অনন্য শিক্ষাবিদ ‘ঠান্ডা স্যার’
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ জুলাই ২০২৫, ১১:২৮:২৩ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : শিক্ষকতার মহান পেশা থেকে বিদায় নিলেন আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় রফিকুল ইসলাম ‘ঠান্ডা স্যার’। গতকাল সোমবার ছিল তার শেষ কর্ম দিবস। ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পক্ষ থেকে তাকে আড়ম্বরপূর্ণ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিলেও স্যারের অনাগ্রহে সেটি হয়নি। তবে, ছোট পরিসরে তাকে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্যারের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি ঘটলো। তবে, কর্মজীবনে তিনি যেসব স্মৃতি রেখে গেছেন, তা সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি।
ঠান্ডা স্যার ছিলেন কোম্পানীগঞ্জে পাড়য়া আনোয়ারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। আশির দশকে এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় বলতে গেলে, স্যার তার সব মেধা-শ্রম ব্যয় করেছেন। নব্বইয়ের দশকে কোম্পানীগঞ্জের প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মরহুম আব্দুল হক স্যারের একান্ত আগ্রহে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে এ স্কুলে যোগ দেন। সেই থেকে এই স্কুলের সাথে স্যারের পথচলা শুরু। এ স্কুলে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৫ অর্থাৎ সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবন তাঁর।
স্কুলটি এক পর্যায়ে কলেজিয়েটে উন্নীত হয়। অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষকের অবর্তমানে তাকে কখনো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, কখনো ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। প্রতিটি দায়িত্বই তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সুচারুরূপে পালন করেছেন। স্যারের সবচাইতে বড় গুণটি হচ্ছে-তার সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠা।
প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের আগে স্যার স্কুলে চলে যেতেন এবং আবার স্কুল ছুটি হবার পর তিনি স্কুল থেকে বের হতেন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একদিনও (দাপ্তরিক কাজ ছাড়া) এ রুটিনের ব্যত্যয় হয়নি। সময়ানুবর্তিতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।
আমাদের সময় স্যার নাইন টেনের ক্লাসে ভূগোল, হিসাব বিজ্ঞান পড়াতেন। স্যারের পড়ানোর সুফল হিসেবে ১৯৯৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় দুটো বিষয়েই লেটার মার্ক (আশির উপরে) পেয়েছিলাম। স্যারে নিচের ক্লাসে পড়াতেন ইংরেজিসহ অন্যান্য বিষয়। কোন শিক্ষক ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে স্যার ওই ক্লাসে ঢুকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ক্লাস নিতেন। কোনদিনই এক মিনিটের জন্য ক্লাস ফাঁকি দেননি। সে সব শিক্ষক ক্লাস ফাঁকি দিতেন তাদের প্রতি ছিল তার এক ধরণের ঘৃণা। এ নিয়ে শিক্ষকদের সাথে তার বচসা হতো। পাঠদানের প্রতি ছিল তার গভীর মনোযোগ-আন্তরিকতা। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আমাদের সময়ে ঠান্ডা স্যারকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি কাজ করতো। স্যার কোন ধরণের ঢং-তামাশা কিংবা ভনিতা পছন্দ করতেন না। ক্লাসে উল্টাপাল্টা কিংবা অনুপস্থিত থাকলেও ওই শিক্ষার্থীর জন্য অবধারিত ছিল স্যারের ‘শাস্তি’।
স্যার মদনমোহন কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর শিক্ষকতায় যোগ দেন। সম্পন্ন করেন বিএড কোর্সও। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব সম্ভবত হিসাব বিজ্ঞানে মাস্টার্স প্রিলিমিনারি কোর্স সম্পন্ন করেন।
শিক্ষকতায় ব্যস্ত থাকায় তিনি মাস্টার্স ফাইনাল পার্টে অংশ নিতে পারেননি-এজন্য স্যারের মধ্যে একটি দুঃখবোধ কাজ করতো।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির দীর্ঘকালীন সভাপতি তিনি। আজ অবধি তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত। বেশ কয়েকবার উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকেরও স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
ছাত্র জীবনে ‘ভয়ে’তেমন সখ্য না থাকলেও কলেজ জীবন থেকে স্যারের সাথে হৃদ্যতা বাড়তে থাকে। প্রায়শ সেলফোনে স্যার খোঁজ খবর নেন। তবে, তার আলাপচারিতা খুবই সংক্ষিপ্ত। প্রয়োজনের বাইরে একটি কথাও বলেন না। স্যারের কাজ কর্মও খুব গোছালো। চাকুরি থেকে অবসর নেবার আগেই স্যার নিজের একটি আত্মজীবনে লিখেছেন। সেটিই বর্তমানে প্রকাশের অপেক্ষায়। আন্তজীবনীটি বের হলে হয়তো তার সম্পর্কে আরো অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে।




