ওয়াজ মাহফিল, ঐতিহ্য ও সংস্কার
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ৪:৫৬:১৫ অপরাহ্ন
মাহফুজ বিন মোবারকপুরী :
ওয়াজ মাহফিল বর্তমান বাংলাদেশ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুসলিম সমাজে ইসলামী নসিহত এবং জ্ঞান বিতরণের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। ওয়াজ মাহফিল এখন শুধু সাধারণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতি বলাই উপযুক্ত। আরবি ‘ওয়াজ’ শব্দের অর্থ ‘উপদেশ’ এবং ‘মাহফিল’ অর্থ ‘সভা’ বা ‘সমাবেশ’। ওয়াজ মাহফিলের সংজ্ঞায় বলা যায়, একজন বা একাধিক ওয়ায়েজিন (বক্তা) কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী ইতিহাসের আলোকে বক্তৃতা দেন মানুষের ইসলাহ বা সংশোধনের উদ্দেশ্যে।
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, ইসলামের শুরু থেকেই ওয়াজ মাহফিল প্রচলিত ছিল। রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদের সামনে নিয়মিত ওয়াজ করতেন। ওমর (রা.) ও ওসমান (রা.)-এর সময়কালে ওয়াজ মাহফিলগুলো মসজিদের গন্ডি পেরিয়ে সম্প্রসারিত হতে থাকে। তারা বিজিত এলাকায় ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করে মানুষকে ইসলামের বাণী শুনাতেন। পরবর্তীকালে উমাইয়া খিলাফত, আব্বাসী খিলাফত এবং ওসমানী সালতানাতে ওয়াজ মাহফিলের প্রচলন আরও বৃদ্ধি পায়। হাসান বসরী (রহ.)-এর ওয়াজ শুনে হাজার হাজার শ্রোতা কান্নায় মুহ্যমান হয়ে পড়তেন। ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর মাহফিলে ত্রিশ হাজারের অধিক শ্রোতার সমাগম হতো। ইবনুল জাওজী (রহ.)-এর মাহফিলে লক্ষাধিক শ্রোতা সমবেত হতো এবং হাজার হাজার মানুষ তাওবা করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিত।
ভারতীয় উপমহাদেশে মুগল আমলে ওয়াজ মাহফিলের সম্প্রসারণ ঘটে। এখানে সুফি দরবেশদের অবদান অপরিসীম। সুফি পীররা মসজিদ, খানকাহ এবং মাহফিলের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে, ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ইসলামী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট দেখা দিলে, ওয়াজ মাহফিলগুলো তখন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রূপান্তরিত হয়। আর তখন থেকেই ওয়াজে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট যুক্ত হতে থাকে।
১৯৪৭-এর বিভাজন এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর এটি বাঙালি মুসলিম পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সময়কাল থেকে মাহফিলগুলিতে আরবি-ফারসি-বাংলা কোড-সুইচিংয়ের মাধ্যমে কমিউনাল আডিনটিটি গড়ে ওঠে। এভাবে এক সময় বাংলাদেশে এটি গ্রামীণ উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে এবং অশ্লীল অনুষ্ঠান (যেমন যাত্রা)-এর জায়গা দখল করে।
যদিও ওয়াজ মাহফিল ইসলাম প্রচারের চমৎকার মাধ্যম, বর্তমানে এর ধারা বদলে ‘পেশা’-য় পরিণত হয়েছে। ওয়াজ মাহফিলের নামে যা চলছে, তাকে ‘মাহফিল’ না বলে ‘মেলা’ বা ‘সার্কাস’ বলাই বাঞ্ছনীয় মনে হয়। পূর্বে বক্তা বিনা বিনিময়ে দ্বীন প্রচার করতেন; এখন মোটা অর্থের পারিশ্রমিকই মূল আকর্ষণ। সুরেলা কণ্ঠ, উদ্ভট আচরণ, আজগুবি গল্প- এসব দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো হারাম। কুরআন-হাদিসের বাইরে মনগড়া কথা, রাজনৈতিক স্বার্থ বা দলীয় এজেন্ডা চাপিয়ে দেয়া হয়। ফলে শ্রোতারা বিনোদন পান ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান বা আমলের প্রেরণা পান না। আমাদের আকাবিরদের গড়া এ পবিত্র সংস্কৃতি আজ ধ্বংসের পথে।
এক সময় মানুষ বিনোদনের জন্য যাত্রাপালার আয়োজন করত; এখন যাত্রাপালার পরিবর্তে কিছু যুবক বিনোদনের লক্ষ্যে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করছে। সে লক্ষ্যে ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে ভাড় বা কৌতুক করা বক্তাকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দাওয়াত দিয়ে আনা হচ্ছে। কথিত ভাইরাল বক্তাদের সরাসরি চুক্তি করে, দরকষাকষি করে নির্ধারণ করা অর্থের কিছু অংশ অগ্রীম ও কিছু অর্থ ওয়াজের দিন দেওয়া হচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, কিছু বক্তা চুক্তিকৃত কথিত ‘হাদিয়া’ থেকে কম পেলে ফেসবুক লাইভে এসে নির্লজ্জের মতো সেটা প্রচার করছে। একজন আলেম হিসেবে যে গয়রত ও আত্মমর্যাদা থাকা জরুরি, সেটা ধারেকাছেও তারা থাকছে না। ফলে পাবলিকের কাছে তারা একেকজন ‘পেশাদার’ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কিছু বিবেচিত হচ্ছে না। এরা দ্বীনের দাওয়াতের একটা মহান তরিকাকে পেশা ও ব্যবসায় পরিণত করছে। এতে দ্বীন, দেশ ও জাতির উপকারের বদলে অপকারই বেশি হচ্ছে।
অন্যদিকে আয়োজকরাও প্রকৃত দায়ি ইলাল্লাহ আলেমদের দাওয়াত না দিয়ে ‘ভাইরাল’ বক্তাদের আমন্ত্রণের মাধ্যমে দিনদিন রুচির দুর্ভিক্ষ বাড়াচ্ছে। আয়োজকরা যদি দ্বীনের ব্যাপারে সচেতন হন এবং চুক্তিবাদী বক্তাদের পরিহার করে মাহফিলের আয়োজন করেন, তাহলে ওই পেশাদার বক্তারা সয়ংক্রিয়ভাবে মাহফিলের জগত থেকে ঝরে যাবে। এতে ওয়াজের পবিত্র ময়দান আগাছামুক্ত হবে। তাই ওয়াজ মাহফিলগুলোকে দ্বীনি ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনতে আয়োজকদের সচেতনতা ও দ্বীনি কনসেপ্ট গ্রহণের বিকল্প নেই।
বলা হয়, ‘ভাইরাল’ বক্তা না আনলে মাহফিলে লোক কম হয়, এজন্য চুক্তি করে তাদেরকে আনা হয়। কিন্তু এই সত্য বুঝতে হবে যে, বেশি লোক জমায়েত হওয়ার নাম মাহফিলের সফলতা নয়, সফলতা হলো মাহফিলের দ্বারা কয়জন লোক হেদায়ত হলো, নামাজি হলো, সেটা। ওয়াজের উদ্দেশ্য যদি দ্বীনি দাওয়াত ও হেদায়ত না হয়, যদি উদ্দেশ্য হয় ‘কালেকশন’ ও ‘বিনোদন’, তাহলে আয়োজনের সকল মেহনত বৃথা যেতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, ইখলাসের নিয়তে উম্মতের ফিকিরে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হলে আল্লাহ তাআলা আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনগুলো গায়েবি খাজানা থেকে পুরণ করে দেবেন। ওয়াল্লাহুল গানিয়্যু ওয়া আনতুমুল ফুকারা। এটা আল্লাহর কথা। তাই আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পারলে আমাদের প্রয়োজনগুলো দেখবেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। এই বিশ্বাস আমাদের মনে রাখতে হবে।
ডিজিটাল যুগে ওয়াজ সহজলভ্য হয়েছে, শোনার প্রবণতাও বেড়েছে, কিন্তু আমলে এর প্রভাব পড়ছে না। কারণ আদর্শ মাহফিলের সংকট। হাদিসে আছে, ‘কর্মের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ ওয়াজ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সমাজশুদ্ধির নিয়তে না হয়, তবে তা হৃদয় স্পর্শ করবে কি করে? বক্তা হওয়া উচিত মুখলিস, আমলদার, পরহেজগার- যাঁরা কুরআন-হাদিসের আলোকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করবেন, কুসংস্কার খণ্ডন করবেন, আমলের প্রতি আগ্রহী করবেন। লৌকিকতা, কৌতুক বা অপ্রাসঙ্গিক কথা পরিহার করা হবে। মাহফিল হবে নসিহতের মঞ্চ, সার্কাস নয়।
মাহফিল এশার নামাজের পর সর্বোচ্চ ১১-১২টা পর্যন্ত সীমিত রাখা উচিত, যাতে ফজরের নামাজ ও কর্মজীবন ব্যাহত না হয়। মাইকের ব্যবহার এমন হওয়া চাই যেন রোগী বা প্রতিবেশীর কষ্ট না হয়। অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তি বা ব্যবসায়িকে আমন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য বা হস্তক্ষেপ যেনো মাহফিলের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট না করে। মাহফিল কেবল সাময়িক অনুপ্রেরণা নয়, বরং জীবনের দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। আমার আব্বা শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল মালিক মোবারকপুরী (রহ.) পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন একটি মাহফিলে গিয়ে নামাজের ওয়াক্ত কখন হয় সে বিষয়ে ওয়াজ শুনেছিলেন। ফিক্বহের উচ্চ কিতাবাদীর এই মাসআলাটি কখনও আলোচনায় আসলে সে অনুযায়ী মাস’লা দিতেন।
অতএব, প্রচলিত ওয়াজ মাহফিল সংস্কার না হলে বন্ধ করাই উত্তম। জনগণকে সচেতন হতে হবে, বর্তমান অভিভাবক আলিম-উলামাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। মাহফিলগুলোকে ভাড় ও পেশাদার বক্তা নামক ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্ত করে আকাবিরদের আদর্শে ফিরিয়ে আনলে ওয়াজ মাহফিল আবারও জাতির কল্যাণে রূপান্তরিত হবে। এটি আমাদের সকলের দায়িত্ব।
লেখক : কলামিস্ট।




