তদন্ত হলেও এ্যাকশন হয়নি, সাড়া দেননি দুদকের ডাকেও
শাল্লার পিআইও নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১:৩৫:৩৫ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
নুরুন্নবী সরকার। শাল্লা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। গাইবান্ধা থেকে নাটোর কিংবা শাল্লা সর্বত্রই তার বিরুদ্ধে অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ। তদন্ত হলেও তার বিরুদ্ধে এ্যাকশন নেয়া হয়নি। তিনি এতোই ক্ষমতাধর যে দুদকের ডাকেও সাড়া দেননি। এবারও তার দুর্নীতির তদন্ত হবে। আগামী সপ্তাহে খোদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে তদন্ত টিম আসবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার হাসিবুল হাসান সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, শাল্লায় যোগদানের পরও পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। আগে বলার পরও দুদকের শুনানিতে তিনি আসেননি। পরে দুদক থেকে ডাকার পরেও হাজির হননি। তার দুর্নীতির তদন্ত করতে আগামী সপ্তাহে একটি টিম আসবে। তারা সরেজমিনে শাল্লায় গিয়ে তদন্ত করবেন।
শাল্লায়ও দুর্নীতি :
শাল্লার বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আটকে রেখেছেন পিআইও নুরুন্নবী। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়কারী প্রতিষ্ঠান ও লোকদের তিনি নগদ পার্সেন্টেজের বিনিময়ে বিল ছাড় করবেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবারও এমন কথা শোনা গেছে। তবে কাজের বিল আটকে দেয়ার ভয়ে আপাতত ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। শাল্লা উপজেলায় সর্বমোট কত টন টিআর/কাবিখা এসেছে এবং কাদের মধ্যে এসব কোন কোন প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এমন তথ্য তিনি প্রকাশ করতে রাজি হননি। এসব তথ্য চাওয়ায় নিজ দপ্তরে গণমাধ্যম কর্মীদের আটকে রাখার ঘটনাও তিনি ঘটিয়েছেন। যে শাল্লা উপজেলায় তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল এখন তিনি সেখানেই নতুন করে দুর্নীতিতে মেতে উঠেছেন। গত বছরের ১০ নভেম্বর শাল্লা উপজেলায় তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হলেও তার দুর্নীতি কিন্তু থেমে নেই। তার দুর্নীতির খবর এখন শাল্লার মানুষের মুখে মুখে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, পিআইও নুরুন্নবী শাল্লায় আসার পর তার মনগড়া প্রকল্প তৈরি থেকে শুরু করে ইচ্ছেমতো বরাদ্দ দেন। জনসমক্ষে কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননা। দুর্নীতি যেন তার রক্তের সাথে মিশে গেছে।
মন্ত্রণালয়ে শিশির মনিরের অভিযোগ
জানা গেছে, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নুরুন্নবী সরকার দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট- দুর্নীতির জন্যে আলোচনায় রয়েছেন। তার দুর্নীতি তুলে ধরে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, শাল্লার পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, নিম্ন মানের কাজ, অর্থ আত্মসাৎ, সাংবাদিকদের হুমকি, মামলাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। তার কার্যকলাপ ৫ আগস্ট ঘোষিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর নীতি, আদর্শ ও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের পরিপন্থী।
অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের উপপরিচালক (আইন সেল) মো. আশ্রাফুল হককে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর বুধবার ও ৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটি সরেজমিনে শাল্লায় গিয়ে তদন্ত করবেন বলে সূত্র জানিয়েছে ।
কতবড় ক্ষমতাধর পিআইও…..?
জানা গেছে, গত ১৯ মে সুনামগঞ্জ জেলা সদরে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক বিভিন্ন বিষয়ে গণশুনানি করে। দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদের উপস্থিতিতে ওই শুনানিতে ভুক্তভোগীরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় তাকে গণশুনানিতে আসতে বলা হলে দুদক কর্মকর্তাকে তিনি পাল্টা বলেন ‘আমি আসতে পারব না, আপনারা যা পারেন করেন’। এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অপেশাদার আচরণের ইতোমধ্যে তিন মাস হলেও রহস্যজনক কারণে আজও তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি দুদকের পক্ষ থেকেও তার দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়নি।
অভিযোগের শেষ নেই
জানা গেছে,২০২৩ সালে গাইবান্ধার কর্মরত অবস্থায় ৩ দিনের ছুটি নিয়ে ১৩ দিন অনুপস্থিত থাকেন। এরপর ক্ষমা প্রার্থনা করে পার পেয়ে যান। ক্ষমা চাওয়ায় বিভাগীয় মামলার দায় থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে তাকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করা হয়। এর আগে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় টানা ১৬ দিন অফিসে আসেননি। তার অনুপস্থিতির বিষয়ে বিভাগীয় মামলা করে অধিদফতর। ২০২০ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের পরিচালক (মূল্যায়ন ও পরীবিক্ষণ) মো. আনিছুর রহমান
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সাবেক পিআইও নুরুন্নবী সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা কর্মকাণ্ডের তদন্ত করেন। গণমাধ্যমে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির সচিত্র তথ্য-প্রমাণ প্রকাশের পর তিনি রংপুর আদালতে ১২ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সুন্দরগঞ্জের পিআইও অবস্থায় নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে ৫ টি মামলা দায়ের করা হয়।
রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় কর্মরত অবস্থায়ও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল। এতকিছুর পরও পিআইও নুরুন্নবী সরকার বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
এসকল বিষয়ে জানতে চেয়ে শাল্লার পিআইও নুরুন্নবী সরকারের সেলফোনে গত বৃহস্পতিবার ও আগের দিন বুধবার একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অবশ্য গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আবারও কল দিলে তিনি কল রিসিভ করেন। এসকল বিষয়ে তার দাবি, তিনি দুর্নীতি করেননি।এসব উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বলেন, বিভিন্ন সময়ে আমার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শাল্লায় দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি।




