এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণকাণ্ড, গণধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার বিচার শেষের পথে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ১১:২২:১২ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণ ঘটনার দুই মামলার বিচার কার্যক্রম শেষের দিকে। সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্পেশাল জজ স্বপন কুমার সরকারের আদালতে গণধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার যুক্তিতর্ক আজ উপস্থাপন হবে। যুক্তিতর্ক শেষের পরপরই নির্ধারণ হবে রায়ের দিন ।
সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন সিলেটের ডাককে বলেন, গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার দুই মামলার যুক্তিতর্ক আজ রোববার উপস্থাপনের দিন ধার্য রয়েছে। যুক্তিতর্কের পর মামলার রায়ের দিন ধার্য করবেন আদালত। এটি একটি আলোচিত মামলা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আমি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য বলবো।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্পেশাল জজ স্বপন কুমার সরকারের আদালতে আজ রোববার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলার আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা নিজ নিজ পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন। একদিনে যদি উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা সম্ভব না হয় তাহলে একাধিক দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে। এই মামলা দুটোর আর্গুমেন্ট শুনতে সাধারণ আইনজীবীদের মাঝেও বেশ আগ্রহ রয়েছে। আর্গুমেন্টের আগের ধার্য তারিখে আসামি পরীক্ষা করা হয়। আর্গুমেন্টের পর মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করবেন আদালত।
যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন :
জানা গেছে, গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ ও তার স্বামী, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেট, ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারসহ সর্বমোট ২৪ জন সাক্ষী আদালতে তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের পর আসামিদের আইনজীবী তাদের জেরাও করেছেন। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা হলেন, ভিকটিম গৃহবধূ , মামলার বাদী মাইদুল ইসলাম, ম্যাজিস্ট্রেট যথাক্রমে শারমিন খানম লিনা, সাইফুর রহমান ও জিয়াদুর রহমান, ডা. সালমা আক্তার, পুলিশ পরিদর্শক ইন্দ্রনিল ভট্টাচার্য রাজন, অধ্যাপক তৌফিক ইয়াজদানী চৌধুরী, হƒদয় পারভেজ, আলী হায়দার, রুহেল আহমদ, খলিল মিয়া, আলাল মিয়া, রিয়াজ উদ্দিন, আব্দুল হালিম, ছায়াদ উদ্দিন, ইকবাল হোসাইন, পরিতোষ পাল, জয়নুল জাকেরীন, গোলাম সরোয়ার অপু, হেনা আক্তার, দেলোয়ার হোসেন, লিমন দত্ত ও মেহেরুল ইসলাম।
এক বছর বিচারকার্যহীন থাকার পরে :
সূত্র জানায়, প্রায় এক বছর ধরে মামলা দুটোর বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকার পরে অবশেষে গতি ফিরে আসে। দুটো মামলার নথিপত্র সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই পড়ে ছিল। প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য কালো থাবার মুখে আটকে যায় বিচার কার্যক্রম। ওই সময়ে আসামিদেরকেও আদালতে আনা হয়নি। চলতি বছরের ১৭ মার্চ সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এমসি কলেজে গৃহবধূ গণধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার বিচার কার্যক্রম সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করার আদেশ দেন।
এর আগে ২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ গণধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মামলা দুটো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের চূড়ান্ত আদেশ দেন। ওই আদেশে ৩০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে গেজেট জারি করতেও বলা হলে শুধুমাত্র তৎকালীন এ্যাটর্নী জেনারেল অফিসের কারণে হাইকোর্টের ওই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
৮ ধর্ষকের পরিচয় :
গণধর্ষণের ঘটনায় সম্পৃক্ত ৮ আসামী হলেন- সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার পুত্র সাইফুর রহমান (২৮), হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গির মিয়ার পুত্র শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের পুত্র তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের পুত্র অর্জুন লস্কর (২৬), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের পুত্র রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির (গাছবাড়ী) সালিক আহমদের পুত্র মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার (বাসা নং-৭৬) মৃত সোনা মিয়ার পুত্র আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের পুত্র মিজবাউল ইসলাম রাজন (২৭)
অকপটে ধর্ষকদের স্বীকারোক্তি :
গণধর্ষণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ধর্ষকদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত আট ধর্ষকের সকলেই ছাত্রলীগের টিলাগড় গ্রুপের গডফাদার রনজিত সরকারের অনুসারী। গ্রেফতারের পর ৮ আসামির সকলেই অকপটে একেবারে সহজ-সরলভাবে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আসামিদের মধ্যে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, মিজবাহুল ইসলাম রাজন ও আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ১৯ বছর বয়সী ওই নববধূকে সরাসরি গণধর্ষণ করে। রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম ধর্ষণে সহযোগিতা করে।
সেই ভয়ংকর সন্ধ্যা :
সেদিন ছিল শুক্রবার। ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরের ২৪ বছর বয়সী এক যুবক তার ১৯ বছর বয়সী নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে প্রাইভেটকারযোগে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান। এর আগে শাহপরান (রহ.) মাজারও ঘুরে আসেন তারা। সন্ধ্যার পরে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে তারা থামেন। ওইসময় কয়েক যুবক ওই স্বামী ও তার স্ত্রীকে ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে প্রাইভেটকারসহ তাদেরকে জোরপূর্বক জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। এরপর স্বামীকে আটকে রেখে ছাত্রাবাসের ৭নং ব্লকের ৫ম তলা বিল্ডিং এর সামনে প্রাইভেটকারের মধ্যেই গৃহবধূকে জোরপূর্বক গণধর্ষণ করে। তারা দম্পতির সাথে থাকা টাকা, স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আটকে রাখে তাদের প্রাইভেট কারও। ছাত্রাবাস থেকে টিলাগড় পয়েন্টে এসে যুবকটি পুলিশে ফোন দেন। পুলিশ আসতে বেশ সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ পেয়ে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ নির্যাতিতাকে ওসমানী হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করে। ওই রাতেই নির্যাতিতার স্বামী মাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৩-৪ জনকে আসামী করে শাহপরান থানায় মামলা করেন। দেশের অন্যতম পুরনো বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে সরকার ধর্ষণের সাজার আইনের পরিবর্তন করে মৃত্যুদন্ডের ঘোষণা দেয়। ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান করে জাতীয় সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল ২০২০ পাশ হয়। এ ঘটনায় এমসি কলেজের ছাত্র সাইফুর রহমান, মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল হাসানকে কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে।




