লকডাউনে প্রতিবেশীদের সহায়তা দিয়ে শুরু, এখন প্রতি সপ্তাহে ৬০০-এর বেশি মানুষের পাশে সেন্ট অ্যালবানস কমিউনিটি প্যান্ট্রি
প্রাইড অব ব্রিটেন অ্যাওয়ার্ড জিতলেন সিলেটের আহমদনগরের রেহানা আহমেদ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭:৪০ অপরাহ্ন
যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ আইটিভি প্রাইড অব ব্রিটেন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সমাজসেবী রেহানা আহমেদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত *সেন্ট অ্যালবানস কমিউনিটি প্যান্ট্রি*র মাধ্যমে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘রিজিওনাল ফান্ডরেইজার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার লাভ করেন। করোনাভাইরাস মহামারির লকডাউনে প্রতিবেশীদের সহায়তা করার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর উদ্যোগটি বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।
রেহানা আহমেদের গ্রামের বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের নাজিরবাজার এলাকার আহমদনগর গ্রামে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর বাবা মজির উদ্দিন আহমেদ কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত সমাজসেবী। শিক্ষা বিস্তার, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বাবার মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে রেহানা নিজেও মানুষের কল্যাণে কাজ শুরু করেন। তাঁর দুই ভাই পেশায় চিকিৎসক এবং তাঁরাও বিভিন্ন দাতব্য ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিবারের এই জনকল্যাণমুখী পরিবেশ রেহানার সমাজসেবায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
ছয় বছর আগে করোনা মহামারির লকডাউনে যুক্তরাজ্যের বহু মানুষ কাজ হারিয়ে কিংবা আয় কমে যাওয়ায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সংকটে পড়েন। সেই সময় সেন্ট অ্যালবানসের বাসিন্দা ও দুই সন্তানের মা রাইহানাহ নিজের আশপাশের অসহায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ছাড়াই শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে বৃহৎ কমিউনিটি সহায়তা কার্যক্রমে রূপ নেয়।
সহায়তা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে তিনি খাদ্যসংকটের নানা মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারেন। এমন একজন নারীকে তিনি পেয়েছিলেন, যিনি খাবারের অভাবে বিড়ালের খাবার খেয়ে বেঁচে ছিলেন। আরেকজন সাবেক সেনাসদস্য ক্ষুধা মেটাতে চিনি খেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সংগঠিতভাবে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে।
বর্তমানে সেন্ট অ্যালবানস কমিউনিটি প্যান্ট্রি প্রতি সপ্তাহে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি খাদ্যসামগ্রীর বাক্স, তাজা ফলমূল ও শাকসবজি বিতরণ, উদ্বৃত্ত খাবার সংগ্রহ এবং বিনা মূল্যে কমিউনিটি মিলের ব্যবস্থা।
প্রতিষ্ঠানটি প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৫০ জনকে জরুরি খাদ্যসামগ্রীর বাক্স সরবরাহ করে। উপকারভোগীদের খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ চাহিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাস বিবেচনায় রেখে এসব বাক্স প্রস্তুত করা হয়। এ ছাড়া ৪৬টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে খাদ্যসহায়তার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়। সেন্ট অ্যালবানস, হ্যাটফিল্ড ও ওয়েলিন গার্ডেন সিটির ২৬টি খাদ্য বিক্রয়কেন্দ্র থেকে উদ্বৃত্ত খাবার সংগ্রহ করেও বিতরণ করা হয়।
লকডাউনের সময় অ্যাবে থিয়েটারে খাবারের বাক্স প্রস্তুতের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। পরে রেহানার নিজস্ব অর্থায়নে ভ্যালি রোডের কাছে একটি বাণিজ্যিক ইউনিটে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি স্যান্ডরিজের হাই স্ট্রিটে স্পেন্সার হলে স্থানান্তরিত হয়।
রেহানা ও তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন প্রায় ১০০ জন অবৈতনিক স্বেচ্ছাসেবীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিচালিত হচ্ছে। রেহানার মতে, এই অর্জন তাঁর একার নয়; বরং প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবী ও সহযোগীর সম্মিলিত অবদানের স্বীকৃতি।
তিনি মনে করেন, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশেও খাদ্যসংকট অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। কারও সুন্দর বাড়ি কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন দেখে তাঁর আর্থিক সংকট বোঝা সম্ভব হয় না। বাড়িভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য বিল পরিশোধের পর অনেকেরই খাবার কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। তাই খাদ্যসহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষা করাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
রেহানার উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সহায়তা নিতে আসা মানুষকে কেবল দাতব্য সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে দেখা হয় না; বরং কমিউনিটির সমান মর্যাদাসম্পন্ন সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কমিউনিটি ফ্রিজের সেশনগুলোতে সহায়তা নিতে কোনো ভাউচার বা রেফারেল ফরমেরও প্রয়োজন হয় না।
তবে পুরস্কার অর্জনের পরও থেমে থাকতে চান না রেহানা। খাদ্যসহায়তার জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের তালিকা থাকায় আগামী তিন বছরে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগে অংশ নেওয়া এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সময় দেওয়ার জন্যও তিনি আগ্রহীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সিলেটের ওসমানীনগরের আহমদনগর গ্রামের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক থাকা রেহানা আহমেদের এই অর্জন প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মানবিক উদ্যোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তাঁর কার্যক্রম প্রমাণ করে, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা দিয়ে একটি ছোট উদ্যোগও হাজারো মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।



