যেদিন তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ৮:৫৯:০৭ অপরাহ্ন
শাহ মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম :
১৯৮৬ সাল। দিন তারিখ মনে নেই। তখন হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল। বেগম খালেদা জিয়া সিলেট সফরে এসেছিলেন। সাথে ছিলেন মরহুম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, উবায়দুর রহমান, এম সাইফুর রহমান প্রমুখ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সিলেটে তখন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মরহুম খন্দকার আব্দুল মালেক। তার বাসার কাছেই সিলেটের তখনকার সবচেয়ে অভিজাত হোটেল হিল টাউনের দ্বিতীয় তলায় তারা উঠেছিলেন।
আমি তখন জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজিরবাজার মাদরাসায় পড়ি। আলিয়া চাহারমে (ডিগ্রি) ক্লাসে। মাদরাসার ছাত্র সংসদ ‘আল ইসলাহ’র মাধ্যমে আমরা ছিলাম যুগসচেতন ও সরব। আমি ছিলাম ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক। দেয়ালপত্রিকা ‘কাফেলা’র সম্পাদক। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা কওমি মাদরাসার জনপ্রিয় (অধুনালুপ্ত) ছাত্র সংগঠন ‘মুসলিম ছাত্র পরিষদের’ সাংগঠনিক সম্পাদক। মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। লন্ডন প্রবাসী মাওলানা আব্দুর রব ছিলেন সভাপতি। হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ হাফিজ্জী হুজুরের তাওবার রাজনীতি কওমি অঙ্গনকে রাজনীতি-সচেতন করে তুলেছে। আমাদেরকেও দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে। অদম্য উৎসাহ আমাদের।
সহপাঠী (বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী) হাফিজ ছালেহ আহমদের সাথে পরামর্শ করলাম বেগম খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার নেব। জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার থেকে তখন প্রকাশিত হতো জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা ‘আনোয়ারে মদীনা’। সম্পাদনা করতেন প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান (রহ.)। তাঁর সহোদর হাফিজ মাওলানা আতিকুর রহমান ছিলেন সহসম্পাদক। তাঁকে আমাদের পরিকল্পনার কথা বললাম। তিনি উৎসাহিত করলেন। যেই কথা সেই কাজ।
তখন মোবাইল ফোনের যুগ আসেনি। মাদরাসার দফতর থেকে টেলিফোনে হোটেল হিল টাউনে যোগাযোগ করে উবায়দুর রহমান সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম। সম্ভবত তিনি তখন বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। আমরা সময় চাইলাম সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। তিনি সময় দিলেন।
আমরা সময়মতোই হাজির হলাম। সাধারণ পোশাকে পায়ে বাটার সেন্ডেল পরিহিত। কম বয়সের দুই তরুণ। উনারা দেখেই হয়তো বুঝতে পারলেন আমাদের অবস্থান। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে এখনো অবাক করে, তখনকার নেতৃত্বের উদারতা, ভদ্রতা, আর সৌজন্যবোধ। তারা আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। যেখনটায় বেগম জিয়া বসেছিলেন। আমাদের সাথে স্বাভাবিকভাবে আলোচনা করলেন। আমরা মাদরাসার পরিচয় দিলাম। এম সাইফুর রহমান সাহেব বেগম জিয়াকে মনে করিয়ে দিলেন যে, এই মাদরাসার জায়গাটি আমাদের শাসনামলে (শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে) মাদরাসার জন্য নামমাত্র (এক টাকা) মূল্যে দেয়া হয়েছে। শেষমেশ আমরা সাক্ষাৎকারের কথা বললাম। মরহুম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বললেন, আপনারা প্রশ্নমালা লিখে দিয়ে যান। উত্তর আমরা পাঠিয়ে দেবো।
এত বছর পরে এখন এই ঘটনার কথা মনে পড়লে হাসি পায়। কী সাংবাদিক! গেছে বেগম জিয়ার সাক্ষাৎকার নিতে!
আমাদেরকে যে কক্ষে নেওয়া হলো, সেখানে গিয়ে আমরা অভিভূত হয়েছিলাম। দেখলাম সিংহাসনের মতো একটা বেতের চেয়ারে সম্রাজ্ঞির মতো বেগম খালেদা জিয়া বসে আছেন। আমাদের দেখে মুচকি হেসে বসতে বললেন। আশপাশের সবাই তাকে সমীহ করছেন। খুব কম কথা বলছেন। তার কথাবার্তা ও আচরণে অভিজাত্য দৃশ্যমান। চেহারায় প্রখর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ছাপ। এতে আমাদের মনেও তাঁর প্রতি গভীর সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠেছিলো।
তাঁর ইন্তেকালের খবর শোনার পর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর মতো দেশপ্রেমিক সর্বজন শ্রদ্ধেয় দেশনেত্রী আর আসনে না। তাঁর মৃত্যুতে পুরো জাতি আজ শোকে কাতর। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন। আমিন।
লেখক : গবেষক ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা। উপ-পরিচালক, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি, ঢাকা।



