ঘটনাবহুল জুলাই-আগস্ট
রক্তে রঞ্জিত হয় সিলেটের রাজপথ, এরপর আসে বিজয়
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ৩:১০:১৩ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার: তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ‘জুলাই- আগস্ট’ যেন এসেছিলো বিপ্লবের মহারণ নিয়ে। এই বিপ্লবের সফলতা আসে আগস্টে। জুলাই-আগস্টের একেকটি দিন যেন ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের জন্য ঘটনাবহুল ও সংগ্রামের। সারা দেশের মত সিলেটের রাজপথও ছিলো উত্তাল। সেই আন্দোলন চলাকালে সিলেটের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয় সাংবাদিক এটিএম তুরাবের রক্তে। তাঁর শাহাদাতের পথ ধরে সিলেটের রাজপথ হয় আরো উত্তাল। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে নগর ছাড়িয়ে গ্রামে-গঞ্জে। শহীদ হন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র সেনও। শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পুলিশের সাথে নিরস্ত্র ছাত্র জনতা লড়ে যায় অকুতোভয় সৈনিকের মত। এরপর ৫ আগস্ট আসে বিজয়। সিলেটের জুলাই- আগস্টের আন্দোলনের চিত্রায়িত হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
৮ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয় গোলাপগঞ্জ:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলন সরকারের তীব্র নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞে পরিণত হয় সরকার পতনের একদফার আন্দোলনে। এই একদফার দাবিতে ৪ আগস্ট সকাল থেকেই দেশব্যাপী শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেট নগরীতেও শুরু হয় বিক্ষোভ। সকাল ১১টার মধ্যেই নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় জড়ো হন অজস্র শিক্ষার্থী, দিতে থাকেন স্লোগান। এরই মধ্যে তাদের উপর হামলা চালায় পুলিশ, পুলিশের সাথে যোগ দেয় আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভরত ছাত্রজনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে বন্দরবাজার পয়েন্টের দখল নেয় আওয়ামী লীগ।
এ সময় তারা ধারালো অস্ত্র ছাড়াও ভারি আগ্নেয়াস্ত্রও বহন করেছিলো। তখন বন্দরবাজারের আশেপাশের এলাকায় থেমে থেমে শুরু হয় পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘাত। প্রায় দিনব্যাপী চলে এসকল সংঘর্ষ, ছড়িয়ে পড়ে নগরীর সকল এলাকায়। এদিকে, দুপুরে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা সৃষ্টি করে আরেক ইতিহাস। সিলেট সংলগ্ন এই উপজেলায় হাজারো ছাত্রজনতা চরম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক ও ঢাকা দক্ষিণ সড়কে। তাদের উপরে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ ও বিজিবি। সেদিনই জানা যায় যে, উপজেলার দু’টি ঘটনাস্থলে অন্তত ৫ জন মারা গেছেন। দিন গড়াতে এই উপজেলায় শহীদদের সংখ্যা পৌছায় রক্তে রঞ্জিত হয় ৮ জনে। যাদের বেশিরভাগই শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ যারা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে নেমে আসেন রাস্তায়, গড়ে তোলে প্রতিরোধ।
চৌহাট্টা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে:
৩ আগস্ট ছিলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ এদিন কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে ৯ দফা দাবির আন্দোলন হয়ে ছাত্র-জনতার এ আন্দোলন পরিণত হয় স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার পতনের একদফা দাবির আন্দোলনে। আগের দিনের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এদিন সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা ছিল।
দুপুর গড়াতেই সিলেট নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টে বাড়তে থাকে ছাত্র-জনতার ভিড়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে অজস্র মানুষ জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বিক্ষোভসমাবেশ চলার পর বেলা পাঁচটার দিকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস ও শর্টগানের গুলি ছুঁড়ে পুলিশ। এরপর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে নগর জুড়ে। জিন্দাবাজার, নয়াসড়ক, দরগা গেইটসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ, চালিয়ে যান ছাত্র-জনতা।
পুলিশের গুলি-সাউন্ড গ্রেনেডে আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী। এদিকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের উপর ঝটিকা হামলা চালায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা। সেদিন চৌহাট্টা পয়েন্টে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশী হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয় সিলেট জেলা বিএনপি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশ জাসদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী বাম মোর্চা সিলেট জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ। শহর পরিণত হয় রণক্ষেত্রে ২ আগস্ট ছিল শুক্রবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল গণমিছিল। জুমার নামাজের পর থেকেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক শহীদ রুদ্র তোরণের সামনে ধীরে ধীরে শুরু হয় জমায়েত। শুধু ছাত্র নয়, মিছিলে অংশ নিতে আসেন সাধারণ মানুষও। বেলা ৩টার দিকে মিছিল প্রস্তুত হলে পুলিশ তাদেরকে বাঁধা দেয়। পুলিশী বাঁধা অতিক্রম করে মিছিলটি মদিনা মার্কেটের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ ছাত্রদের উপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও শর্টগানের গুলি ছুঁড়ে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তারপরও দমে যায়নি ছাত্র-জনতা।
বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পরে আখালিয়া, মদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা, বাগবাড়িসহ আশেপাশের সকল এলাকায়। মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে প্রকম্পিত হতে থাকে নগরী। এর মধ্যে আখালিয়া এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয় ১২ বছর বয়সী একটি শিশু শফিক আলী। নিজেদের গুলিতে পুলিশ সদস্যরাও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। শর্টগানের ছররা গুলি লেগে আহত হন কয়েকজন সাংবাদিকও।
সেদিন কতজন ছাত্র-জনতা আহত হয়েছিলেন তা আর নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। আতঙ্কে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাননি অজস্র আহতরা। কিছু বেসরকারি হাসপাতাল এবং সাধারণ মানুষের বাড়িঘরেই চলে আহতদের চিকিৎসা। এইদিন প্রথমবারের মতো সিলেটবাসী টের পায় পুলিশী নৃশংসতার ব্যাপকতা। সেদিন আখালিয়া, মদিনা মার্কেট, বাগবাড়ি এলাকার অজস্র বাড়িঘর হয়ে উঠে আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সাধারণ মানুষও একাত্ম হন আন্দোলনের সাথে।
এদিন হবিগঞ্জেও আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালায় পুলিশ-ছাত্রলীগ। নিহত হন একজন। সেদিন জুমার নামাজের পর বোর্ড মসজিদের সামনে গণমিছিলের প্রস্তুত নেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। পাল্টা পূর্ব টাউন হল এলাকায় অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে বেলা ৩টার দিকে টাউন হল এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দু’পক্ষ। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু জাহিরের বাসায়ও হামলা চালায়। পরে পুলিশ এসে আন্দোলনকারীদের উপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল ও গুলি ছুঁড়লে অর্ধশতাধিকের বেশি মানুষ আহত হন এবং রাজপথে নেমে আসে স্কুল-কলেজের মুস্তাক আহমান নামে এক যুবকের মতন ফার্থীরাও।
জুলাই মাসের ৩১ তারিখ শেষে ক্যালেন্ডারে ১ আগস্ট শুরু হলেও স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ে দিনটি ৩২ জুলাই হিসেবে আখ্যায়িত থেকে যায় ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় পরদিনের জন্য ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আগের রাতে শাবিপ্রবি ও তার আশেপাশের এলাকায় পুলিশের ব্লকরেইড অব্যাহত থাকে। এ সময় নেহারীপাড়া এলাকা থেকে আটক করা হয় শাবিপ্রবির তিন শিক্ষার্থীকে। তবে পরদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক জালালাবাদ থানায় গিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন শিক্ষার্থীদের। সেদিন বিকেল ৩টার আগে থেকেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালনের জন্য সমবেত হতে থাকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন এবং একজন শিক্ষার্থীকে আটক করেন। পুলিশী বাধা উপেক্ষা করে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন তপোবন থেকে শুরু করে সুরমা আবাসিক এলাকা পর্যন্ত প্রধান সড়কে দীর্ঘ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সুদীর্ঘ এ মানববন্ধনে শুধু শাবিপ্রবি নয়, বীরদের স্মরণে যোগ দেন সিলেটের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ কর্মসূচি। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মত্মতা পোষণ করতে অবস্থান করেন শিক্ষকদের একাংশ। এদিন বিকেলে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ ও এর ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’কে সন্ত্রাসী সত্তা ঘোষণা করে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া:
৩১ জুলাই, ২০২৪। সারা দেশে ছাত্রহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা, মামলা গুম-খুনের প্রতিবাদে ও জাতিসংঘের তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশব্যাপী মার্চ ফর জাস্টিসের ঘোষণা দেয়। সকাল ১১টা থেকেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক শহীদ রুদ্র তোরণের সামনে এসে জড়ো হতে থাকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় পুলিশ তাদেরকে বাঁধা দিলেও তারা বাঁধা উপেক্ষা করে প্রধান ফটকে অবস্থান নেন। একই সময়ে শাবিপ্রবির শিক্ষকদের একাংশ ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ ব্যানারে ক্যাম্পাসের চেতনা ‘৭১ এর সামনে সমবেত হয়ে মিছিলযোগে প্রধান ফটকে আসেন।
দুপুর গড়ানোর আগেই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ এ অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকে। এ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ফটক থেকে নগরীর বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট অভিমুখে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল নগরবাসীকে ছাত্রদের দাবির সাথে সম্পৃক্ত করা। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা নিয়ে সিলেট নগরীর অভিমুখে শুরু করে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’।
শতাধিক শিক্ষার্থীর এ মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় গেইট থেকে পাঠানটুলা এলাকা অতিক্রম করার আগেই কয়েকশত বিক্ষোভকারীর বিশাল মিছিলে পরিণত হয়। সাড়ে ১২টার দিকে সুবিদবাজার মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে বাঁধা দেয়। এ সময় পুলিশ সদস্যদের সাথে বাকবিতন্ডা ও হাতাহাতিও হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে পদযাত্রা সামনে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় পিছন থেকে ও রাস্তার পাশ থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানো গ্যাস ছুঁড়ে পুলিশ। মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় শিক্ষার্থীরা, আহত হন অজস্র শিক্ষার্থী।




