কোতোয়ালির এসি সোহেল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তুপ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ জুন ২০২৬, ৯:৫২:২১ অপরাহ্ন
# তিন মামলার বিচার চলছে # স্ত্রীর মামলায় ১২ দিনের হাজতবাস
# দুর্নীতি তদন্তে দুদক
কাউসার চৌধুরী
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেম থেকে বিয়ে। এরপর যৌতুক দাবি, নির্যাতন, যৌতুক, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুই নারীর ছয় মামলা। বর্তমানে তিন মামলার বিচার চলছে। আরও দু’মামলার বিচার শুরুর অপেক্ষায়। এক স্ত্রীর মামলায় টানা ১২ দিনের হাজতবাস। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে খোঁজ মিলেছে দুর্নীতিরও। সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার সোহেল উদ্দিন (৩৬)-এর বিরুদ্ধে রয়েছে এসব অভিযোগ। আদালতে বিচারাধীন মামলার আসামি কিভাবে থানার দায়িত্ব পালন করছেন-এ নিয়ে সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের প্রশ্ন, যেখানে খোদ পুলিশ কর্মকর্তা নারী নির্যাতন মামলার আসামি সেখানে পুলিশ কতটুকু নিরপেক্ষ সেবা দিতে পারবে।
এএসপির বিরুদ্ধে দুই নারীর ছয় মামলা
মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার মনতলা গ্রামের মৃত মো. হাবিব উল্লার পুত্র মো. সোহেল উদ্দিন ২০১৭ সালে ৩৬ তম বিসিএস পরীক্ষায় সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে উত্তীর্ণ হন। তিনি একের পর এক নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেন। ২০১৯ সালে ফেইসবুকে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার হামিদপুরের (মন্ডলবাড়ি) জাহাঙ্গীর আলমের কন্যা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী রিফাত জাহান স্নিগ্ধার সাথে তার পরিচয় হয়। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে স্নিগ্ধার সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন এবং ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল ৩ লাখ টাকা মোহরানায় তাদের বিবাহ হয়। বিয়ের কিছু দিন পরে স্নিগ্ধা জানতে পারেন, সোহেল ইতোপূর্বে আমিনা কিবরিয়া মিশু নামের এক নারীকে বিবাহ করেছেন। একপর্যায়ে সোহেল ও স্নিগ্ধার মাঝে এ নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়। পরবর্তীতে যৌতুক দাবি, নির্যাতন, প্রতারণাসহ নানান অভিযোগে স্নিগ্ধা বাদী হয়ে সোহেলের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা দায়ের করেন। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের মামলা নম্বর- সিআর ১১১৮/২০২২, ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মামলা নম্বর- সিআর ১৭৬/২০২৩, ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের মামলা নম্বর-১৩৪৫/২০২৪ এবং ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের মামলা নম্বর- সিআর ১১৭/২০২৪।
এছাড়াও ঢাকার শাহজাহানপুরের (১৬১- মালিবাগ) মোশাররফ হোসেনের কন্যা সহকারী কর কমিশনার (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) মোসা. তানজিনা সাথী বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। সিআর মামলা নম্বর-২৩৪১/২০২২। তানজিনা সাথী থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
আছে নারী নির্যাতনের অভিযোগ
এএসপি সোহেল উদ্দিন তার স্ত্রী রিফাত জাহান স্নিগ্ধাকে মারধরের ঘটনায় মামলা দায়ের করেন। মারধরের বিষয়টি খোদ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইর তদন্তে প্রমাণিত হয়। পিবিআই এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-৩০ এ জমা দিয়েছে। এছাড়াও সহকারী কর কমিশনার তানজিনা সাথীকেও তিনি মারধর করেন। তানজিনা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
তিন মামলায় বিচার কার্যক্রম চলছে
ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত-১৫ এর বিচারক নাজমিন আক্তার ইভার আদালতে গত ৯ জুন মঙ্গলবার বিবাদী সোহেল উদ্দিন প্রিন্সের উপস্থিতিতে দন্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১ জুলাই বুধবার ধার্য রয়েছে।
এছাড়াও রিফাত জাহান স্নিগ্ধার দায়েরকৃত দুটো মামলার বিচার কার্যক্রমও ইতোমধ্যে আদালতে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সিআর ১১১৮/২২ নং মামলার (যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারা) বিচার শুরু হয় এবং ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট সিআর ১৩৪৫/২৪ ( প্রতারণা -৪২০) মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
আগামীকাল বুধবার সিআর মামলা নং-১৭৬/ ২০২৩ এবং ১১৭/২০২৪ এর অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য রয়েছে বলে বাদী রিফাত জাহান স্নিগ্ধা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, গত তারিখে এই মামলাগুলোর চার্জ গঠনের কথা ছিল। কিন্তু আসামি পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত শেষ বারের মতো সময় দিয়ে ১ জুলাই চার্জ গঠনের তারিখ ধার্য করেন।
অভিযোগের শেষ নেই
মামলার বাদী রিফাত জাহান স্নিগ্ধা জানান, তার সাথে বিয়ের আগে বিবাদী সোহেল উদ্দিন ইতোপূর্বে আমিনা কিবরিয়া মিশু নামের এক নারীকে বিবাহ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝামেলা তৈরির মধ্যেই তানজিনা সাথী নামের সহকারী কর কমিশনারের সাথে সম্পর্কে জড়ান। একই সময়ে নওশীন মজুমদার নামের পুলিশের এসআইর সাথে সম্পর্কে জড়ান। জামালপুর ফজিলাতুন্নেছা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক তাইয়েবা তাবাসসুমকে বিয়ে করেন।
ওই কর কর্মকর্তা তানজিনা সাথীর কাছ থেকে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে প্রতারণার মাধ্যমে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে সোহেল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একাধিক নারীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়াসহ তার সাত ধরনের স্বাক্ষর মামলার তদন্তে পাওয়া গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, সোহেল অনেকটা গোপনে এসএমপিতে পোস্টিং নেন।
দুর্নীতির তদন্তে দুদক মাঠে
কোতোয়ালির এসি সোহেল উদ্দিন চাকরির প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে অস্বাভাবিক সম্পদ গড়ে তুলেন। যে সময়ে তার চাকরির আয় সর্বসাকুল্যে ১৭ লাখ টাকা ওই সময়ে তার সাড়ে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আয়কর রিটার্নেও বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ তার পারিবারিক পটভূমিতে এমন সম্পদের তার কোনো উৎস নেই। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে তার অবৈধ সম্পদের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কুড়িগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক আবু হেনা আশিকুর রহমান সিলেটের ডাককে বলেন, এএসপি সোহেল উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রতিবেদন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। দুদক কমিশন গঠনের পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ঘটনার শিকার নারীদের বক্তব্য
ঘটনার শিকার নারী রিফাত জাহান স্নিগ্ধা এ বিষয়ে বলেন, বিয়ের পর সোহেল একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। ২৫/৩০ লাখ টাকার গাড়ির জন্যে চাপ, ৩ লাখ টাকা যৌতুক ও ডায়মন্ড রিং নিতে চাপ প্রয়োগ করে। তদন্তে এটি প্রমাণিত হয়। একাধিকবার মারধরের শিকার হয়ে জোরপূর্বক বগুড়ায় পাঠানো হয়। পরে ভুয়া তালাক ও জাল কাগজ দেখিয়ে আদালত থেকে জামিন নেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়। আমার মামলায় সোহেল ১৩ দিন জেল খাটেন এবং ২ অক্টোবর ২০২২ থেকে সাসপেন্ড হন। স্নিগ্ধা আরও নানান অভিযোগ তুলে ধরেন।
আরেক নারী মোসা. তানজিনা সাথীও সোহেল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তুলে ধরেন।
অভিযুক্ত এএসপি সোহেল যা বললেন
এসব অভিযোগের বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার সোহেল উদ্দিনের সাথে এ প্রতিবেদক একাধিকবার সেলফোনে কথা হয়।
তিনি বলেন, সকল অভিযোগ বানোয়াট – কোনো সত্যতা নেই।
রিফাত জাহান স্নিগ্ধা তার স্ত্রী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাকে আমি ডিভোর্স দিয়েছি। তানজিনা সাথী দুদকের তিনটি মামলার আসামি। দুদকের মামলা থেকে রক্ষা পেতে এখন তানজিনা নাটক সাজিয়েছেন। একটি চক্র তার বিরুদ্ধে এসব করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম এ বিষয়ে বলেন, যতটুকু জেনেছি কোতোয়ালির এসির বিরুদ্ধে মামলাগুলো সিভিল মামলা। সিভিল মামলা হলে চলতে পারে। ক্রিমিনাল মামলা হলে তাকে প্রত্যাহার করা হতো। তার বিরুদ্ধে কোনো ক্রিমিনাল মামলা আছে বলে কেউ তথ্য দেয়নি। তবুও কারও কোনো অভিযোগ থাকলে পুলিশ সদর দপ্তরসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জানাতে পারেন।



