ভেনিজুয়েলা সংকট ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের বিবর্তন
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:০৪:৫১ অপরাহ্ন
আরণ্যক শামছ :
ভেনেজুয়েলার মাটিতে গতকাল (৩ জানুয়ারি ২০২৬) যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর ঘটনাটি ঘটেছে, তাকে কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বরাজনৈতিক কৌশলের ধারাবাহিকতা।
বিগত চার-পাঁচ দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে যে আধিপত্যবাদী নীতি অনুসরণ করে আসছে, ভেনেজুয়েলা তার সর্বশেষ শিকার। এই প্রক্রিয়াটি বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই ‘আমেরিকান এক্সেপশনালিজম(American Exceptionalism) বা ‘আমেরিকার ব্যতিক্রমবাদ’ তত্ত্বের গভীর গভীরে প্রবেশ করতে হবে। এই দার্শনিক তত্ত্বটি আমেরিকাকে এমন এক উচ্চতায় স্থাপন করে, যেখানে তারা মনে করে যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে তাদের নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ‘গণতন্ত্র’ বা ‘মানবাধিকার’ রক্ষা করার এক অলিখিত ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার রয়েছে। এই মনস্তত্ত্ব থেকেই জন্ম নেয় অন্যের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা।
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে একে আমরা ‘লিবারেল ইম্পেরিয়ালিজম’ বা ‘উদারপন্থী সাম্রাজ্যবাদ’ বলতে পারি। এখানে সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে আসে না, বরং আসে আদর্শিক মোড়কে। জন স্টুয়ার্ট মিল বা অ্যালেক্সিস ডি টকভিল-এর মতো দার্শনিকরা যখন সভ্যতার প্রসারের কথা বলতেন, তখন তারা পরোক্ষভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের আধিপত্যকেই সমর্থন করতেন।
আমেরিকা এই দর্শনকে আধুনিক যুগে নতুন রূপ দিয়েছে। তারা যখন পানামা, ভিয়েতনাম বা ইরাকে অভিযান চালায়, তখন তাদের মূলমন্ত্র থাকে ‘স্বাধীনতা’। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই স্বাধীনতার সংজ্ঞা নির্ধারিত হয় ওয়াশিংটনের ড্রয়িং রুমে।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি-র ‘কালচারাল হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্বটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গ্রামসি দেখিয়েছিলেন যে, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগ করে শাসন করে না, বরং তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে শাসিতরা মনে করে যে এই শাসন বা পরিবর্তন তাদের মঙ্গলের জন্যই হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি কীভাবে বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে বিদেশি হস্তক্ষেপই একমাত্র সমাধান।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে আমরা দেখি, আমেরিকার এই অভিযানের তালিকা দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী। ১৯৫০-এর দশকে ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করার সেই ‘অপারেশন এজাক্স’ ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। মোসাদ্দেক ছিলেন একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা, যার অপরাধ ছিল তিনি ইরানের তেল সম্পদকে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলোর হাত থেকে রক্ষা করে নিজের দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সেই সময় আমেরিকা ও ব্রিটেন মিলে যে অভ্যুত্থান ঘটায়, তা ছিল আধুনিক ইতিহাসে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর প্রথম সুসংগঠিত ব্লুপ্রিন্ট। এরপর একে একে চিলির সালভাদর আলেন্দে, গুয়াতেমালার জাকোবো আরবেনজ কিংবা কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা- প্রত্যেকেই আমেরিকার এই গোপন বা প্রকাশ্য অভিযানের শিকার হয়েছেন। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি সাধারণ মিল ছিল- দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার দাবি করেছিল।
সামাজিক বিবর্তনবাদ বা ‘সোশ্যাল ডারউইনিজম’-এর একটি বিকৃত রূপ আমরা বিশ্ব রাজনীতিতে দেখতে পাই, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো মনে করে দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা তাদের টিকে থাকার লড়াইয়েরই অংশ।
আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘মন্রো ডকট্রিন’ (Monroe Doctrine) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ১৮২৩ সালে প্রবর্তিত এই নীতি অনুযায়ী, সমগ্র আমেরিকা মহাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব প্রভাব বলয় বা ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে গণ্য করে।
ভেনেজুয়েলা যখন এই প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক বা স্বনির্ভর পথ বেছে নিতে চেয়েছিল, তখনই আমেরিকার সাথে তাদের সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। এখানে মানবাধিকারের বুলিটি কেবল একটি রাজনৈতিক অস্ত্র বা ‘পলিটিক্যাল টুল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশনস’ বা ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ তত্ত্বটি এখানে ভিন্নভাবে কাজ করে; এটি কেবল ধর্মের লড়াই নয়, বরং এটি হলো পশ্চিমা পুঁজিপতি ব্যবস্থার সাথে যেকোনো বিকল্প ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ভেনেজুয়েলার ঘটনাপ্রবাহে আমরা দেখেছি কীভাবে এনজিও এবং তথাকথিত নাগরিক সমাজকে অর্থায়নের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম গণরোষ তৈরি করা হয়। জেন শার্প তার ‘ডিক্টেটরশিপ টু ডেমোক্রেসি’ বইতে অহিংস প্রতিরোধের যে কৌশলের কথা বলেছেন, আমেরিকা তা বিভিন্ন দেশে ‘কালার রেভোলিউশন’ বা রঙিল বিপ্লবের জন্য ম্যানুয়াল হিসেবে ব্যবহার করে।
এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে সাধারণ মানুষের আবেগ ও অভাবকে ব্যবহার করে একটি বৈধ সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। ভেনেজুয়েলায় গত কয়েক বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা ‘স্যাঙ্কশন’ ছিল এই যুদ্ধেরই একটি অংশ। যখন কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়, তখন তার মূল লক্ষ্য থাকে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তোলা, যাতে তারা বাধ্য হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এটি মানবাধিকার রক্ষার পথ নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর কৌশল।
ভেনেজুয়েলার শাসন পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী কাঠামোর ফসল। আমেরিকা যখন কোনো দেশে অভিযানের ডাক দেয়, তখন সেখানে কেবল সৈন্য পাঠায় না, বরং সাথে নিয়ে যায় তাদের কর্পোরেট স্বার্থ এবং ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন থেকে শুরু করে আরব বসন্তের ব্যর্থতা পর্যন্ত- প্রতিটি মোড়ে আমেরিকা তাদের ‘অর্ডার’ বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই শৃঙ্খলা প্রায়শই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য বয়ে এনেছে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা। ভেনেজুয়েলার এই প্রেক্ষাপটটি আসলে বিশ্বব্যাপী চলা এক বৃহৎ দাবার গুটির চাল, যেখানে গণতন্ত্রের লেবাসে ঢাকা রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষুধা।
বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি একবার বলেছিলেন, “For the powerful, crimes are those that others commit, not those that we commit.” অর্থাৎ, ‘শক্তিশালী পক্ষের কাছে অপরাধ হলো কেবল সেগুলোই যা অন্যরা করে, আমরা যা করি তা অপরাধ নয়।’ এই উক্তিটি আমেরিকার গত পাঁচ দশকের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সত্য। তারা যখন অন্য দেশে সরকার পরিবর্তন করে, তখন তাকে বলা হয় ‘মুক্তি’; কিন্তু অন্য কেউ যদি তাদের স্বার্থে আঘাত করে, তবে তাকে বলা হয় ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘স্বৈরাচার’। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই দ্বিমুখী নীতির চূড়ান্ত রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করছি।
প্রাকৃতিক সম্পদের রাজনীতি এবং কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন আমেরিকার বিদেশনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে কোনো সংঘাত বা বিপ্লবই নিছক আদর্শিক লড়াই নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর নেপথ্যে কাজ করে ‘রিসোর্স জিওপলিটিক্স’ বা সম্পদের ভূ-রাজনীতি।
ভেনিজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতির গভীরে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, এর মূল কারণ দেশটির বিশাল তেল ভাণ্ডার। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ ধারণ করে, যা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি। আমেরিকার মতো একটি বিশাল শিল্পোন্নত এবং ভোগবাদী রাষ্ট্রের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
যখনই ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানরা, বিশেষ করে হুগো চাভেজ এবং পরবর্তীতে নিকোলাস মাদুরো, এই তেল সম্পদকে পশ্চিমা কর্পোরেশনগুলোর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছেন, তখনই তারা ওয়াশিংটনের ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
এই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের ‘রিসোর্স কার্স’ বা প্রাকৃতিক সম্পদের অভিশাপ তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করতে হবে। সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যেসব দেশ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, তারাই সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়।
আমেরিকা বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকা পর্যন্ত যে সামরিক ও রাজনৈতিক অভিযান চালিয়েছে, তার মানচিত্র আর খনিজ সম্পদের মানচিত্র প্রায় একই রকম। ইরাক আক্রমণ করার সময় আমেরিকা বলেছিল সেখানে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ রয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের পর আবিষ্কৃত হলো যে আসল লক্ষ্য ছিল বাগদাদের তেলের কূপগুলো। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই প্যাটার্ন কাজ করছে।
যখন আমেরিকা কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তারা আসলে সেই দেশের রক্ত সঞ্চালন বা অর্থনৈতিক ধমনী বন্ধ করে দেয়, যা মূলত তাদের সম্পদকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি কৌশল।
ভূ-রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার তার ‘হার্টল্যান্ড থিওরি’-তে বলেছিলেন যে, যারা বিশ্বের কৌশলগত অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই বিশ্ব শাসন করবে। আধুনিক যুগে এই কৌশলগত অঞ্চলের সংজ্ঞা কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিস্তৃত হয়েছে যেখানে বিরল খনিজ সম্পদ বা ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস’ পাওয়া যায় সেখানেও।
বর্তমানে আমরা যে ডিজিটাল যুগে বাস করছি, সেখানে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির জন্য লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং কল্টানের মতো খনিজ পদার্থ অপরিহার্য। ভেনিজুয়েলা কেবল তেলেই সমৃদ্ধ নয়, তাদের রয়েছে প্রচুর সোনা, লোহা এবং বিরল খনিজ।
আমেরিকার জন্য ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে হলো এই বিশাল ভাণ্ডারের ওপর চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব বাড়তে দেওয়া। ফলে ‘রেজিম চেঞ্জ’ এখানে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং সম্পদের মালিকানা পরিবর্তনের একটি প্রকল্প। তাই কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর পর্যন্ত যে বাণিজ্যিক রুট, সেখানে ভেনিজুয়েলার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকা তার ‘ডলার ডিপ্লোম্যাসি’-র মাধ্যমে দীর্ঘদিন এই অঞ্চলকে নিজের করতলে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু যখন ভেনিজুয়েলা রাশিয়ার সাথে সামরিক সহযোগিতা শুরু করল কিংবা চীনের সাথে বড় ধরনের জ্বালানি চুক্তি করল, তখন আমেরিকার একক আধিপত্য বা ‘হেজিমনি’ হুমকির মুখে পড়ল। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল স্মিট-এর ‘গ্রসম্যান’ (Grossraum) তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সবসময় তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির প্রবেশ রোধ করতে চায়। আমেরিকা ঠিক এই কাজই করছে; তারা কোনোভাবেই চায় না তাদের ‘নিজস্ব আঙিনায়’ চীন বা রাশিয়ার উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হোক।
প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে এই যে প্রতিযোগিতা, একে সমাজতত্ত্ববিদরা ‘নিও-কলোনিয়ালিজম’ বা নব্য-উপনিবেশবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এখানে সরাসরি ভূখণ্ড দখল করা হয় না, বরং আন্তর্জাতিক আইন, বাণিজ্য চুক্তি এবং অনুগত সরকারের মাধ্যমে সেই ভূখণ্ডের সম্পদ শোষণ করা হয়। ভেনিজুয়েলায় আমেরিকা যাকে ‘গণতান্ত্রিক নেতা’ হিসেবে সমর্থন দেয়, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তার প্রথম প্রতিশ্রুতিই থাকে তেলের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করা।
হেনরি কিসিঞ্জারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে বারবার স্মরণে আসে : “If you control the oil, you control the country” অর্থাৎ, ‘যদি তুমি তেল নিয়ন্ত্রণ করতে পারো, তবে তুমি পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’ ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বা মানবাধিকার নিয়ে ওয়াশিংটনের মাথাব্যথা নেই, তাদের মূল লক্ষ্য হলো তেল ও খনিজ সম্পদের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী পানিসম্পদ এবং উর্বর ভূমির দখল। ভেনিজুয়েলা আমাজন অববাহিকার অংশ হওয়ার কারণে এর জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ অমূল্য। ভবিষ্যতের বিশ্বে যখন পানির সংকট প্রকট হবে, তখন এই অঞ্চলগুলো হবে ভূ-রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। আমেরিকা এখন থেকেই সেই ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো দেশগুলোতে তারা যখন অস্থিরতা তৈরি করে, তখন তারা কেবল বর্তমানের কথা ভাবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত অবস্থানের কথা মাথায় রাখে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পেছনে কাতার-তুরস্ক পাইপলাইন বনাম ইরান-ইরাক পাইপলাইনের যে প্রতিযোগিতা ছিল, তা আজ আর কারো অজানা নয়।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও আমেরিকার এই মরিয়া ভাব প্রমাণ করে যে, তারা কোনোভাবেই দক্ষিণ আমেরিকায় একটি সার্বভৌম এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক শক্তিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না।
ভেনিজুয়েলার এই তথাকথিত শাসন পরিবর্তন আসলে একটি ‘রিসোর্স ওয়ার’ বা সম্পদের যুদ্ধ। ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র এখানে কেবল একটি আবরণ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে লুণ্ঠন ও শোষণের এক বিশাল পরিকল্পনা। আমেরিকা তার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিগত চার দশক ধরে ঠিক এই কাজটিই করে আসছে- যেখানে সম্পদ আছে, সেখানেই তারা গণতন্ত্রের মশাল নিয়ে হাজির হয়েছে, আর বিনিময়ে সেই দেশের সম্পদ নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে। এই সম্পদ দখল এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের পরিণাম হলো সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং ধ্বংসস্তূপ।
আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো দেশকে দখল করা এখন আর টেকসই কোনো সমাধান নয়। আমেরিকা গত কয়েক দশকে ‘হার্ড পাওয়ার’ বা সামরিক শক্তির চেয়ে ‘সফট পাওয়ার’ এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, সরাসরি আক্রমণের বদলে সেখানে বছরের পর বছর ধরে একটি কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার প্রধান অস্ত্র হলো ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ বা তথ্যযুদ্ধ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোসেফ নাই যখন ‘সফট পাওয়ার’-এর ধারণা প্রবর্তন করেন, তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন কীভাবে অন্য দেশকে নিজের ইচ্ছার অনুকূলে আনা যায় কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ ছাড়াই। ভেনিজুয়েলায় আমেরিকা এই সফট পাওয়ারের একটি আক্রমণাত্মক সংস্করণ প্রয়োগ করেছে।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রথম ধাপ হলো লক্ষ্যবস্তু দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করা এবং তার নেতাকে একজন ‘দানব’ বা ‘একনায়ক’ হিসেবে চিত্রিত করা। নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড এস. হারম্যান তাদের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ (Manufacturing Consent) বা ‘সম্মতি উৎপাদন’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, কর্পোরেট মিডিয়া কীভাবে নির্দিষ্ট একটি এজেন্ডা সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দেয়।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো নিরন্তরভাবে প্রচার করেছে যে দেশটি কেবল দুঃশাসনের কারণেই ধ্বংস হচ্ছে, অথচ তারা সযত্নে এড়িয়ে গেছে আমেরিকার আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কথা। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আসলে এক ধরনের ‘নীরব যুদ্ধ’, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নেয়, ওষুধের সংকট তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করে।
সামাজিক সমাজতত্ত্বের ভাষায় একে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলা যায়। আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে নামার বদলে সিআইএ (CIA) এবং এনইডি (National Endowment for Democracy)-এর মতো সংস্থার মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরে তথাকথিত ‘প্রো-ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রকামী গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। এদের কাজ হলো সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ ছড়ানো এবং বিদেশি সাহায্যকে একমাত্র মুক্তির পথ হিসেবে তুলে ধরা।
ইউক্রেনের ‘কমলা বিপ্লব’ (Orange Revolution) বা মিশরের ‘তাহরির স্কয়ার’-সবখানেই এই একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা গেছে। একে বলা হয় ‘অরগানাইজড ক্যাওস’ বা সুসংগঠিত বিশৃঙ্খলা। দার্শনিক জঁ বদরিয়ার-এর ‘সিমুলাক্রা’ (Simulacra) তত্ত্ব অনুযায়ী, আজকের বিশ্বে সত্যের চেয়ে সত্যের ‘প্রতিচ্ছবি’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া যখন বারবার একটি মিথ্যা প্রচার করে, তখন সাধারণ মানুষ সেই মিথ্যেকেই ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেয়।
ভেনিজুয়েলার শাসন পরিবর্তনে ‘সফট পাওয়ার’-এর আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত। যখন কোনো দেশের ব্যাংকিং সিস্টেম হ্যাক করা হয় বা আন্তর্জাতিক লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেই দেশের সাধারণ মানুষ মনে করে এটি সরকারের ব্যর্থতা।
এই মনস্তাত্ত্বিক চাপটি সরাসরি জনগণের ওপর পড়ে, যা সমাজবিজ্ঞানী মিশেল ফুকোর ‘বায়োপাওয়ার’ (Biopower) ধারণাকে মনে করিয়ে দেয়। রাষ্ট্র যখন মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্র তার বৈধতা হারায়Ñ আর আমেরিকা ঠিক এই শূন্যস্থানটিই তৈরি করতে চায়।
এক্ষেত্রে ইংরেজি সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উক্তি ও তার দর্শন টেনে আনা যায়। জর্জ অরওয়েল তার ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে বলেছিলেন, “Who controls the past controls the future. Who controls the present controls the past.” অর্থাৎ, ‘যারা অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করে। যারা বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
আমেরিকা এই প্রচারণার মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং তাদের সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের স্মৃতি মুছে দিয়ে সেখানে একটি পশ্চিমা পাপেট ব্যবস্থার স্বপ্ন ফেরি করছে। ভেনিজুয়েলার তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশকে এই ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর মোহে আচ্ছন্ন করা হয়েছে, যাতে তারা তাদের নিজস্ব সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে দ্বিধা না করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি বড় অংশ হলো ‘মানবাধিকার’-এর দোহাই দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া। একে বলা হয় ‘হিউম্যানিটেরিয়ান ইন্টারভেনশনিজম’।
যুগোস্লাভিয়া থেকে লিবিয়া পর্যন্ত প্রতিটি অভিযানে আমেরিকা এই কার্ডটি খেলেছে। তারা প্রথমে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে, তারপর সেই অস্থিরতা দমানোর নামে বোমা বর্ষণ বা সরকার পরিবর্তন করে। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও গতকালের ‘রেজিম চেঞ্জ’ ছিল এই দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এটি কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং একটি স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদাকে প্রচারণার জোরে ভেঙে দেওয়ার এক ধ্রুপদী উদাহরণ।
বিগত চার-পাঁচ দশকে আমেরিকার ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের মিশনগুলো যেখানেই সফল হয়েছে, তার পরবর্তী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এক ভয়াবহ শূন্যতা আর ধ্বংসস্তূপের চিত্র ফুটে ওঠে। আমরা যদি লিবিয়ার দিকে তাকাই, তবে দেখব যে এক সময়ের সমৃদ্ধ দেশ আজ উপদলীয় কোন্দল আর চরমপন্থার চারণভূমি।
ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, তা লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক এই পটপরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী যে, যখন কোনো পরিবর্তন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং তার মূলে থাকে সম্পদের লালসা, তখন সেই দেশে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর পরিণাম হলো ‘স্টেট ফেইলিউর’ বা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। যখন একটি প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থাকে বিদেশি মদদে উপড়ে ফেলা হয়, তখন সেখানে যে প্রশাসনিক ও আইনি শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করতে কয়েক দশক লেগে যায়।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও গতকালের ঘটনার পর সমাজতাত্ত্বিক অস্থিরতা বাড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হবে শরণার্থী সংকট, যা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোকেই নয়, বরং পুরো মহাদেশকে চাপে ফেলবে। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্না আরেন্ডট তার ‘দ্য অরিজিনস অফ টোটালিটারিয়ানিজম’ গ্রন্থে বুঝিয়েছিলেন যে, কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এই ‘বিশৃঙ্খলা’ আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য একটি সুযোগ, যাতে তারা তাদের পছন্দমতো চুক্তিতে দেশটির তেল উত্তোলনের অধিকার ফিরে পায়।
তবে বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি আর ১৯৯০ বা ২০০০-এর দশকের মতো এককেন্দ্রিক নেই। এতদিন আমেরিকা ‘ইউনিপোলার’ বা একমেরু বিশিষ্ট বিশ্ব পরিচালনা করত, যেখানে তাদের কথাই ছিল শেষ কথা। কিন্তু ভেনিজুয়েলা সংকটে আমরা দেখেছি রাশিয়া, চীন, এবং ইরানের মতো শক্তিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা। চীন তাদের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং রাশিয়া তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে আমেরিকাকে এই অঞ্চলে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বিশ্ব এখন ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। ব্রিকস (BRICS)-এর মতো জোটগুলোর শক্তিশালী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একাধিপত্য কমানোর প্রচেষ্টা (De-dollarization) আমেরিকার এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ পলিসিকে ভবিষ্যতে আরও কঠিন করে তুলবে।
ভবিষ্যতের প্রভাব হিসেবে আমরা দেখতে পাব যে, প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে মিনারেল আর্থ এবং বিরল খনিজ সংগ্রহের লড়াই আরও প্রকাশ্য ও সহিংস হবে। ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা হবে এই নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মূল কেন্দ্র। দার্শনিক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘এন্ড অফ হিস্ট্রি’ (The End of History) তত্ত্বে যা দাবি করেছিলেন- অর্থাৎ পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রই হবে মানবজাতির চূড়ান্ত গন্তব্য- তা আজ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে, গণতন্ত্রের নামে আসলে কর্পোরেট স্বার্থের প্রসারণ ঘটছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের ‘অ্যান্টি-আমেরিকানিজম’ বা আমেরিকা বিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন সফট পাওয়ারকে ধ্বংস করে দেবে।
ভেনিজুয়েলার এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে সারা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। শিক্ষাটি হলো- জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বজায় রাখা ছাড়া কোনো দেশই আজ নিরাপদ নয়। নিকোলো মেকিয়াভেলি তার ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে বলেছিলেন, “A wise prince should depend on his own forces” অর্থাৎ, ‘একজন জ্ঞানী শাসককে সর্বদা তার নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।’ ভেনিজুয়েলার ট্র্যাজেডি হলো তারা তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বিশ্ববাজারের এমন এক কাঠামোর সাথে যুক্ত করেছিল যা মূলত তাদের শত্রুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ভবিষ্যতে দেশগুলোকে তাদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বলা যায়, ভেনিজুয়েলার এই তথাকথিত শাসন পরিবর্তন কেবল একটি দেশের ট্র্যাজেডি নয়, এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর পরিহাস। যেখানে মানবাধিকারের নামে মানবাধিকার হরণ করা হয়, আর স্বাধীনতার নামে লুণ্ঠন চালানো হয়।
তবে অন্ধকার যেমন দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তেমনি একাধিপত্যের যুগও শেষ হতে চলেছে। বিশ্বের সাধারণ মানুষ আজ অনেক বেশি সচেতন। তারা বুঝতে শিখছে যে, গণতন্ত্র কোনো আমদানিকৃত পণ্য নয়, বরং এটি একটি জাতির নিজস্ব সংগ্রাম ও চেতনার ফসল। ভেনিজুয়েলার মাটি থেকে হয়তো একদিন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন এক গণজাগরণ তৈরি হবে যা সাম্রাজ্যবাদের এই তাসের ঘরকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক।



