ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
পোস্টার নিষিদ্ধ, সিলেটে বেকার ছাপাখানার দেড় হাজার কর্মী
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪:৩২ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
চারদিকে কেবলই পোস্টার আর পোস্টার। বাসাবাড়ির দেয়াল থেকে শুরু করে পথঘাট, অলিগলি এমনকি যানবাহনও পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায়। যতদূর চোখ যায়, ততোদূর কেবলই পোস্টার চোখে পড়ে। পাড়া-মহল্লার রাস্তা থেকে একেবারে রাজপথ সর্বত্রই পোস্টার আর পোস্টার। পোস্টারের বদৌলতে নির্বাচনে দেখা দেয়, উৎসব মুখর পরিবেশ। কবে থেকে নির্বাচন উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গী পোস্টার তা কেউ বলতে না পারলেও বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই নির্বাচনের মূল উপাদান পোস্টার। কিন্তু যে পোস্টারে নির্বাচনে তৈরি হয় উৎসব মুখর পরিবেশ এবার সেই পোস্টারই নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পোস্টার ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পোস্টার নিষিদ্ধের প্রভাব পড়েছে ছাপাখানায়।নির্বাচন মৌসুমে যেখানে প্রেসে দিনরাত ব্যস্ততা থাকার কথা ছিল ; সেখানে কেবলই সুনসান নীরবতা।
এতে করে সিলেট বিভাগের চার জেলায় ছাপাখানাগুলোর দুই হাজার কর্মী অলস হয়ে পড়েছেন। পোস্টার নিষিদ্ধের বিষয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঝেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ছাপাখানা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সিলেট প্রেস কল্যাণ সমিতির সভাপতি আমিনুল হক বেলাল এ বিষয়ে সিলেটের ডাককে বলেন, পোস্টার ছাড়া নির্বাচন উৎসবমুখর হয় না। নির্বাচনের অন্যতম অনুসঙ্গ হল পোস্টার। পোস্টারের প্রচলন বহু আগে থেকেই চলে আসায় এর প্রতি ভোটারদের একটা পরিচিতি ব্যাপক। নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার মূল মাধ্যম পোস্টার। এটা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তাই বলে একেবারে নিষিদ্ধ করাটা ভালো হয়নি। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় ছাপাখানা শিল্পে একটা ধাক্কা লেগেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আকুল আবেদন যাতে পোস্টারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়। পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে আবারও সীমিত পরিসরে হলেও পোস্টারের নিয়ম চালুর আহবান জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন’র সিলেট জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, পোস্টার নিষিদ্ধের জন্য আমরা বহু আগে থেকেই দাবি জানিয়েছি। পোস্টারের মাঝে পলিথিন দেয়া হয়, যেখানে সেখানে লাগানোর ফলে নানান সমস্যা তৈরি হয়। মারামারিও লেগে যায়। এটি নিষিদ্ধ হওয়ায় ভালো হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, হ্যান্ডবিল বা লিফলেট তো আছে।
সিলেটের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন, পোস্টার নিষিদ্ধের আগে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সকল রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলেছেন। সবার মতামত নিয়ে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পোস্টার এখন নিষিদ্ধ তাই এটি ছাপানো অপরাধ। প্রচারণার জন্যে লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ছাপানোর বিধান রয়েছে।
জানা গেছে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় অফসেট প্রেস বা ছাপাখানার সংখ্যা ১৩০টি। এতে কর্মরত লোকের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে শুধু সিলেট নগরীতেই ১০৩টি প্রেসে কাজ করেন ১৫০০ জন।
সিলেট প্রেস কল্যাণ সমিতির বর্ণনা অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের প্রত্যেক আসনে যদি ৪ জন করে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ; তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৬ জন। একজন প্রার্থী ৫ লাখ পোস্টার ছাপালে ৭৬ জন প্রার্থী ৩ কোটি ৮০ লাখ পোস্টার ছাপাতেন। এতে প্রায় ৫ কোটি টাকার ব্যবসা হতো। এই ব্যবসা থেকে তারা পুরোটা বঞ্চিত।
নির্বাচনকে ঘিরে পোস্টার নিয়ে ছাপাখানা মালিকদের পরিকল্পনারও শেষ নেই। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই পোস্টারের কাগজ, কালি, প্লেটসহ ছাপাখানার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানি শুরু হয়। কেউ কেউ কাগজের মজুদও করে থাকেন। প্রেস পাড়ায় দিনরাত সমানতালে চলে পোস্টার ছাপার উৎসব। কিন্তু, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টারের ব্যবহার হচ্ছে না। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় ছাপাখানা শিল্পে হতাশার সুর বইছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী প্রথমবারের মতো ভোটের প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়াও, একই মঞ্চে প্রার্থীদের ইশতেহার ঘোষণা, আচরণবিধি মানায় দল ও প্রার্থীকে অঙ্গীকারনামা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) ভোটের প্রচারে ড্রোন, পোস্টার ব্যবহার, বিদেশে প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০টির বেশি বিলবোর্ড দেয়া যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটের প্রচারে কড়াকড়ি আরোপ,অসৎ উদ্দেশ্যে এআই(আর্টিফিশিয়েল ইন্টেলিজেন্সে) ব্যবহারে মানা করা হয়েছে।
এই আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।।




