স্মরণ
সিলেটপ্রেমী এম সাইফুর রহমান
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৭:৩২:০২ অপরাহ্ন
আরিফুল হক চৌধুরী :
ক্লাস টেনে থাকা অবস্থায় এম সাইফুর রহমান নামটি আমি প্রথম শুনি। তখন আমি জানতাম না, এই নামটি এক সময় আমার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাবে! তখন আমি এইডেড হাইস্কুলের ছাত্র। ছাত্রাবস্থায় খুবই ডানপিটে ছিলাম। আমার বয়সী ছেলেরা তখন কেউ বই নিয়ে, কেউ খেলাধূলা নিয়েই বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দিত।
ওদিকে আমি সময় পেলেই ছুটে যাই শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বন্ধুদের নিয়ে এ-পাড়া ও-পাড়া ঘুরে বেড়াই। গল্প, আড্ডা, দুরন্তপনা- আহা কী ছিল না সেই দিনগুলোতে। মাঝে মাঝে ঢু মারতাম স্টেডিয়াম পাড়ায়ও। সেখানে গেলে শোনতাম একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাস ‘আউটার অডিটোরিয়াম’ নিয়ে। সিলেটে তখনো কোন আউটার অডিটোরিয়াম নেই! ‘আউটার অডিটোরিয়াম’ নিয়ে আমার খুব বেশি ধারণা ছিল না। তারপরও কেন জানি এই আউটার অডিটরিয়াম আমার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। ১৯৭৮ সাল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ডামাডোল দেশজুড়ে। প্রচারণার জন্য সিলেটে এলেন জিয়াউর রহমান। আলিয়া মাদরাসায় মঞ্চে বসা তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেদিন এক বুক সাহস নিয়ে আমিসহ স্কুলের বেশ কয়েকজন ছাত্র এগিয়ে যাই মঞ্চের দিকে। আউটার অডিটোরিয়ামের দাবি জানিয়ে একখানা দরখাস্ত তুলে দিলাম জিয়াউর রহমানের হাতে। মঞ্চে বসেই জিয়াউর রহমান দরখাস্ত পড়লেন। আমরা কয়েকজন স্কুল বালক তখনো মঞ্চের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি। পড়া শেষে জিয়াউর রহমান এক মুহূর্তে ভাবলেন। তারপর তাঁর কাছেই বসা একজন ভদ্রলোককে বললেন, এই কাজটি যত তাড়াতাড়ি করে দেওয়া উচিত। সাথে সাথেই তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফয়েজ উল্লাকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে আউটার অডিটোরিয়ামের কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হলো। শুরু হলো আউটার অডিটোরিয়াম তৈরীর কাজ। সেদিন যিনি ডিসি ফয়েজ উল্লাকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন, তিনি এম সাইফুর রহমান। সেই প্রথম আমি নামটি শুনলাম।
পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সেদিন জিয়াউর রহমানের পাশে মঞ্চে বসা সেই ভদ্রলোকটি ছিলেন এম সাইফুর রহমান, যিনি ছিলেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাণিজ্য উপদেষ্টা। সিলেটে প্রথম যে উন্নয়ন কর্মকান্ডটি তাঁর হাত ধরে বাস্তবায়নের সূচনা হয়েছিল, সেটিই হচ্ছে আজকের রিকাবীবাজারের অডিটোরিয়াম। যা এক সময় এম সাইফুর রহমান অডিটরিয়াম নামকরণ করা হয়েছিল, কিন্তু পরিহাসের বিষয়, নাম পরিবর্তন করে সেই অডিটরিয়াম আজ কাজী নজরুল অডিটোরিয়ামে রূপ নিয়েছে!
দুই.
সত্তরের দশকের শেষ দিকে জাগদল গঠন, ‘হ্যা-না’ ভোটের আয়োজনসহ এরকম নানা ঘটনা প্রবাহে একাধিকবার এম সাইফুর রহমান সিলেটে আসেন। যার সুবাদে আমি তাঁর সান্নিধ্য লাভ করি। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের ক্যাবিনেটের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব¡ নেন তিনি। এই দায়িত্ব নেওয়ার পর সিলেটে নিয়মিতভাবে আসতে থাকেন সাইফুর রহমান। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সিলেট সার্কিট হাউসের ডাকবাংলোয় ক্যাবিনেটের বৈঠকও আয়োজন করা হয়। ঢাকার বাইরে প্রথমবারের মতো ক্যাবিনেট বৈঠক হয়েছিল সিলেটে, যার অন্যতম কারিগর ছিলেন এম সাইফুর রহমান। ঐ সময় থেকে সিলেটের উন্নয়ন বিষয়ে এম সাইফুর রহমানের আপসহীন মনোভাব আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। মাত্র কিছুদিনের পরিচয়েই এই অসম্ভব মেধাবী মানুষটির বিশেষ কয়েকটি দিক আমাকে মুগ্ধ করে। প্রথমত তাঁর দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত, দ্বিতীয়ত তিনি ছিলেন আপাদমস্তক কাজপাগল একজন মানুষ, আর সবশেষে তিনি সিলেটের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছিলেন একেবারেই আপসহীন। সিলেটপ্রেমী এম সাইফুর রহমান সিলেটের জন্য যে যুগান্তকারী উন্নয়ন করেছেন তা এই স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব না। সর্বশেষ দুটি মেয়াদে তিনি যে কাজ করেছেন তা সিলেটবাসীর চোখে আজো দৃশ্যমান। তাঁর এই কাজ তাকে যুগের পর যুগ স্মরণীয় করে রাখবে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই । তবে এই দুই মেয়াদের আগে অর্থাৎ সত্তরের দশকের গোড়ার দিককার তাঁর কয়েকটি উন্নয়ন কর্মকান্ডের কথা না বললেই নয় ।
শাহজালাল(র.) মাজার শরীফে গ্যাস সংযোগ দিয়ে সিলেটে প্রথম গ্যাস সংযোগ কার্যক্রমের সূচনা করেছিলেন সাইফুর রহমান, তৎকালীন সময়ে চৌহাট্টায় অস্থায়ী গ্যাস অফিস ভবন (বর্তমানে মানরু শপিং সিটি গড়ে উঠেছে যেখানটায়, সেই জায়গায়) এবং পরবর্তীতে মেন্দিবাগে স্থায়ী গ্যাস অফিস স্থাপন, সিলেটের উপকণ্ঠে শাহজালাল উপশহর গড়ে তোলার প্রকল্প, তালতলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন স্থাপন, সিলেট টেক্সটাইলস মিলস, সিলেট টেলিভিশন সেন্টার স্থাপন, সিলেট প্রেসক্লাবের জমিসহ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দকরণ, মৌলভীবাজার চাঁদনীঘাট থেকে কুলাউড়া পর্যন্ত সড়ক তৈরী, সিলেট হাওর উন্নয়ন বোর্ড স্থাপন, শাহজালাল ব্রিজের সাথে সোবহানীঘাট পর্যন্ত বর্তমান সড়কটি তৈরীসহ আরও অসংখ্য কাজের সূচনা হয়েছিল এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে।
এক্ষেত্রে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো জিয়াউর রহমানের সাথে সিলেটে এসেছেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। মেন্দিবাগে শাহজালাল ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে সিলেটের আরও অনেক দাবি দাওয়া উপস্থাপন করা হলে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আপনাদের কোনও চিন্তা নেই। টাকার বস্তা নিয়ে এসেছি (সাইফুর রহমানকে দেখিয়ে)। তিনি থাকলে আপনাদের সকল চাওয়া পূরণ হবে।’ আসলেই পরবর্তীতে তাই হয়েছে। এরপর যতদিন অর্থমন্ত্রী এবং পরবর্তী পর্যায়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন এম সাইফুর রহমান, ততদিন হাসিমুখে সিলেটের সকল যৌক্তিক দাবি পূরণ করেছেন তিনি। শুধু কী তাই? তাঁর কাছে হয়তো অন্য কোনও জেলার কোনও প্রকল্পের জন্য ফাইল গিয়েছে, কিন্তু তিনি দেখলেন সেখানে সিলেটের নাম নেই। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সংশ্লিষ্টদের তলব করতেন কেন সিলেটের নাম নেই? অনেকটা শিশুসুলভ আচরণ করে জেদ ধরতেন। বলতেন, ‘সিলেটের নাম না থাকলে সেই ফাইল পাশ হবে না, বরাদ্দও হবে না।’ এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নাছোড়বান্দা। তাঁর এই নাছোড়বান্দা জেদের কারণেই সিলেট পেয়েছে ভেটেরিনারি কলেজ, এগ্রিকালচার (কৃষি) ইউনিভার্সিটি, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মদন মোহন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরসহ এরকম অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড।
আমার মনে আছে, তাঁর অনড় অবস্থানের কারণেই সেদিন সিলেট বিভাগ ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই ঐতিহাসিক রাতের কথা স্বল্প পরিসরে একটু বলা প্রয়োজন সিলেট বিভাগ ঘোষণা করা হবে কি না, তা নিয়ে ঢাকায় রুদ্ধদ্বার মিটিং চলছে। সাইফুর রহমান তখন সিলেট সার্কিট হাউসে অবস্থান করছেন। রাতে খবর এলো সিলেট বিদ্বেষী অন্য জেলার নেতাদের অপতৎপরতায় সিলেটকে বিভাগ ঘোষণা ‘না’ করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুনে রাগে গজগজ করছিলেন সাইফুর রহমান। সেদিনের মতো তাঁর রাগান্বিত মুখ আমি আর কোনদিন দেখিনি। এক পর্যায়ে টেলিফোন করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। ফোনে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আমি মন্ত্রীত্ব চাই না, আগামীকাল আপনি এসে সিলেটকে বিভাগ ঘোষণা করবেন, না হলে আমাকে বিদায় দেবেন, তারপর বিড়বিড় করে সিলেটী ভাষায় বলতে লাগলেন, আমি হখলতা বাদ দিয়া মৌলভীবাজার গিয়া বরি বাইমু। তারপরেও মন্ত্রীত্ব করতাম নায়।’ রাত পৌনে ২টায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরী ফোন করে জানালেন, ‘সিলেট বিভাগ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।’ এই ছিলেন সাইফুর রহমান।
তিন.
আমি পরম সৌভাগ্যবান। আমি আমার রাজনৈতিক জীবনে, মরহুম এম সাইফুর রহমান এর মতো ‘রত্নগর্ভা সিলেট’ সন্তানের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। আমার আজকের অবস্থানের জন্যে চিরকৃতজ্ঞ তাঁর কাছে। এম সাইফুর রহমানই আমার প্রেরণার উৎস। মরহুম এম সাইফুর রহমান আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। ১৬ বছর আগে আজকের এই দিনটিতে (৫ সেপ্টেম্বর) তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আজ এই মহান ব্যক্তির ১৬ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে, তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। আমাদের সিলেট অঞ্চলে সম্প্রীতির যে সংস্কৃতি, তা লালন করতে গিয়ে একজন বিরোধী দলীয় নেতাকে (মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী) সম্মান জানিয়ে তাঁর স্মৃতি রক্ষার স্বার্থে এম সাইফুর রহমান গড়েন হুমায়ুন রশীদ স্কয়ার। শুধু কি তাই! করেছেন কিবরিয়া সেতু, কিবরিয়া চত্বর। যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুকরণীয়।
শেষ করব, সিলেট রেলস্টেশনের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সময়কালীন একটি ঘটনা দিয়ে। এম সাইফুর রহমান যাবেন সিলেট রেলস্টেশনে আধুনিকায়ন কাজের উদ্বোধন করতে। কিন্তু এই কাজের সূচনা করেছিলেন মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। উদ্বোধনের আগে সার্কিট হাউসে বসে এম সাইফুর রহমান জানতে পারলেন কে বা কারা রেলস্টেশনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পুরনো নামফলকটি ভেঙে ফেলেছে। এটা শুনে সাইফুর রহমান খুব রাগ করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামফলক নতুনভাবে না লাগানো পর্যন্ত তিনি সেখানে যাবেন না। অবশেষে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামফলক নতুন করে আরও সুন্দরভাবে লাগানোর পর এম সাইফুর রহমান সেদিন রেলস্টেশন গিয়েছিলেন। গুণীজনের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ ছিল তাঁর। এক্ষেত্রে তিনি দলীয় সংকীর্ণ মনোভাবের উর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতেন। তাঁর সেই আদর্শকে ধারণ করেই আমি পরপর দুই বার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। সিলেটের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিলো অতুলনীয়। মৃত্যুর আগের শুক্রবারেও অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি সিলেটের মানুষের টানে ছুটে এসেছিলেন সিলেটে। যাওয়ার সময় হাসিমুখে বলেছিলেন ‘সিলেটবাসীর মমতা নিয়েই আমি মরতে চাই।’ মহান রব শেষপর্যন্ত তাঁর সেই চাওয়াটুকু পূর্ণ করেছেন।
পরিশেষে বলতে চাই, এম সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর প্রকৃত অর্থেই গত ১৬ বছর সিলেট উন্নয়ন বঞ্চিত হয়ে পড়ে। সিলেট হয়ে পড়েছিল অভিভাবকহীন। এই শূন্যতা এখনো কাটিয়ে উঠা যায়নি।
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা মরহুম এম সাইফুর রহমানকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
লেখক : সাবেক মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা।




