অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুদক
সিলেট বেতারে শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে লুটপাট-দুর্নীতি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১১ নভেম্বর ২০২৫, ১:১৮:৩৯ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
হাওরাঞ্চল ও চাবাগান এলাকায় মোবাইল ফোনে সিলেট বেতারের এফএম অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে শোনাতে ৪শ’ ফুট উঁচু এফএম টাওয়ার স্থাপিত হয়। কিন্তু, সুবিধাভোগীরা তো দূরের কথা, শহরতলীর দক্ষিণ সুরমায়ই ওই অনুষ্ঠান শোনা যাচ্ছে না। যন্ত্রপাতি সংরক্ষণসহ সুবিধার জন্যে সেন্ট্রাল এসি স্থাপন করা হয়। স্থাপনের পর পরই এটি বিকল হয়ে গেছে। আর বেতার ভবনের ছাদ সংস্কারের পরেও পানি পড়ছে ঠিক আগের মতোই। সিলেটের ডাক’র অনুসন্ধানে সিলেট বেতারে শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে লুটপাট-দুর্নীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।
শতকোটি টাকার ওই প্রকল্পের দুর্নীতির ঘটনায় ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজ শুরু করেছে। প্রকল্প পরিচালককে (পিডি) কয়েক দফা চিঠিও দিয়েছে দুদক। বিষয়টি নিয়ে বেতারের অভ্যন্তরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, সিলেট বেতার আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সম্প্রচার যন্ত্রপাতি স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে শুরু হয়। প্রথম দফায় এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫৬ কোটি ২২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। ২০২০ সালের জুন মাসে এটি সমাপ্তির কথা থাকলেও প্রকল্পটি সংশোধন ও প্রাক্কলিত ব্যয় বৃদ্ধি করে ৮৭ কোটি টাকা করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় প্রকল্প সংশোধন করে প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১০০ কোটি ৮৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী গেল ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। টানা আট বছর ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম চললেও প্রকল্পের তথ্যসহ কোনো সাইনবোর্ড কখনো টানানো হয়নি। এমনকি সিলেট বেতারে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা জানতেন না এত বড় একটা মেগা প্রকল্প কোন কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে। কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কত টাকার কাজ করছে তা আজও কেউ শুনেননি। কেবল প্রকল্পের পিডি এসএম জিল্লুর রহমান নিয়মিত ঢাকা থেকে আকাশে উড়ে বিমানের ফ্লাইটে আসা-যাওয়া করতেন। কখনো লম্বা সময় ধরে সিলেটে অবস্থান করতেন।
শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সিলেট বেতারে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সম্প্রচারের কতটুকু ছোঁয়া লেগেছে তার অনুসন্ধানে নামে সিলেটের ডাক। কয়েক মাসের অনুসন্ধানে যে সকল তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তা রীতিমতো বিস্ময়কর। লুটপাট আর দুর্নীতির মধ্য দিয়েই প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়েছে বলে খোদ বেতারের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের কোনো বেতারে ৪শ’ ফুট উঁচু এফএম টাওয়ার না থাকলেও সিলেট বেতারে এমন উঁচু এফএম টাওয়ার স্থাপনের উদ্যোগ নেন তৎকালীন তথ্য সচিব মর্তুজা আহমদ। মর্তুজা আহমদ এজন্য একটি প্রকল্প নিজ হাতে প্রস্তুত করে একনেকে পাসও করিয়ে দেন। যাতে হাওরাঞ্চল ও চাবাগানে নির্বিঘ্নে মোবাইল ফোনে বেতারের এফএম অনুষ্ঠান শোনা যায়। প্রকল্প অনুযায়ী, সিলেট বেতারে ৪শ’ ফুট উঁচু এফএম টাওয়ার স্থাপন করা হয়।
তবে, এ নিয়ে ঘটে গেছে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা। জাপান থেকে ট্রান্সমিশন মেশিন চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসা হয়। বন্দর থেকে খালাসের সময় অসাবধানের দরুন মেশিনটি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাপ্লায়ার কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা মেশিনটি স্থাপনের পরিবর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত মেশিনটি স্থাপন করে। এর ফলে বর্তমানে সিলেট নগর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরবর্তী এলাকায় বেতারের এফএম অনুষ্ঠান শোনা যাচ্ছে না।
বেতারের রেকর্ডিং স্টুডিওর যন্ত্রপাতি সংরক্ষণসহ প্রয়োজনীয় কারণে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (সেন্ট্রাল এসি) স্থাপন করা হয়। কিন্তু ওই সেন্ট্রাল এসি স্থাপনের মাস যেতে না যেতেই এটি নষ্ট হয়ে যায়। পরে ছোট ছোট এসি দিয়েই এখনকার কার্যক্রম চলছে।
রেকর্ডিং স্টুডিও ভবনের ছাদ সংস্কার করা হয়। কিন্তু সংস্কার কাজ করার বছর পূর্ণ হবার আগেই আবারও ওই ছাদ দিয়ে পানি ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে ভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। একটু বেশি মাত্রার বৃষ্টি হলেই অভ্যন্তরে টপটপ করে পড়ে বৃষ্টির পানি।
মূল প্রবেশপথের অভ্যর্থনা কক্ষেও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করছে। এখানে ছোট একটা এসি এবং রং এর প্রলেপ দিয়েই কাজ সারা হয়েছে।
একইভাবে প্রশাসনিক ভবন পুরোপুরি সংস্কারের কথা থাকলেও কেবল নিম্ন মানের রং এর প্রলেপ দিয়েই কাজ শেষ। ভবনটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর তৃতীয় তলায় বৃষ্টির পানি পড়ে সেই আগের মতোই।
বেতারের দেয়ালে দেয়া হয়েছে টাইলস। টাইলসে সংস্কৃতির বিভিন্ন চিহ্ন, জেনারেল ওসমানী, হাছন রাজা, রাধারমন, শাহ আব্দুল করিমসহ দেশের মরমি শিল্পী-সাধকদের ছবি থাকারও কথা ছিল। কিন্তু টাইলসে তো গুণীজনদের কোনো চিহ্ন নেই ; বরং পুরো দেয়ালে একেবারে নিম্নমানের টাইলস দেয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় একটি ডরমিটরি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু মানহীন ও নিম্ন মানের মালামাল দিয়ে এটি নির্মাণের ফলে ভবনটিতে নানান অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। জানালার রডে মরিচা ধরেছে। একইভাবে ১৫০ আসনের অডিটোরিয়াম নির্মাণের কথা থাকলেও এটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৩০ আসন বিশিষ্ট।
প্রকল্পটি শুরুর পরে মুজিবুর রহমান নামের এক কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক ও এস এম জিল্লুর রহমানকে উপ-প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়। কয়েক মাস যেতে না যেতেই এস এম জিল্লুর রহমান পিডি পদে পদোন্নতি পান। বলা যায়, পুরো প্রকল্প পিডি জিল্লুর রহমানের হাতেই সমাপ্ত হয়েছে। গত জুন মাসে প্রকল্প সমাপ্তির পর সেই পিডিকে সিলেট বেতারের আঞ্চলিক প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। বর্তমানে তিনি এ পদে কর্মরত আছেন ।
সূত্র জানায়, মেগা প্রকল্পটি তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদের স্ত্রী ও শ্যালক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলেমিশে করেন। এক্ষেত্রে পিডি তাদেরকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। একটি সিন্ডিকেট তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী মানহীন সিমেন্ট, মানহীন টাইলস দিয়ে প্রকল্পের কাজ করা হয়। পিডি এতোটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে সিলেট বেতারের কোনো কর্মকর্তা তার সাথে ঠিকঠাকমতো কথাই বলতে পারেননি। এমনকি আঞ্চলিক পরিচালক ও আঞ্চলিক প্রকৌশলীকে প্রকল্পের কোনো তথ্য পর্যন্ত দেননি পিডি।
এদিকে, শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি ও লুটপাটের বিষয়ে দুদকের একটি টিম সম্প্রতি সিলেট বেতারে যান। এ নিয়ে মোট তিন দফায় দুদকের টিম সিলেট বেতারে গিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চান। এক পর্যায়ে প্রকল্পের পিডিকে দুদক চিঠি দিয়ে প্রকল্পের সকল কাগজপত্র দুদকে জমা দিতে বলেন।
এ বিষয়ে দুদকের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে দুদক সূত্র জানিয়েছে, বেতারের এই প্রকল্প নিয়ে দুদক তদন্ত করছে। অনেক কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক তারিক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, প্রকল্পের ব্যাপারে পিডি বলতে পারবেন। আমাকে প্রকল্পের বিষয়ে কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। সিলেট বেতারের বর্তমান আঞ্চলিক প্রকৌশলী ও বেতারের মেগা প্রকল্পের পিডি এস এম জিল্লুর রহমানকে প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, গত জুন পর্যন্ত আমি প্রকল্পের পিডি ছিলাম। এরপর আর পিডি নই; কারণ প্রকল্প সমাপ্ত হয়ে গেছে। আমার বর্তমান পরিচয় এখানকার আঞ্চলিক প্রকৌশলী। প্রকল্পের বিষয়ে কোনো কিছু জানতে চাইলে আমাদের প্রধান প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তিনি, দুদকের চিঠির সত্যতা স্বীকার করেন। তবে, তিনি পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ না করতে এ প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেতারের প্রধান প্রকৌশলী মুনীর আহমদ সিলেটের ডাককে বলেন, আমি অল্প কিছু দিন হল দায়িত্ব পেয়েছি। সিলেট বেতারের উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা নেই। প্রকল্পে অনিয়ম হলে দুদক তদন্ত করতেই পারে। এটি দুদকের কাজ। এর বাইরে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।




