সড়ক উন্নয়নের ছোঁয়ায় নতুন রূপ পাচ্ছে সিলেট নগরী
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৪:১৩:৪৪ অপরাহ্ন
ইউনুছ চৌধুরী :
ঢাকা-সিলেট ৬ লেন মহাসড়কের সিলেট নগরী সংলগ্ন এলাকার কাজ শুরুর পর দৃশ্যমান হয়ে উঠছে নগরীর পরিবর্তন। নতুন এলাকা আর সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে সিলেট মহানগরী। গত শনিবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেষাংশের লালাবাজার-পীর হবিবুর রহমান চত্বর বাইপাসের জমি অধিগ্রহণে ভূমি মালিকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান ও সড়ক বিভাগের নিকট ভূমি হস্তাস্তরের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় নগরীর নতুন দ্বার।
সিলেট-ঢাকা ৬ লেন মহাসড়ক বর্তমানে চন্ডিপুল হয়ে হুমায়ুন রশিদ চত্বরে গিয়ে নগরীর সাথে সংযুক্ত হয়েছে। বাইপাস মহাসড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার অংশে। এই অংশে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজার ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশে বাহাপুর (৭ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সিলেট কার্যালয়) নামক স্থান থেকে ৬ লেন বাইপাস সড়ক পারাইরচকস্থ সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ ও তামাবিল বাইপাস সড়কের সংযোগস্থল পীর হবিবুর রহমান চত্বরে সংযুক্ত হবে। এখন নতুন বাইপাসের মাধ্যমে চন্ডিপুল-হুমায়ুন রশিদ চত্ত্বর ব্যবহার না করেই ঢাকা থেকে আগত মানুষ পীর হবিবুর রহমান চত্বর হয়ে শহরে প্রবেশ করতে পারবেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ১০.৭ কিলোমিটার বাইপাস সড়কটি লালাবাজার থেকে হাওরের মধ্যে দিয়ে গাবর বিল এর মধ্যে দিয়ে গিয়ে তেলিপাড়া অংশে সিলেট-সিলাম-সুলতানপুর সড়ক অতিক্রম করে আবারো মেধার হাওর হয়ে কুড়ারখাল, রুস্তপুর সংলগ্ন হয়ে চান্দাই ও জৈনপুরের পূর্বাংশ দিয়ে পারাইরচক হাওর হয়ে তামাবিল-সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের সাথে মিলিত হবে। সিলেট-সিলাম-সুলতানপুর সড়কের ওপর তেলিপাড়া অংশে নির্মিত হবে ওভার ব্রিজ।
এদিকে, সড়কের পীর হবিবুর রহমান চত্বর অংশে যানজট এড়াতে এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এই অংশে নির্মিত হবে দৃষ্টিনন্দন ফ্লাইওভার। ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে সংযুক্ত থাকবে সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ ও তামাবিল সড়ক, স্বাভাবিক থাকবে ঢাকা-সিলেট ট্রেন যোগাযোগ। ফ্লাইওভার ব্যবহার করে ঢাকা থেকে আগত গাড়ি কোন যানজট ছাড়াই তামাবিল মহাসড়ক হয়ে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক অতিক্রম করে জাফলং চলে যাবে। এছাড়া, ফ্লইওভার ব্যবহার করে যানজট ছাড়াই যানবাহন সিলেট নগরীর হুমায়ুন রশিদ চত্ত্বর অথবা ফেঞ্চুগঞ্জের দিকে চলে যেতে পারবে। পীর হবিবুর রহমান চত্বরে ৮৪৪ মিটার দীর্ঘ ও ২০ মিটার প্রস্থের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের পাইলিং শুরু হয়েছে। ২৬টি খুঁটির ওপর ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ৭৪টি পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী।
বাইপাস সড়ক নির্মাণকে আশীর্বাদ হিসেবে উল্লেখ করে স্থানীয়রা বলেন, সড়কটি নির্মাণের ফলে এই এলাকার পুরো চেহারাই বদলে যাবে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ার সাথে সাথে শিল্পকারখানা, আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি জায়গার মূল্যও বৃদ্ধি পাবে।
এই সড়ক নির্মাণের পরে সিলেট শহরে প্রবেশের ক্ষেত্রে যানজটের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে যাবে উল্লেখ করে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রাতে হুমায়ুন রশিদ চত্বরে যে মারাত্নক যানজট হয় তা থেকে মানুষ রক্ষা পাবেন। কিছুদিন পূর্বে সিলেটে কাজ করে ফেরার সময় হুমায়ুন রশিদ চত্বরে প্রায় দেড় ঘণ্টা থাকতে হয়। অথচ চত্বর থেকে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা মাত্র ১০মিনিটের রাস্তা। সড়কটির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা ভোগান্তি ছাড়া পাওয়া নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করে দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের সমাজসেবক এম আহমদ আলী বলেন, এই মহাসড়ক নতুন এক শহর গড়ে তুলবে। যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধার কারণে সিলেট নগরী সম্প্রসারিত হবে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে মানুষ শহরের মধ্যে ঠাসাঠাসি না করে শহরের বাইরের দিকে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
ফলে এই অংশে নতুন নতুন আবাসন ও নাগরিক সুযোগ সুবিধ গড়ে উঠবে। উল্লেখ্য, ঢাকা-সিলেট ৬ লেন প্রকল্পের ঢাকা (কাঁচপুর) থেকে সিলেটের পীর হবিবুর রহমান চত্বর পর্যন্ত সড়কের মোট দূরত্ব ২২৪.২২৮ কিলোমিটার। ডিজাইন অনুযায়ী সড়কের মূল অংশের প্রস্থ ১২১ ফুট হলেও সড়কের জন্য ১৮০ থেকে ২৫০ ফুট ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১০.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ লালাবাজার-পীর হবিবুর রহমান চত্বর বাইপাস সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫৩ কোটি টাকা। এই অংশে সড়কের প্রস্থ হবে প্রায় ১৬০ ফুট। পানি চলাচল ও নিষ্কাশনের জন্য থাকবে ১৫টি কালভার্ট। ২০২৭-২৮ অর্থ বছরে সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে জানা গেছে। আবার পীর হবিবুর রহমান চত্বর থেকে তামাবিল পর্যন্ত ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণ অন্য একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। এছাড়া, ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার সিলেট-চারখাই-শেওলা ৪ লেন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সিলেট শহরের যোগাযোগ ও নাগরিক সুযোগ সুবিধার যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে করেন সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সিলেটের সচেতন মহলকে আরো সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান তারা।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম জানান, জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর তিনি এ সড়কের জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য জটিলতা নিরসনের পদক্ষেপ নেন। সবার সহযোগিতায় জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সড়কটির নির্মাণ কাজ যত দ্রুত শেষ হবে, ততই এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমবে।
প্রকল্পের প্রকল্প ম্যানেজার (পিএম) দেবাশীষ রায় জানান, সিলেটের জেলা প্রশাসকের কারণেই জমি অধিগ্রহণসহ সড়কটির অন্যান্য বাধা দূর হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ করা যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।




