গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না: শফিকুর রহমান
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:০২:৪১ অপরাহ্ন
বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। গত সাত মাসে সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে চীন, ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়াই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান। একা বাংলাদেশের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। আমি নিজেও একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছি এবং সেখানে তাঁদের দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখেছি। রোহিঙ্গাদের জন্য সাময়িক অর্থসহায়তা দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। তাঁদের নিজ দেশে ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে কার সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা হবে, সেটিও জটিল বিষয়।
এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের পাশাপাশি এ দুই দেশেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমন্বিত উদ্যোগ নিলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জ্বালানি নিয়ে জামায়াতের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ নিতে রাজি হয়নি সরকার। বিদ্যুৎ নিয়ে তাঁদের দেওয়া পরিকল্পনাও সরকার গ্রহণ করেনি।
জামায়াত আমীর বলেন, গত সাত মাস বা সাড়ে সাত মাসের মধ্যে দেশকে আমরা কোন পথে দেখছি? আপনারা যে পথে দেখছেন, আমিও সে পথে দেখছি।দেখেন, সংকট তো প্রথম দিন থেকেই তৈরি হয়ে গেছে। আর এটা সরকার নিজেই তৈরি করল। তারা জনমতের রায়কে মানল না। মানলে একই দিনে দুইটা শপথ হবে এবং একই সময়ে দুইটা ভিন্ন ভিন্ন অধিবেশন আহ্বান হবে। আগে তারা বললেন যে আমরা মানব। কোনো প্রকারেই কিন্তু তারা না বলেন নাই। আমাদের আগে তারা বলছেন। এখন তারা বলতেছেন আমরা মানব না। সংকট ওখান থেকে তৈরি।
তিনি বলেন, আমাদের দাবি কী ছিল? যে যে কারণে স্বৈরাশাসন কায়েম হয়েছিল, আমরা বলেছিলাম যে ঐ কারণগুলো বদলাতে হবে। একটা পরিবর্তন, একটা রূপান্তর আনতে হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা লাগবে। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন করা লাগবে। স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন করা লাগবে। এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার কমিশন করা লাগবে। নির্বাচন কমিশনটা কী ভিত্তিতে হবে, সেটার একটা ফর্মুলা- সবাই এগ্রি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী দুইবারের বেশি কেউ থাকবেন না। পরে উনারা বললেন না, ১০ বছর। আমরা বুঝলাম যে কোনো সময় যদি সরকারের মাঝখানে পতন হয়ে যায়, তাইলে বোধহয় উনারা ১০ বছর বলছেন। হোয়াটেভার মে বি, আল্টিমেটলি এটার সাথে বড় কোনো ডিসএগ্রিমেন্ট নাই। শেষ পর্যন্ত সবাই ১০ বছর মেনে নিছে। দলীয় প্রধান, তিনি সরকার প্রধান হবেন না। এটা তো দুনিয়ার বহু দেশে আছে। এটার প্র্যাকটিস উন্নত দেশগুলোতে আছে। ট্রাম্প কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট না। বাইডেন তিনি ডেমোক্রেটদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। সেই দেশগুলো তো চলেছে। আবার কোনো কোনো দেশে এটা আছে যে একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান এবং সরকার প্রধান- দুইটাই আছে। মোদী ভারতে, তিনি কিন্তু তাঁর দলের প্রধান নন। এরকম উদাহরণ দুনিয়ায় বহু আছে।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এরপরে যখন আমাদের চাপ, বৈশ্বিক চাপ, সবকিছু যখন আসছে- আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন বলছে আর এক টাকাও আমরা স্যাংশন দেব না, এটা যদি আপনারা পরিবর্তন না করেন, তখন বাধ্য হয়ে আবার বিলে এটা ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। তো আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এ দেশের মানুষের চাপে এটা হতো না, যদি দুনিয়ার ওই সমস্ত জায়গা থেকে চাপ না আসত। তো দুনিয়ার চাপে আপনি নতি স্বীকার করলেন, মেনে নিলেন। দেশের বাস্তবতাটা মেনে নিলে আরো সম্মানিত হতেন না?
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন- আমরা তো আগেই চেয়েছিলাম যে জাতীয় নির্বাচনের আগে। এখন তো দুই বছরের অধিক সময় চলে গেল। অনেক জায়গাতেই তো নির্বাচিত প্রতিনিধি নাই, পালিয়ে গেছে। মানুষের সাফারিং হচ্ছে। কিন্তু এখনো গড়িঘড়ি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী এবং স্বাধীন। তো স্বাধীন নির্বাচন কমিশন একটা শিডিউল ঘোষণা করল, এটা বন্ধ করা হলো কেন? এটা কি প্রমাণ করে যে ওই নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং শক্তিশালী?
এখন আনসার্টেইন হয়ে গেল। কখন হবে- একেকজন একেক ধরনের কথা বলতেছে। এই সব মিলায়ে একটা গুলমাল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকে বলে যে ৬ মাসের মাথায় আপনারা আন্দোলন শুরু করলেন। আমরা বলি যে ৬ মাসের মাথায় তো সব শেষ করে দিল। আমরা এখন কী করব? বসে বসে আমরা খোদনে খাজেখান করব, নাকি জাতির কিছু দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে আছে, সেটা আমাদের পালন করতে হবে? আমরা সেটা পালন করার চেষ্টা করছি। আমাদের এই দাবিগুলো যদি আপনাদের কাছে যৌক্তিক দাবি বলে মনে হয়, তাহলে আমরা সবার সহযোগিতা চাইব।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানান হাবিবুর রহমান, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-ঊন-নূর, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ও আসন্ন সিটি নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, মহানগর সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহাজান আলী ও জেলা সেক্রেটারী জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।
এর আগে এদিন সকালে আকাশপথে সিলেটে আসেন তিনি। পরে তিনি নগরীর আমান উল্লাহ কনভেনশন হলে সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখেন। পরে বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।



