চিকিৎসক ও অবকাঠামো সংকট
খুঁড়িয়ে চলছে সিলেট বিভাগের একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৫:১৪ অপরাহ্ন
নূর আহমদ :
ডায়রিয়া, টিটেনাস, হাম, জলাতঙ্কসহ সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য ১৯৬২ সালে সিলেটে স্থাপন করা হয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। তবে, চিকিৎসক স্বল্পতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বিভাগের একমাত্র বিশেষায়িত এ হাসপাতালটি। নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় নিরাপত্তা শঙ্কায় থাকেন চিকিৎসক, নার্সসহ সেবা নিতে আসা রোগীরা। সন্ধ্যা নামলেই হাসপাতালের আশপাশে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে একসময় দূর-দূরান্ত থেকে রোগী আসতেন। জেলা শহরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠায় অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে হাসপাতালটি। অথচ স্পর্শকাতর রোগগুলোর চিকিৎসা দেয়া হয় এখানে। চিকিৎসাসেবা ফ্রি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে হাসপাতালটি বেশ জনপ্রিয়। সিলেট অঞ্চলে হাসপাতালটি ডায়রিয়া হাসপাতাল হিসেবে অধিক পরিচিত। যদিও সেখানে ডায়রিয়ার বাইরের অন্যান্য রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় ৭৫০ শতক জমির ওপর হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ যুগ পার হলেও গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালটির তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। নামমাত্র সীমানাপ্রাচীর থাকলেও বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের কারণে রোগীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন। হাসপাতালটিতে ডায়রিয়া, ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, হাম, হুপিংকাশি, গণ্ডমালা, রুবেলা, জলাতঙ্ক, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ২ হাজার ২৫৩ জন আবাসিক রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, হাম, হুপিংকাশি, গণ্ডমালা, রুবেলা, জলাতঙ্ক, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্তরা রয়েছেন।
তবে সবচেয়ে বেশি ছিল ডায়রিয়া রোগী। সিলেট নগরের মেজরটিলা এলাকার কুলসুমা বেগম কয়েকদিন আগে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে তিনি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হন। অবশ্য একদিন পরই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন এ নারী। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, ‘আমার বড় ভাই ধনুষ্টংকার রোগে আক্রান্ত। রোগটি ধরা পড়ার পর আমরা বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। প্রায় এক মাস চিকিৎসা শেষে তিনি অনেকটা সুস্থ।’

সরজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশে রোগীরা কাপড় শুকাচ্ছেন। সীমানা প্রাচীর যথোপযুক্ত না হওয়ায় হাসপাতালের আঙিনায় গরু-ছাগল, কুকুর নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছে। অনেকটা অরক্ষিত পুরো এলাকা। পুরনো ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়তে দেখা গেছে।
নাম প্রকাশ না রাখার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, ‘ইদানীং সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকসেবীরা। সন্ধ্যা হলেই হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঢুকে মাদক সেবন করে তারা। ভয়ে তাদের কিছু বলাও যায় না। রাতে দায়িত্ব পালনকারী নার্স ও স্টাফরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন।’ চিকিৎসক স্বল্পতাও রয়েছে হাসপাতালটিতে। ২০ শয্যার এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ২১টি। যার মধ্যে অনেক পদই শূন্য রয়েছে। বর্তমানে একজন মেডিকেল অফিসার ও একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট কর্মরত রয়েছেন। কাগজপত্রে সেখানে পাঁচজন চিকিৎসক পদায়ন দেখালেও মূলত একজন চিকিৎসক ও একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট সেবা দিচ্ছেন। ছয়জন নার্স থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন পাঁচজন। বাকি ডাক্তার ও নার্সকে ওসমানী হাসপাতালে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. কমলজিৎ রাজকুমার বলেন, ‘হাসপাতালটি সিলেট বিভাগের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এমন কিছু রোগের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন দেয়া হয়, যা বিভাগের অন্য কোথাও নেই। হাসপাতালে ৯৯ শতাংশ ওষুধ রোগীকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। শুধু ডায়রিয়া রোগী যাওয়া-আসার মধ্যে থাকেন। অন্য রোগীরা আবাসিক চিকিৎসা নেন। দীর্ঘ সময় ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়।’
ডা. কমলজিৎ রাজকুমার বলেন, ‘কাগজপত্রে পাঁচজন চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে তা নেই। আমিসহ একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট কোনো রকমে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আরো অন্তত একজন চিকিৎসক পদায়ন করা দরকার। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় ঝুঁকিও রয়েছে।’




