স্মরণ
যিনি ‘ঠোঁটের ভাষায় কবিতা’ লিখতেন
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জুলাই ২০২৫, ৪:৪৩:১২ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
‘ঠোঁটের ভাষায় কবিতা লিখুন’ শ্লোগান তুলে আমাদের আধুনিক বাংলা কাব্যসাহিত্যে সেই সত্তরের দশকে যিনি মুখরিত করে তুলেছিলেন, তিনি কবি লায়লা রাগিব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যসংগঠক। ছিলেন অনন্য মেধার অধিকারী। মাত্র দেড় দশকের সাহিত্যজীবনে তিনি তাঁর সুনিপুণ লেখনীর মধ্য দিয়ে কেবল সিলেট নয়, ঝড় তুলেছিলেন দেশের সাহিত্যাঙ্গনে। তাঁর লেখার বিষয় মূলত সমাজ। তিনি সমাজকে দেখেছেন একজন সচেতন মানুষ ও শিল্পী রূপে। সমাজকে কেন্দ্র করে তিনি এমন সব কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যেন চিত্রশিল্পীর রঙ তুলিতে সাজানো নিপুণ কারুকাজ। লিখেছেন সহজ ভাষা ও সহজ সুরে। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা, দ্বন্দ্ব-ক্ষোভ এবং সহজ জীবনযাপন প্রণালীর বাস্তব রূপ তার লেখার উপজীব্য।
কবি লায়লা রাগিব তাঁর পিতামাতার তৃতীয় সন্তান। তাঁর পারিবারিক নাম লায়লা ইউসুফ। তার শিক্ষার প্রথম পাঠশালা পিতার কর্মস্থল ছাতক শহরের প্রাইমারি স্কুলে। অতঃপর তিনি সিলেট শহরের সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যয়ন করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কিছুটা শান্ত ও উদাসীন প্রকৃতির। ধীরে ধীরে হৃদয়ে জন্ম নেয় কাব্যিক অনুভূতি। লায়লার বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, তখন থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘অভিশাপ’ নামক গল্প লিখে তিনি সরাসরি সাহিত্য অঙ্গনে পা রাখেন। আজাদ পত্রিকার লেখা থেকেই তাঁর লেখার হাতেখড়ি। সেই থেকে লায়লা রাগিব মৃত্যু পর্যন্ত প্রচুর গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে গেছেন। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হবার পাশাপাশি পশ্চিমবাংলার সাহিত্য পত্রিকায়ও তিনি লিখতেন। ওপার বাংলার কবিতাঙ্গনেও কবি লায়লা রাগিব যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেট শহরের শেখঘাটের ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন কবি লায়লা রাগিব। যিনি লায়লা ইউসুফ নামেই তিনি কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। সিলেটের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগঠক, কবি রাগিব হোসেন চৌধুরীর সাথে ১৯৮০ সালের ১ জুন কবি লায়লা ইউসুফ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি লেখালেখি সমাজসেবা, সাহিত্য আন্দোলনে কবি লায়লা রাগিব নামে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন সাম্প্রতিক সমাজ জীবনের সার্থক প্রতিচ্ছবি। অথচ তার মধ্যে রয়েছে সত্যের ইঙ্গিত। তাই পাঠকের মনে তার আসন স্থায়ী হিসেবে বসিয়ে নিয়েছিলেন। কবি হিসেবে লায়লা রাগিব নিঃসন্দেহে একজন আধুনিক কবি। কিন্তু আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতা যেমন তার কবিতায় দেখা যায় না তেমনি অশ্রীলতাও সেখানে নেই। দুর্বোধ্যতা নগ্নতা ও অশ্লীলতা বর্জন করেও যে আধুনিক কবিতা লেখা যায় এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কবি লায়লা রাগিব।
প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদ লায়লা রাগিব সম্পর্কে লিখেছেন- ‘লায়লার মতো কবি হৃদয় নিয়ে খুব বেশি নারী বাংলাদেশে জন্মায়নি।’ কবি আব্দুল হালিম খাঁ লিখেছেন, ‘তাঁর কবিতা কাননে প্রবেশ করলে মনে প্রাণে এক পবিত্র ভাবাবেশ হয়। সেখানে জটিলতা নেই, দুর্বোধ্যতার ধুয়া নেই। অশ্লীলতা নেই, কারো প্রভাব নেই, কোন মনগড়া মতবাদের টানা হেছড়া নেই, এমনকি তার প্রিয় কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাও নেই- লায়লার কবিতায় সর্বত্রই লায়লা।’ ভারতীয় সাংবাদিক অতীন দাস তার ‘বাংলাদেশী সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, পাঠক-পাঠিকারা যে সাতজনের লেখা বুঝেন, লায়লা রাগিব তাদেরই একজন।’
কবি লায়লা রাগিব ছিলেন একটি প্রতিবাদী কবিপ্রতিভা। কবিতাপত্র ‘কবি সংলাপ’-এর মাধ্যমেই তার প্রতিবাদী কণ্ঠ সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। কবি সংলাপের তিনি ছিলেন সম্পাদিকা। কবিতা শিল্পের নামে অশালীন দুর্বোধ্য শব্দাবলী প্রয়োগের বিরুদ্ধেই ছিল তার প্রতিবাদ। তাঁর কথা ছিল- ‘খোলা চোখে, সহজভাবে, অতি সাধারণ হয়ে যা আমাদের কাছে ধরা দেবে, তাই হবে আমাদের কবিতার বক্তব্য। ঠোঁটের ভাষা হবে কবিতার ভাষা।’
তিনি ছিলেন সিলেট লেখিকা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। বর্তমান সিলেটে নারী লেখক, সাহিত্যিক, কবি সৃষ্টি করতে অনন্য ভূমিকা রাখছে সিলেট লেখিকা সংঘ। সিলেট লেখিকা সংঘ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কবি লায়লা রাগিব ব্যাপক কর্মতৎপরতা ও সাংগঠনিক যোগ্যতার পরিচয় দেন। লেখিকা সংঘের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কবি লেখিকা সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সংঘের প্রথম আলোচনা সভায় বলেন, ‘সিলেটে অনেক মহিলাই লেখালেখি করেন, করতেন, কিন্তু এক সময় দেখা যায় তারা হারিয়ে যান সাহিত্যের পাতা থেকে। এর কারণ আমরা খুঁজেছি এবং আমরা বুঝেছি উপযুক্ত পরিবশে না থাকাই এ হারিয়ে যাবার কারণ। তাই আমরা সংঘবদ্ধ হবার তাগিদ অনুভব করলাম। এ তাগিদেরই ফসল লেখিকা সংঘ। লেখিকা সংঘ শুধু লেখিকাদের সংস্থা। এখানে সেই সম্মানিত মহিলারা সহযোগী সদস্যা হতে পারেন যারা লেখিকাদেরে ভালবাসেন, অর্থাৎ সাহিত্যমোদী মহিলারা। তবে মূল সংগঠন থাকবে লেখিকাদের হাতে। এই সংস্থার কর্মস্থল সিলেট শহরেই। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে এর শাখা গঠিত হতে পারে। আমি আমাদের গঠনতন্ত্র থেকে উদ্দেশ্য লক্ষ্য কর্মধারার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরছি। বিশ্বাসী নারী সমাজের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ লেখিকাদের সংঘবদ্ধ করে তাদের সাহিত্যকর্মে উৎসাহ প্রদানই মূল লক্ষ্য।’শহীদ সুলেমান হলে এটি ছিল সিলেট লেখিকা সংঘের প্রথম আলোচনা সভা।
সত্তর দশকের কবি লায়লা রাগিব। ষাট এর দশকে আমাদের সাহিত্যে আসেন বেশ ক’জন শক্তিমান কবি। এদের মধ্যে আফজাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবদুল মন্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা প্রমুখ। তাঁদের দশকের কবিতার ভাষা এদেশের সাধারণ জনগণের ভাষা ছিল না। দুর্বোধ্য কবিতা কোন জাগরণ আনতে সক্ষম ছিল না। ফলে পাঠকও কবিতার মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তাই লায়লা যখন সিলেট থেকে তার সম্পাদিত কবিতা পত্রিকা কবি সংলাপের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করেন। ‘ঠোঁটের ভাষায় কবিতা লিখু’ শ্লোগান তুলে তাতে অভূতপূর্ব জাগরণ আসে আমাদের সাহিত্যে। প্রবীণ কবি সাহিত্যিকরা ছাড়াও কবি ওমর আলী, কবি আব্দুল হালিম খাঁ, কবি ফরিদ আহমদ রেজা, কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি কামাল মাহমুদ তাকে সমর্থন করেন। কবি আফজাল চৌধুরী উচ্চারণ করতে বাধ্য হলেন- ‘কবিসংলাপ আমাদের কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে’।
লায়লা রাগিব কবিতা পত্রিকা কবিসংলাপ ছাড়াও ‘রাত পোহাবার কত দেরী’ এবং প্রয়াত সাংবাদিক বুদ্ধদেব চৌধুরী ও তাঁর যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘শব্দ পাশ’ নামের একটি চমৎকার সংকলন। কবি লায়লা রাগিবের বৈবাহিক জীবন ছিল মাত্র ছয় বছরের। এর মধ্যে কবি দম্পত্তির বাসা ও প্রেস সিলেট সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তাঁর একমাত্র কন্যা রোবায়েত হাসিনা চৌধুরী জুমার বয়স ছিল তিন বছর এবং একমাত্র পুত্র লবিদ হোসেন চৌধুরীর বয়স ছিল মাত্র এক বছর। সে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। তাঁর কন্যা এবং পুত্র এখন বিবাহিত। তাঁর জামাতা অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহিম শাহিনও একজন সুলেখক। শাহিন সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা এক্সপ্রেস পত্রিকার সম্পাদক।
কবি লায়লা রাগিবের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চারটি। ১. কিংখাবে মোড়া (কাবিতা); ২. বৃষ্টি আমার জন্মাবধি দুঃখ মুছে নাও (কবিতা); ৩. নীড়াঙ্গনে পাখি (প্রবন্ধ) ও ৪. অসমাপ্ত ডায়েরি (গল্প)। কবি লায়লা রাগিব তাঁর সাহিত্য কর্মের জন্য ১৯৭৩ সালে ফেণী থেকে প্রকাশিত মহিলা পত্রিকা ‘কঙ্কন’ প্রবর্তিত ‘শহীদুল্লা কায়সার সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করে সাহিত্য ক্ষেত্রে একটি প্রতিবাদী প্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবং ১৯৯৫ সালে কবিতার জন্য বিএনএসএ ইংল্যান্ড তাকে (মরণোত্তর) স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় ।
কবি লায়লা রাগিব দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর-এর বংশধর। তাঁর পিতা আবু সাইয়েদ মো. ইউসুফ এবং মাতা লুৎফুননেসা। কবি’র পিতামহ আবু ইউসুফ আহম্মদ ইয়াকুব। কবির প্রপিতামহ মওলানা আব্দুর রহমান ও তাঁর ভাই মওলানা আব্দুল কাদির মধ্যযুগের সিলেট সাহিত্যের প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন। ভারতের কানপুর থেকে তাঁদের গ্রন্থ ১৮৬৫, ১৮৮২ ও ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। লক্ষ্মৌ ও কলকাতা মাদরাসায় তাঁদের লিখিত আরবি ফার্সি কিতাবসমূহ পাঠ্য তালিকায় ছিলো। এ মাওলানা ভ্রাতৃদ্বয়ের পিতা খানবাহাদুর আবু নছর মো. ইদ্রিছ বাদশাহি আমলে সিলেটে কাজী ছিলেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ মওলানা আব্দুল করিম বাগদাদ থেকে পানিপথ হয়ে ভারতের হিরাতে বসবাস করেন। হিরাত থেকে বাদশাহি আমলে বিচারক হিসেবে তাঁর পূর্বপুরুষের বাংলায় আগমন, প্রথমে মাওলানা মো. সালেহের ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে বসতি, অতঃপর সিলেটে। কবির পূর্ব পুরুষরাই সিলেট শহরের কাজিরবাজার ও তাদের বিশাল জমিদারির এক সীমানায় সুরমা, কুশিয়ারা নদীর মোহনায় মার্কুলি নামক স্থানে কাদিরগঞ্জ বাজার ও ডাকঘর স্থাপন করেন।
কবি লায়লা রাগিব শুধু সাহিত্যে তার কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখেননি। কলেজ জীবনের শুরুতে তিনি চিন্তাধরায় সমাজতন্ত্রী হলেও ১৯৭৬-৭৭ সালে লেখালেখির জন্যে ব্যাপাক পড়াশোনার ফলে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম নেত্রী জয়নব গাযালীর জীবন ও লেখালেখির সাথে পরিচিত হন। এতে তাঁকে প্রভাবিত করে তুলে। এক সময় তিনি মেয়েদেরকে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় সংগঠিত করেন। একটি বৈষম্যহীন আদর্শিক সুন্দর ন্যায়ভিত্তিক ইসলামী সমাজ গঠন করতে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। ১৯৮৬ সালের ৯ জুলাই প্রতিবাদী আধুনিক কবি লায়লা রাগিব মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর। তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্যাঙ্গন ও গুণগ্রাহীদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার মৃত্যু সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনের অপূরনীয় ক্ষতি।
তৎকালীন সংবাদপত্রের বর্ননা অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের ১০ আগস্ট কবি লায়লা রাগিব স্মরণে যে শোকসভা হয়, তা সম্ভবত সিলেট সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শোকসভা ছিল। শোক সভার মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সিলেট মদনমোহন কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও গবেষক শ্রী কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরী। তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন- ‘মৃত লায়লা জীবিত লায়লা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী’।
কবি লায়লা রাগিবের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কবি লায়লা রাগিব স্মৃতি সংসদ। সাবেক কোষাধ্যক্ষ, সিলেট প্রেসক্লাব।




