকে রক্ষার জন্যও তা রাখা ছাড়া উপায় নেই।
সামগ্রিক মূল্যায়ন :
এই চারটি সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু এগুলোর প্রতিটির জবাবেই একটি মৌলিক সত্য ফিরে আসে: যাদের পরমাণু অস্ত্র নেই, তারা প্রতিনিয়ত আক্রমণের শিকার। আর যাদের আছে, তারা অনেকটাই নিরাপদ। এটি কোনো তত্ত্ব নয়, বিগত ৭০ বছরের ইতিহাস। দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অর্থনৈতিক ব্যয়, এনপিটি লঙ্ঘন, এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা—এই সব কিছু সত্য। কিন্তু এই ঝুঁকিগুলো নেওয়ার বিকল্প হলো অরক্ষিত অবস্থায় থাকা, যার ফলাফল আমরা লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়ার ঘটনায় দেখেছি।
পরমাণু অস্ত্র কোনো আদর্শিক পছন্দ নয়; এটি বাধ্য হয়ে নেওয়া একটি পথ। যতদিন বিশ্বে শক্তির রাজনীতি চলবে, ততদিন পরমাণু অস্ত্রই থাকবে দুর্বলের শেষ অস্ত্র। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে শুধু সমালোচনা করলে চলবে না—বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ছোট দেশগুলোও নিরাপদ বোধ করবে। কিন্তু সেই বিকল্প তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, পরমাণু অস্ত্রই টিকে থাকার একমাত্র পথ।
বাস্তবসম্মত পরামর্শ :
এখন প্রশ্ন হলো, ছোট দেশগুলো কী করতে পারে? কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ:
১. পরমাণু কর্মসূচি গোপনে এগিয়ে নেওয়া: আন্তর্জাতিক নজর এড়িয়ে প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করা, পাশাপাশি প্রচলিত সেনাবাহিনী শক্তিশালী করা।
২. বহুমুখী জোট গঠন: ব্রিকস বা অনুরূপ জোটের মাধ্যমে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
৩. কূটনৈতিক তৎপরতা: নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য কূটনীতি চালিয়ে যাওয়া, কিন্তু মূল অস্ত্র কর্মসূচি কখনো পুরোপুরি ত্যাগ না করা।
৪. আন্তর্জাতিক নিয়ম পরিবর্তনের প্রচেষ্টা: জাতিসংঘে চাপ সৃষ্টি করা যাতে পরমাণু অস্ত্রধারী সব দেশকে সমান চোখে দেখা হয় এবং অ-পরমাণু দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
৫. অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা: নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় নিজস্ব খাদ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা।
উপসংহার :
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ৭০ বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, অ-পরমাণু দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব বারবার বিপন্ন হয়েছে। লিবিয়া, ইরাকের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে উত্তর কোরিয়া, ইরান আজ বলছে—পরমাণু সক্ষমতা ছাড়া প্রকৃত নিরাপত্তা নেই। এটি কোনো মতাদর্শগত বক্তব্য নয়; এটি কঠোর বাস্তবতা।
আজকের অরাজক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়, যেখানে শক্তিই শেষ কথা বলে, সেখানে সার্বভৌমত্ব রক্ষার একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো পরমাণু অস্ত্র। যারা এই বাস্তবতা বুঝবে, তারাই টিকে থাকবে আগামীর বিশ্বে।
পরিশেষে, একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে আমি গভীরভাবে যেকোনো ধরনের যুদ্ধ, প্রতিহিংসা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ঘোর বিরোধী। আমার এই বিশ্লেষণ শুধুমাত্র বিশ্বপরিস্থিতির বর্তমান প্রতিচ্ছবির এক সহজ উপস্থাপন মাত্র।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও পরিবেশবাদী সংগঠক।



