শিশু ফাহিমা হত্যা
হয় মাদক বেছে নিন, নয়তো আপনার সন্তানের নিরাপত্তা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ মে ২০২৬, ৭:০৩:২৭ অপরাহ্ন
নূর আহমদ :
সিলেটের সদর উপজেলার কান্দিগাও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারের নিথর দেহ যখন পুকুর পাড়ে পড়ে থাকে, তখন সেটি কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং আমাদের ঘুণে ধরা সমাজের কদর্য রূপটিকেই উন্মোচিত করে। ফাহিমা হত্যার প্রধান আসামি হিসেবে যখন প্রতিবেশী জাকির নামের যুবক গ্রেপ্তার হয়, তখন জনমনে ক্ষোভের দাবানল জ্বলে ওঠে। কিন্তু এই ক্ষোভের আড়ালে একটি রূঢ় সত্য কি আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি না?
আমরা ফাহিমা হত্যার বিচার চাইছি, ঘাতকের ফাঁসি চাইছি- এটা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি। কিন্তু একই সাথে আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আমরা কি সেই সমাজ নই, যেখানে আমাদেরই চোখের সামনে মাদক কারবারিরা বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়? আমরা কি সেই প্রতিবেশী নই, যারা জানি, এলাকার কোন বাড়িতে ইয়াবার আসর বসে, কারা এই মরণনেশার ডিলার, অথচ ‘ঝামেলা এড়াতে’ কিংবা ‘ব্যক্তিগত খাতিরে’ তাদের দেখেও না দেখার ভান করি! কিংবা ‘আমার গ্রুপ করে’ বলে কথিত রাজনৈতিক অভিভাবক সেজে মাদক বিক্রেতাকে প্রশ্রয় দেই না?
আমাদের সমাজের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা একদিকে ইয়াবাসেবী আর মাদক বিক্রেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব, তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক ছত্রছায়া দেব, আবার অন্যদিকে নিজের সন্তানের জন্য নিরাপদ সমাজও দাবি করব। এই দুই মেরুর অবস্থান কখনো একসাথে সম্ভব নয়।
আপনি যখন একজন মাদকাসক্ত বা মাদক কারবারিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তখন আপনি আসলে নিজ হাতে একজন ‘জাকির’ তৈরি করছেন, যে নেশার টাকার জন্য কিংবা বিকৃত মানসিকতা থেকে ফাহিমাদের মতো শিশুদের জীবন কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না।
ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদকের প্রভাব স্পষ্ট, এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, মাদক বিস্তারের ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা ও পৈশাচিকতা চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। যখন একটি এলাকায় ইয়াবা বা অন্যান্য নেশাদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে যায়, তখন সেখানে মানবিক মূল্যবোধ বলতে কিছু থাকে না। আর এই মাদক বিস্তারের জন্য আমাদের নীরবতা এবং উদাসীনতাই সবচেয়ে বেশি দায়ী।
আজ ফাহিমার জন্য আমরা মিছিলে স্লোগান দিচ্ছি, রাজপথ কাঁপাচ্ছি- এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু মিছিল শেষে যখন আমরা আবার সেই মাদক কারবারি বা মাদকাসক্ত বড় ভাইয়ের সাথে চা আড্ডায় বসি, কিংবা তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পাই, তখন ফাহিমার আত্মা আমাদের উপহাস করে। আপনার আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া মাদক ব্যবসায়ীটি আজ অন্যের সন্তানের জান কবজ করছে, কাল যে সে আপনার ঘরের দরজায় কড়া নাড়বে না- এর নিশ্চয়তা কে দেবে?
এবার একটু দেখা যাক পুলিশের কী ভূমিকা ছিল। এলাকাবাসীর অভিযোগ, জালালাবাদ থানার পার্শ্ববর্তী পুরো এলাকা আজ মাদকের বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন। ইয়াবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মরণনেশা এখন পাড়ার অলিতে-গলিতে সহজলভ্য। জালালাবাদ থানা থেকে সোনাতলা গ্রামের দূরত্ব মাত্র ১ কিলোমিটার হবে। এই দূরত্বের মধ্যে যখন মাদক কারবার চলে এবং সেই মাদকের অন্ধকার ছায়ায় একটি নিস্পাপ শিশু প্রাণ হারায়, তখন পুলিশ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। প্রশ্ন উঠেছে, থানার এত কাছে কী ঘটছে, কারা মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, সে তথ্য কি পুলিশের কাছে ছিল না? যদি থেকে থাকে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
ফাহিমা মারা যাওয়ার পর এখন পুলিশ তৎপর হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রাণটা যাওয়ার আগেই কি এই তৎপরতা দেখানো সম্ভব ছিল না? মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানাগুলো যদি আগেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হতো, তবে হয়তো আজ ফাহিমার বাবাকে মেয়ের জানাজা পড়তে হতো না।
জালালাবাদ থানা কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে, কেবল একজন ঘাতককে গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ফাহিমা হত্যার মূল উৎস অর্থাৎ মাদকের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। সচেতন মহল বিশ্বাস করে, থানার পাশে মাদকের আড্ডা আর ফাহিমাদের রক্ত এই দুই চিত্র একসাথে চলতে পারে না। প্রশাসনকে এখনই কঠোর হতে হবে, অন্যথায় এই বিষবাষ্প একদিন পুরো সমাজকেই গ্রাস করবে।
আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, মাদক বিক্রেতা বা বখাটে যুবকরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার ‘ছোট ভাই’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ভোটের রাজনীতি বা এলাকায় দাপট ধরে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নেতারা জেনে-বুঝেও এই মাদকাসক্তদের প্রশ্রয় দেন। মনে রাখতে হবে, মাদককারবারীরা যখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে, তখন তারা আইনকে তোয়াক্কা করে না। যদি স্থানীয় রাজনীতিকরা শুরু থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হতেন, তবে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
থানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে যখন মাদক আর অপরাধের স্বর্গরাজ্য গড়ে ওঠে, তখন স্থানীয় নেতাদের উচিত ছিল প্রশাসনকে বারবার তাগাদা দেওয়া। আমি মনে করি ফাহিমার মত্যু তার এলাকার রাজনীতিকদের জন্য এখন বড় পরীক্ষা। ফাহিমার মৃত্যুও পর ইয়াবা সেবনকারী বা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে পাহাড়ের মতো অটল থাকবেন, নাকি সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যাবেন ভোটের রাজনীতিতে।
পরিশেষে এটা চাই, ফাহিমা হত্যার বিচার হোক, ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কিন্তু তার পাশাপাশি মাদক মুক্ত সমাজ গড়ার শপথ নিতে হবে আজই। ইয়াবা বিক্রেতা আর সেবনকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। একজন সজেতন অভিভাবক বা তরুণ হিসেবে হয় মাদককে বেছে নিন, না হয় আপনার সন্তানের নিরাপত্তা। দুই নৌকায় পা দিয়ে আর যাই হোক, ফাহিমাদের রক্তঋণ শোধ করা সম্ভব নয়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।



