সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়াসহ বিভিন্ন হাওরে অতিথি পাখির আগমন কমছে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:১৯:৪৪ অপরাহ্ন
শহীদ নূর, সুনামগঞ্জ থেকে : দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রামসার সাইট নামে খ্যাত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরসহ জেলার বিভিন্ন হাওরে ফাঁদ পেতে শিকার করা হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির পাখিসহ পরিযায়ী পাখি। একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাখি শিকার করছে বলে অভিযোগ একাধিক সূত্রের। এ অবস্থায় হাওরাঞ্চলে যেমন কমছে অতিথি পাখির আগমন; তেমনি কমছে দেশি প্রজাতির পাখির সংখ্যা। এদিকে পাখি নিধন ও শিকার বন্ধে সতর্ক অবস্থানে প্রশাসন। নিয়মিতই বিভিন্ন হাওর ও বিলে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে এক সময় ছিল পরিযায়ী পাখির সর্বোচ্চ উপস্থিতি। কিন্তু, বর্তমানে দিন দিন পাখির সংখ্যা কমে আসছে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, পরিযায়ী পাখি মূলত তীব্র শীত ও খাদ্যাভাব থেকে বাঁচতে সাইবেরিয়াসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে উড়ে আসে। মূলত নভেম্বরেই তাদের আগমন শুরু হয়। এপ্রিল পর্যন্ত তারা হাওরে অবস্থান করে। কিন্তু, বর্তমানে পাখি শিকারিদের উৎপাত ও হাওরে জেলেদের অবৈধভাবে মাছ নিধনের ফলে পাখি তার অভয়াশ্রম পাচ্ছে না বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
বার্ডস ক্লাবের তথ্যমতে, গত দশ বছরে সুনামগঞ্জের হাওরে পাখির সংখ্যা কমেছে ৮৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে প্রায় ২ লাখ, ২০১৮ সালে ৬০ হাজার, ২০২২ সালে ৩০ হাজার, ২০২৩ সালে ৪৩ হাজার, ২০২৪ সালে মাত্র ২৩ হাজার পরিযায়ী পাখি এসেছে এই জেলায়। ২০২৫ সালের সংখ্যা গত ১৫ বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম বলে বার্ডস ক্লাবের তথ্য বলছে। এজন্য পাখি শিকারিদের দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
মূলত প্রতিবছর পরিযায়ী পাখি তাদের প্রজনন ক্ষেত্র অথবা শীতকালীন আশ্রয়ের সন্ধানে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসে বাংলাদেশের এসব হাওর-বিলে। উপযুক্ত আবহাওয়া, খাদ্য এবং বাসস্থানের খুঁজে তারা ছুটে চলে মহাদেশ থেকে মহাদেশে। কিন্তু বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সুনামগঞ্জের প্রতিটি হাওরে অবাধে পর্যটকদের চলাচল ও পাখি শিকারিদের হানায় ধ্বংস হচ্ছে হাওর, বিলে থাকা পাখিদের স্বাভাবিক আবাসস্থল। আর এতে পাখিদের মূল্যবান আবাসস্থলগুলো হুমকির মুখে পড়ছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের বাসিন্দা আহমদ কবির বলেন, এক সময় এ সময়টাতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখা যেতো টাঙ্গুয়ার হাওরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে। গত কয়েক বছর ধরে পাখির উপস্থিতি কমেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ পাখি শিকারিদের উৎপাত ও হাওরের পাখির আবাসস্থল না থাকা। হাওরে এখন পাখির অনুকূল পরিবেশ নেই।
শীত মৌসুমে সবচেয়ে বেশি যে সকল দেশি জাতের এবং পরিযায়ী পাখির টাঙ্গুয়ার হাওরে আসতো-তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বড় পানকৌড়ি, ছোট ডুবুরি, ধুপনি বক, বেগুনি বক, মেটে রাজহাঁস, ছোট সরালি, বড় সরালি, খুনতে হাঁস, পাটারি হাঁস, জিরিয়া হাঁস, ফুলুরি হাঁস, গিরিয়া হাঁস, সিঁথি হাঁস, লাল ঝুঁটি ভুতি হাঁস ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে এসব পাখি আর চোখে পড়ছে না বলে জানালেন স্থানীয়রা।
সরজমিনে সদর উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে পাখি শিকারের সত্যতা পাওয়া গেছে। রোববার সকালে উপজেলার নতুন জেলখানার পার্শ্ববর্তী হাওরে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ এলাকা জুড়ে কৃষি জমির উপরে সুতোর ফাঁদ পেতে রেখেছে কে বা কারা। স্থানীয় একাধিক কৃষক পাখি শিকারির নাম না বলতে পারলেও এই স্থানে পাখি শিকার করা হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক কাশমির রেজা বলেন, অবাধে পাখি শিকারের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। পাখির সাথে পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে-উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতিথি পাখির বিষ্টার সাথে মাছের খাবারের বিষয়টি জড়িত। পর্যাপ্ত পাখি না আসায় হাওরের মাছের ফুড চেইনে (মাছের খাবার) এর প্রভাব পড়ছে। ফলে হাওরের জীব বৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। এজন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ তার। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাওরে পাখি শিকারের সাথে মূলত দুষ্কৃতকারীরা জড়িত। তার কাছে মহিলাদের কাছ থেকেও পাখি শিকারের ফোন প্রায়শ: আসে জানিয়ে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে তারা শিগগিরই পাখি ও মা সমাবেশ করার পরিকল্পনা নিয়েছেন।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল হক বলেন, পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ এই পরিবেশবাদীর।
এদিকে, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় শিকারিদের পাতা ফাঁদ হতে দুই শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়েছে। সোমবার রাতে উপজেলার সুখাইর রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের সাদরা বিলে অভিযান চালিয়ে দেশীয় প্রজাতির পাখি উদ্ধার করে উপজেলা প্রশাসন।
ধর্মপাশা উপজেলা ভূমি সহকারী সঞ্জয় ঘোষ জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি জাল ও বিভিন্ন প্রকারের ফাঁদ তৈরি করে পাখি শিকার করে আসছে। সোমবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার সাদরা বিলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় দুই পাখি শিকারের ফাঁদ হতে দুই শতাধিক বাবুই,শালিকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধার করে আকাশে অবমুক্ত করা হয়। পাখি শিকারিরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় তাদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় বলে জানান এই কর্মকর্তা। পাখি শিকার ও নিধন প্রতিরোধে সকলের সচেতনতার পাশাপাশি এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, গতবছর একজন পাখি শিকারি পাখি শিকার করে লাইভে এসেছিলো। এরপর আর কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে পাখি শিকারের বিরুদ্ধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।




