সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট : বিমানের সিলেটবিদ্বেষী চক্রের কারণেই কি বন্ধ হচ্ছে?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৭:৩৩ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
বলাকায় ‘ঘাপটি মেরে’ বসে থাকা সিলেটবিদ্বেষী চক্রের কারণেই কী বাংলাদেশ বিমানের সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বন্ধ হচ্ছে ? তা না হলে ঢাকা-রুম আন্ডারলোড (অপেক্ষাকৃত কম যাত্রী) ফ্লাইট বন্ধ না করে সিলেট-ম্যানচেস্টার ফুল লোডেড (পুরোপুরি ভর্তি) ফ্লাইট বন্ধের কোন যুক্তি দেখছেন না যাত্রী সাধারণ ও ট্রাভেল ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা।
গত রোববার বিমানের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা ও যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের মধ্যকার সরাসরি ফ্লাইট ফেব্রুয়ারি থেকে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কারণ হিসেবে, হজ ফ্লাইট পরিচালনাসহ আরো কয়েকটি কারণে এই ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে জানানো হয়।
পত্র-পত্রিকায় এ রিপোর্ট প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন প্রবাসীরা। সোস্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে অনেকেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান। সেখানে আন্দোলন গড়ে তোলারও প্রস্তুতি চলছে বলে যুক্তরাজ্য থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে।
কয়েকজন ট্রাভেল এজেন্সি মালিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিমানের প্রধান কার্যালয় ‘বলাকা’য় বসে থাকা সিলেটবিদ্বেষী চক্র বরাবরই সক্রিয়। সিলেট-মদিনা, সিলেট-দোহা ফ্লাইট বন্ধ করতে এই চক্র এরই মধ্যে সফল হয়েছে। সিলেট-জেদ্দা রুটে সরাসরি দুটি ফ্লাইটের স্থলে একটি ফ্লাইট এরই মধ্যে বন্ধ হয়েছে।
সিলেট-জেদ্দা রুটে কেবল সপ্তাহের প্রতি সোমবার সরাসরি ফ্লাইট অপারেট হচ্ছে। এই চক্রের ফাঁদে পড়ে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে লাভজনক সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিমান। এ ফ্লাইট বন্ধ হলে নর্থ ইংল্যান্ডে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা যারপরনাই বিপাকে পড়বেন বলে আশঙ্কা তাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রবাসী জানান, তারা ৩/৪ মাস আগে দেশে আসার পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী তারা বিমানের টিকেটসহ আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সিলেট-ম্যানচেস্টার-সিলেট ফ্লাইটের জন্য অনেক যাত্রী কয়েক মাস আগে টিকেট কেটে ফেলেন। কিন্তু, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্লাইট বন্ধের খবরে অনেকেরই মাথায় হাত। বিমানের পক্ষ থেকে তাদেরকে টিকেট রিফান্ড করতে বলা হয়েছে। রিফান্ডের পর নতুন টিকেট কাটতে তাদেরকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সিলেট জোনের সাবেক সভাপতি জিয়াউর রহমান খান রেজওয়ান জানান, ঢাকা-রুম রুটে ঢাকা থেকে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট অপারেট হয়। এসব ফ্লাইট আবার আন্ডারলোডেড।
কিন্তু, ফুল লোডেড হওয়া সত্বেও হজ্ব ফ্লাইট ও উড়োজাহাজ স্বল্পতার অজুহাতে সিলেট-ম্যানচেস্টার-সিলেট বন্ধের নোটিশ দিয়েছে বিমান। আগামী এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে হজ্ব ফ্লাইট শুরু হতে পারে। হজ্ব ফ্লাইট শুরুর প্রায় তিন মাস বাকি থাকতেই এ ধরণের নোটিশ- বিমানের সিলেটবিদ্বেষী চক্রের ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয় তার মন্তব্য। এ নিয়ে আটাব ও হাব (হজ্ব এজেন্সিস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)-এর নেতৃবৃন্দ শিগগিরই বিমান অফিসে যোগাযোগ করে তাদের উদ্বেগের কথা জানাবেন।
বিলেতে বাংলাদেশিদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার, ভয়েস ফর গ্লোবাল বাংলাদেশ এর মিডিয়া ডাইরেক্টর কে এম আবু চৌধুরী জানান, সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বন্ধের বিষয়ে বিমানের সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে তারা বিমান ছাড়া অন্য এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে গত কয়েক বছর ধরে জোরালো আন্দোলন করছেন। বিদেশি এয়ারলাইন্স নামানোর উদ্যোগ নেয়া তো দূরের কথা, উল্টো চলমান ফ্লাইট বন্ধের সিদ্ধান্ত-প্রবাসীদের জন্য অবমাননাকর। এ ব্যাপারে তারা কঠোর আন্দোলনে যাবেন বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
গ্রেটার সিলেট ডেভেলপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল ইন ইউকে’র সাউথ ইস্ট রিজিওনের সাধারণ সম্পাদক সুফী সুহেল আহমদ সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট চালু রাখার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, স্কটল্যান্ড, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহামে (নর্থ ইংল্যান্ড) বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন এবং তারা অনেকক্ষেত্রে বিমানের এ ফ্লাইটের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরো বলেন, ওই এলাকার বয়স্ক লোকজনের সিলেটের সাথে সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে বাংলাদেশ বিমান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদেরকে দেশে আসতে হলে বিকল্প হিসেবে অন্য এয়ারলাইন্সের ওপর ভরসা করতে হবে। সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় অন্য কোন দেশে ট্রানজিট দিয়ে তাদেরকে আসতে হবে। এ অবস্থায় তাদের সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হবে।
গতরাতে এ ব্যাপারে বিমানের জেলা ব্যবস্থাপকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিমানের বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হয়েছে :
বিমানের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “উড়োজাহাজের স্বল্পতা, আসন্ন হজ্ব কার্যক্রম পরিচালনা, উড়োজাহাজের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং নেটওয়ার্কজুড়ে উড়োজাহাজের সর্বোত্তম ব্যবহার ও পরিচালন দক্ষতা নিশ্চিতে ঢাকা-ম্যানচেস্টার-ঢাকা ফ্লাইট ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হচ্ছে।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, “ঢাকা-ম্যানচেস্টার-ঢাকা রুটের পরিবর্তে ঢাকা-লন্ডন-ঢাকা রুটে বিকল্প ফ্লাইট যাত্রা, ফ্লাইটের তারিখ পরিবর্তন, টিকেট রিফান্ড ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিমানের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা ও লন্ডন বিক্রয় অফিস, বিমান কল সেন্টার (১৩৬৩৬ / +৮৮-০৯৬১০৯-১৩৬৩৬) অথবা বিমান অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে বিমানের পক্ষ থেকে। কবে নাগাদ আবার ম্যানচেস্টার ফ্লাইট চালু করা হবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু বলা হয়নি।
২০১৯ সালের অক্টোবরে ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটে বিমানের ফ্লাইট চালু হয়। একমাত্র বিমানই এই রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালায়।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই ফ্লাইট বন্ধের গুঞ্জনে যুক্তরাজ্যে বিক্ষোভ করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।




