এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ প্রসঙ্গে স্পিকার
এম ইলিয়াস আলী : ওই হত্যাকান্ড আপানিশড যাবে না
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৯:০৩ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিখোঁজ বিএনপি’র সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর বিষয়ে পদক্ষেপ চাইতে তাঁর স্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নোটিশ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। তিনি এও বলেন, ইলিয়াস আলীর ‘হত্যাকাণ্ড’ আনপানিশড যাবে না। এ ব্যাপারে এই সংসদ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা তার।
এদিকে, এম. ইলিয়াস আলী গুম-হত্যার ঘটনাকে চরম নিষ্ঠুরতা ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিচার দাবি করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিনে এক অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে স্পিকার ও হুইপ এসব কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম সিলেটের ডাককে বলেন, আগামী ৭ফেব্রুয়ারি ডিজিএফআইয়’র তৎকালীন মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলী গুমসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হবে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ আরও তথ্য পাওয়া যাবে। কারণ তিনি সরাসরি এসব কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে মন্তব্য করেন চিফ প্রসিকিউটর।
গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশন আসরের নামাজের বিরতির পর শুরু হলে সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু পয়েন্ট অফ অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ- বালাগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম. ইলিয়াস আলী গুম-হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে বক্তব্য শুরু করেন। হুইপ দুলু বলেন, আজকে (বৃহস্পতিবার) প্রতিটি পত্রিকার লিড নিউজে ‘ইলিয়াস আলীর গুম নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য’ উঠে এসেছে।
এসময় একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম তুলে ধরে হুইপ দুলু বলেন, ‘ইলিয়াস আলীর গুম নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য’, ‘বনানী থেকে তুলে নেওয়া হয় র্যাব-১ সদর দপ্তরে’, ‘লাশ ফেলা হয় ধলেশ্বরীতে’। আমি কথাটি এ জন্যই বলছি- যে অপরাধ হয়েছে তা আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধের কাজ।
ইলিয়াস আলীর সাথে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইলিয়াস আলী আমার বন্ধু ছিল। তার সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত। এখানে আমরা যারা এমপি আছি, আমরা সবাই কিন্তু এক সাথেই পার্লামেন্টে থাকতাম। তিনি আরও বলেন, পত্রিকার মাধ্যমে আমরা যেটুকু জেনেছি, “২০১২ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০ মার্চের” মধ্যে ইলিয়াস
আলীকে হত্যা করা হয়। এরপর তাকে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমার প্রশ্নটি ঠিক সেই জায়গায়- যে মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এই কাজটা করতে পারে। আমার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাস এখানে ফেল করবে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনেত্রী আখ্যা দিয়ে বিএনপি নেতা দুলু বলেন, শেখ হাসিনা যে কি ধরনের অভিনেত্রী ছিলেন; তার নির্দেশ ছাড়া যে রকম ইলিয়াস আলী গুম হননি, ঠিক তেমনই তার নির্দেশ ছাড়া ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, অথচ ২১ তারিখে তার স্ত্রী-শিশু সন্তান তার (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদেরকে আশ্বস্ত করা হয়; যে ইলিয়াসকে খুব তাড়াতাড়ি ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।
হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বক্তব্যের পরপরই স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদও (বীরবিক্রম) এবিষয়ে বক্তব্য দেন। স্পিকার বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হৃদয় বিদারক, সারাদেশের বহুল আলোচিত একটি বিষয়। ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী সংসদ সদস্য এখানে উপস্থিত রয়েছেন। তিনিও বিষয়টি সংসদে একবার উত্থাপন করেছেন”।
“আমি মাননীয় সদস্য তাহসিনা রুশদিরকে অনুরোধ জানাব, আপনি যদি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে চান, আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি লিখিত নোটিশ দিতে পারেন। তাছাড়া এ ধরনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করার জন্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যাল ইতোমধ্যে সিমিলার কতগুলো ঘটনার তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইলিয়াস আলী আমাদের অত্যন্ত প্রিয় স্বজন এবং এদেশের একজন উঠতি জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। স্পিকার আরও বলেন, ইলিয়াস আলী হত্যাকান্ড এভাবে আনপানি যাবে না। নিশ্চয়ই এই সংসদ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভূমিকা রাখবেন”।
এর আগে গত সোমবার এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনাও জাতীয় সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “আমার স্বামী ইলিয়াস আলী কোথায় ? জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গুম ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে আগামী ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ আসামি শেখ মামুন খালেদকে হাজির করার আদেশ দেন। গত ২৫ মার্চ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতার করে। এরপর দু’দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদেই শেখ মামুন খালেদ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলী গুম-হত্যার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। ওয়ান ইলেভেন’র অন্যতম কুশীলব শেখ মামুন খালেদের বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান ও র্যাব মহাপরিচালককে গুমের মিশন বাস্তবায়ন করার নির্দেশনা দেন। গুমের পুরো প্রক্রিয়া রেকি ও বাস্তবায়ন করে র্যাব-১। র্যাবকে সহযোগিতা করে ডিজিএফআই’র কিছু কর্মকর্তা। মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান সবচেয়ে বড় ভূমিকা ও ইলিয়াস আলী গুম মিশনের নেতৃত্ব দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ মামুন নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে অন্যদের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছেন। তার ভাষ্যমতে, শেখ হাসিনা ঘটনার আগে-পরে জিয়াউল আহসানের সাথে একাধিকবার কথা বলেন। সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৭এপ্রিল ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিপত গাড়ি চালককে বনানী থেকে গুম করে র্যাব-১ সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। সেখানে ইলিয়াস আলীকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয়। তুলে নেওয়ার পর ১৭ থেকে ২০ এপ্রিলের কোনো এক রাতে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া হতে পারে জানান শেখ মামুন।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে বুধবার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগেই গুম করার সংকেত দেওয়া হয়েছিল। ইলিয়াস আলী টিপাইমুখ বাঁধ ও পার্শ্ববর্তী একটি দেশের সাথে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এই বাঁধ ও চুক্তি ওই দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইলিয়াস আলী এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও করেন। এসব কারণে তিনি সরকারের রোষানলে পড়েন। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই ইলিয়াস আলীকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
অপরদিকে, ওম হওয়া স্বামী ইলিয়াস আলীর সন্ধান চেয়ে ওই বছরের ২১ এপ্রিল তাহসিনা রুশদির লুনা সন্তানদের নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন। পরে শেখ হাসিনা জিয়াউল আহসানকে ফোন দিলে ইলিয়াস আলীকে চূড়ান্ত গুম করার ইঙ্গিত দেন ওই কর্মকর্তা।
তদন্ত সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে সন্ধ্যার পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ইলিয়াস আলী তৎকালীন শেরাটন হোটেলে (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল) বসে মিটিং করেন। রাত ১১টার দিকে তিনি নেতাকর্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তখন থেকেই জিয়াউল আহসানের গুম স্কোয়াডের এক সদস্য তাকে অনুসরণ করছিল। তিনি একটু পর পর ইলিয়াস আলীর গাড়ির অবস্থান জিয়াকে জানিয়ে দেন। মহাখালী পৌঁছার পর ইলিয়াস আলীর গাড়ি সরাসরি অনুসরণ শুরু করে জিয়ার টিম। মহাখালী থেকে বনানীর ২ নম্বর সড়কে যাওয়ার পর পাড়িকে ধাক্কা দিয়ে থামানোর পর এই টিমের সদস্যরা ড্রাইভার আনসারসহ ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ ১৪ বছরেও এম. ইলিয়াস আলী গুমের কোনো রহস্য উদঘাটন হয়নি। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের স্বীকার করা তথ্যে-এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।



