শ্রীমঙ্গলে তিন দিনে শঙ্খিনীসহ চার সাপ উদ্ধার
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ৮:১৬:১১ অপরাহ্ন
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় তিন দিনে একটি বিষধর শঙ্খিনী ও তিনটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। লোকালয়, বসতবাড়ির আঙিনা, সড়কের পাশ ও জালে আটকে থাকা অবস্থায় সাপগুলো উদ্ধার করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। পরে সেগুলো বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে একটি অজগরকে লাউয়াছড়া বনের ভেতরে অবমুক্ত করা হয়েছে।
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২২, ২৫ ও ২৬ অক্টোবর উপজেলার পৃথক চারটি স্থান থেকে সাপগুলো উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় কোথাও স্থানীয় বাসিন্দা, কোথাও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আবার কোথাও পথচারীর নজরে আসে সাপ। খবর পেয়ে ফাউন্ডেশনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সেগুলো উদ্ধার করেন।
সর্বশেষ গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৭টা ৪০ মিনিটে উপজেলার রামনগর মনিপুরীপাড়ায় খলিলুর রহমানের বসতঘরের পাশে একটি সাপ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। সাপটি সকাল থেকেই সেখানে ছিল বলে জানা গেছে। পরে খলিলুর রহমান বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দেন। সংগঠনটির পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপটি শনাক্ত করেন। এটি শঙ্খিনী- যার বৈজ্ঞানিক নাম Bungarus fasciatus। অত্যন্ত বিষধর এই সাপটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব নওয়াগাঁও এলাকায় রাস্তার পাশে জালে আটকে থাকা একটি অজগর দেখতে পান সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম হাসান। তিনি বিষয়টি ফাউন্ডেশনকে জানান। পরে সংগঠনটির পরিচালক স্বপন দেব সজলের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় ২০ মিনিটের চেষ্টায় জাল কেটে অজগরটি উদ্ধার করে। পরে সেটিও বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
এর আগের দিন রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ইছবপুর এলাকায় মনির মেম্বারের বাড়ির আঙিনায় একটি অজগর দেখা যায়। বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সাপটি উদ্ধার করেন। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে লাউয়াছড়া বনের ভেতরে সেটিকে অবমুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার রাধানগর এলাকায় সড়কের পাশে একটি দেয়ালের ওপর অজগর দেখতে পান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। শ্রীমঙ্গল টুরিস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) বসু দেব বিষয়টি ফাউন্ডেশনকে জানান। পরে সংগঠনটির পরিচালক সঞ্জিত দেবের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপটি উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।
বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীমঙ্গলসহ আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, অজগর, বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, মুখপোড়া হনুমান ও শালিকসহ মোট ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে চারটি বিশালাকৃতির অজগর ছিল। দুটি অজগরের দৈর্ঘ্য ছিল যথাক্রমে ১৪ ও ১৬ ফুট। এ ছাড়া ফণিমনসা, পাঁচটি মনোক্লেড সাপের বাচ্চা, খৈয়া গোখরা ও তিনটি পদ্ম গোখরাও উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত আগস্ট মাসেও এ অঞ্চল থেকে প্রাণঘাতী ও বিষধর শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি।
পরিবেশকর্মীদের মতে, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনাঞ্চল, পাহাড়-টিলা, ঝোপঝাড়, হাওর ও জলাভূমি নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এসব এলাকায় বন উজাড়, বসতি স্থাপন, বাগান, রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হলে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের জোগান ব্যাহত হয়। তখন খাবার ও আশ্রয়ের সন্ধানে সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী লোকালয়ে চলে আসতে পারে।
বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। লোকালয়ে চলে আসা এসব প্রাণীকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে প্রাণী হত্যা এবং সড়কে যানবাহনের চাপায় মারা যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপসহ বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই লোকালয়ে কোনো সাপ বা অন্য বন্যপ্রাণী দেখা গেলে সেটিকে না মেরে ফাউন্ডেশন কিংবা বন বিভাগকে খবর দেওয়া উচিত। খবর পেলে তাঁদের দল ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধারের ব্যবস্থা করবে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণী উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি। কারণ, আবাসস্থল ও খাদ্যসংকটের মূল কারণ দূর করা না গেলে লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা কমানো কঠিন হবে।



