আসুন, শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭:০৩ অপরাহ্ন
মো. বদরুল আলম :
ঋতু পরিক্রমায় শীতের আগমন ঘটেছে। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে ঘন কুয়াশা। দেশের অনেক অঞ্চলে দেখাও মেলেনি সূর্যের। দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে কনকনে শীত। উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের কাছে শীতের দিন মানে উৎসবের সময়। কিন্তু নিম্নবিত্ত এবং সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য এই শীত নিয়ে আসে এক ভয়াবহ দুর্ভোগ। গৃহহীন মানুষ, পথশিশুদের কষ্টের কোনো শেষ থাকে না শীতকালে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য চেষ্টা করা। তাহলে হয়তো এই শীতার্ত মানুষগুলোর কষ্ট কিছুটা কমে আসবে।
সড়কের পাশে, বাস ও ট্রেন স্টেশনে, বাজার ও রাস্তা ঘাটে রাতের বেলা অনেক অসহায় মানুষকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আমরা যখন লেপ-কম্বল গায়ে জড়িয়ে দীর্ঘ রাত সুখ নিদ্রায় বিভোর তখন তাদের রাত কাটে নির্ঘুম অবস্থায় শীতের প্রকোপে জবুথবু হয়ে। যার পেটে ভাত নেই তার গায়ে গরম কাপড় জুটবে কোত্থেকে! আমরা কি পারি না তাদের সাহায্যে একটু এগিয়ে আসতে।
সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব। অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমেই রচিত হবে মানবিক সেতুবন্ধন। আমাদের সামান্য সহযোগিতা তাদের জীবনে এনে দিতে পারে এক টুকরো সুখ।
কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপা মানুষের গায়ে শীতবস্ত্র জড়িয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ব ও ভালোবাসার। আমরা চাইলেই এ সকল দুঃখী মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি। এর জন্য কি অঢেল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়া প্রয়োজন।
মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরাও করতে পারেন অনেক কিছু। এ সকল অসহায়দের প্রতি তাদেরও রয়েছে কিছু নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের উপার্জিত অর্থের সামান্য পরিমাণও যদি এ সকল অসহায়দের জন্য আমরা বরাদ্দ করি তাহলে বিন্দু বিন্দু সে দান শীতার্তদের কষ্ট লাঘবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবছর শীত এলে অভাবীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা উচ্চারিত হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু ব্যতিক্রম যেটা হয়েছে, সেটা সাধারণভাবে চোখে পড়ার মতো নয়। ব্যতিক্রমটি হলো, প্রতিবছর সমাজের সামর্থ্যবান জনদরদি মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সংগঠন, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কম্বল, শীতবস্ত্র, খাবার ইত্যাদি গ্রামে গ্রামে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন।
তরুণ যুবকেরা মহল্লায় মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরোনো কাপড় সংগ্রহ করেন এবং তা গরিবদের মধ্যে বণ্টন করেন। শীত এলে এসব ছিল চিরচেনা সামাজিক কর্মকাণ্ড। এবার সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু আমাদের সাধারণ বিচার-বিবেচনায় সামান্য সমাজ অধ্যয়নে যেটি মনে হয়, সেটি হলো জাতি, রাষ্ট্র, সমাজ এসব ধারণার সঙ্গে মানুষের একাত্মতার বোধ শিথিল হয়ে পড়েছে। তাই শীতে কষ্ট পাওয়া মানুষের কষ্ট লাঘবে আগের মতো সবার এগিয়ে না আসার পেছনে এটি একটি কারণ বলে আমাদের ধারণা। তবু বসে থাকলে চলবে না, দরিদ্র, অভাবী ও বস্ত্রহীন শীতার্ত মানুষকে সাধ্যানুযায়ী সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে।
মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা বা পরের উপকার করার ব্যাপারে ইসলাম খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে একটু আলোকপাত করি। পরোপকার মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)।
এ বিষয়ে বিশ্বনবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা জগতবাসীর প্রতি সদয় হও, তাহলে আসমানের অধিপতি আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি সদয় হবেন।’ (তিরমিজি: ১৮৪৭)। পরোপকার মানুষকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করে।
পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব মনীষী স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন পরহিতৈষী। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম ওহিপ্রাপ্তির পর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে হজরত খাদিজা (রা.) -কে বললেন, ‘আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও, আমি আমার জীবনের আশঙ্কা করছি।’ তখন খাদিজা (রা.) নবীজি (সা.)-কে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ কখনোই আপনার অমঙ্গল করবেন না। কারণ, আপনি আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করেন, গরিব-দুঃখীর জন্য কাজ করেন, অসহায়-এতিমের ভার বহন করেন, তাদের কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।’ (বুখারি : ৪৫৭)।
পরোপকারে নিজেরও কল্যাণ সাধিত হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘অবশ্যই দান-সদকা মানুষের হায়াত বৃদ্ধি করে। অপমৃত্যু রোধ করে এবং অহমিকা দূর করে।’ (আল-মুজামুল কাবীর: ১৩৫০৮)।
সমাজে যারা বিত্তবান ব্যক্তি, তারা চাইলেই ছিন্নমূল মানুষের এই হাড় কাঁপানো শীতের সময় একটু সাহায্য করতে পারেন। ছিন্নমূল মানুষগুলো শুধু শীতের সময়ই কষ্ট পায় না, গরমের দাবদাহ ও বর্ষাকালে বন্যায় বা জলোচ্ছ্বাসেও ভুগতে হয় তাদের। দেশের নিম্নাঞ্চলের মানুষগুলো বর্ষাকালে আশ্রয়স্থল ও খাবার সংকটে পড়ে যায়। যদি আমরা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি একটু মানবতা দেখাই এবং পাশে দাঁড়াই তা হলে আমরা তাদের অশান্তি একটু হলেও দূর করতে পারব, পাশাপাশি তাদের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হব।
এই কনকনে শীতে ফুটপাথ, রেলস্টেশন ও বস্তিতে বসবাস করা মানুষগুলো শান্তিতে নেই। আমাদের সবার উচিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, বিভিন্ন এনজিওসহ আমরা সবাই এগিয়ে এলে শীতার্তরা উপকৃত হবে। শীতার্তদের কষ্ট লাঘব হবে।
আশা করি এই তীব্র শীত কেটে যাবে। কোনো দ্বিধা নেই আলোর দেখা মিলবে, সূর্য উঠবেই। কবি আনিসুল হক এর কবিতায় পড়েছিলাম, তবুও সূর্য ওঠে, ঘাসে ঘাসে ঢেউটিনে শিশিরফোঁটায়/ কোটি কোটি সূর্য ফোটে কিষানির অশ্রুজলে শিউলিবোঁটায়/ নতুন অরুণ জাগে, ওই যে পুরনো তাকে বলছি বিদায়/ কুয়াশা কাটছে ওই, দিগন্তে দেখো চেয়ে, থেকো না দ্বিধায়।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট।



