অবশেষে স্থগিত শাকসু, উত্তাল শাবি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৫:২০ অপরাহ্ন
লবীব আহমদ ও মাঈন উদ্দিন : নানা নাটকীয়তা শেষে অবশেষে হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত হয়ে গেল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় উত্তাল হয়ে উঠেছে শাবিপ্রবি। মহাসড়ক অবরোধ করে দিনভর আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, ১৩ ঘণ্টা পর সোমবার দিবাগত রাত ১টায় ভিসি, প্রো-ভিসি, কোষাধ্যক্ষ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পান। একই সময়ে শিক্ষার্থীরা আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনস্থল ত্যাগ করে। অপরদিকে হাইকোর্টে রিটকারী শুভকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে শিক্ষার্থীরা । সবকিছু ঠিক থাকলে আজ মঙ্গলবার দীর্ঘ ২৮ বছর পরে শাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। ১৯৯৭ সালের পর আজ মঙ্গলবার দীর্ঘ ২৮ বছর পরে শাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, নানা জটিলতা আর বাধা পেরুতে না পেরে সেটা আলোর মুখ দেখে নি। ভোটগ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই স্থগিত হয়ে যায় শাকসু নির্বাচন। এতে করে অপেক্ষার প্রহর বাড়লো শিক্ষার্থীদের।
প্রশাসনিক ভবনে তালা, ভিসি- প্রো ভিসি অবরুদ্ধ :
সোমবার সকালে শাকসু নির্বাচন বন্ধে দায়ের করা রিটের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। এতে করে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি। রাত ১টায় তারা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পান।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালন না করার ঘোষণা বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের:
দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে ক্যাম্পাসে আন্দোলন চলাকালে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকবৃন্দ। তাদের কথামতো বিএনপিপন্থী ৮ জন নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগপত্র জমা দেন। তারা বলেন, নির্বাচন নিয়ে নানা ইস্যু তৈরি হয়েছে। আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত ও বিব্রত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় অবগত করেছি। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে বিএনপিপন্থী ৮ জন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। আমরা যারা জাতীয়তাবাদী আদর্শের আছি সবাই মিলে প্রশাসনকে জানিয়েছি; আমরা এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবো না।
নির্বাচন চান জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা:
এদিকে, বেলা দেড়টার দিকে ক্যাম্পাসে জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সাস্ট চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়, মঙ্গলবার দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শাকসু নির্বাচন। আমরা ইউটিএলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে আহবান করছি এই নির্বাচন করার জন্য। আমরা প্রত্যাশা করছি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে এ নির্বাচন করবে। আমরা ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব ইনশাআল্লাহ। কয়েকজন শিক্ষক অসহযোগিতার কথা বলেছেন। আমরা বলতে চাই, অধিকাংশ শিক্ষক এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে।
হাইকোর্টে নির্বাচন স্থগিত:
চার সপ্তাহের জন্য শাকসু নির্বাচন স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এর আগে রোববার শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভসহ তিন শিক্ষার্থী। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদী করা হয়েছে। রিটে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সব ধরনের নির্বাচন বন্ধ রাখার নির্দেশনা জারি করেছে। এ অবস্থায় শাকসু নির্বাচন হতে দেওয়া আইনসংগত নয়।বিষয়টি নিশ্চিত করেন শাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. আবুল মুকিত মোহাম্মদ মোকাদ্দেছ বলেন, হাইকোর্ট স্থগিত করলে তো আমাদের আর কিছু করার নেই, নির্বাচন হবে না।
মহাসড়ক অবরোধ :
হাইকোর্ট কর্তৃক শাকসু স্থগিত করার প্রতিবাদে বেলা ২ টার দিকে শাবি শিক্ষার্থীরা আন্দোলন নিয়ে প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। ৩ ঘণ্টার বেশি সময় মহাসড়ক অবরোধ করে রাখার পর শিক্ষার্থীরা আবার মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে চলে আসেন। মহাসড়ক অবরোধকালে সড়কের উভয়পাশে তীব্র যানজট তৈরি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন এই সড়ক ব্যবহারকারী সিলেট ও সুনামগঞ্জের মানুষজন। অনেকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হন। মহাসড়ক অবরোধ ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন ফটকের সামনে গেলে শিক্ষার্থীরা দালাল ও ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন। বিকাল ৫টায় মহাসড়ক অবরোধ ছাড়ার সময় শিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হাসান শিশির বলেন, রিটের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু, সেই রায়ের শুনানি হয়নি। আমাদের আন্দোলন চলবে।
হাইকোর্টে রিটকারী শুভকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা:
শাকসু নির্বাচন বন্ধের জন্য রিটকারী স্বতন্ত্র ভিপিপ্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার ছবিতে থুতু নিক্ষেপ ও জুতা পেটা করেন শিক্ষার্থীরা।
নগরীতে শিবিরের মিছিল ও জামায়াতের নিন্দা: এদিকে, শাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ঢাকা ও সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রশিবির। সোমবার বিকেল ৩ টায় সিলেট নগরীর কোর্ট পয়েন্ট থেকে একটি মিছিল বের করে চৌহাট্টায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।
অন্যদিকে শাকসু নির্বাচন স্থগিতের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত। সোমবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর জামায়াতের প্রচার বিভাগ থেকে প্রেরিত এক বিবৃতিতে নির্বাচন স্থগিতের এই নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
ছাত্রশিবিরের চারদিনের কর্মসূচি ঘোষণা:
শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে দেশজুড়ে চারদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির। গতকাল সোমবার রাতে ছাত্রশিবিরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে ও অনতিবিলম্বে শাকসু বাস্তবায়নের দাবিতে দেশব্যাপী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা। ঘোষিত কর্মসূচিসমূহ-
২০ জানুয়ারি- দেশের সব ক্যাম্পাসসমূহে মানববন্ধন ও মহানগর পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল; ২১ জানুয়ারি- সব জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল; ২২ জানুয়ারি- সব উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং ২৩ জানুয়ারি- ঢাকা মহানগরে বিক্ষোভ মিছিল।
ওয়াচডগের জরিপ:
এদিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে শাকসু নির্বাচনের জরিপ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘সোচ্চার-টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ’। তাদের জরিপ অনুয়ায়ী শীর্ষ তিন পদে শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা এগিয়ে। সার্বিক বিষয়ে শাকসু নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের সকল প্রস্তুতি ছিল। হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পরে আর সেটা লঙ্ঘন করার সুযোগ নেই। আমাদের কার্যক্রম আপাতত স্থগিত আছে। সর্বশেষ সন্ধ্যা সোয়া ৭ টার দিকে শাকসু নির্বাচনের প্রার্থীদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেন শাবি ভিসি, প্রো-ভিসি। পরে সেখানেও কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়াতে তারা প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যান। স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী ফয়সাল হোসেন রাত সোয়া ১২ টায় সিলেটের ডাককে বলেন, ‘এখনো আমরা ভিসি, প্রো-ভিসিকে অবরুদ্ধ করে রাখছি। আমাদের কর্মসূচি চলমান আছে। ৯ টার পরে নতুন করে আর সিদ্ধান্ত নেইনি। উনারা বলছেন আগামীকাল হাইকোর্টে আপিল করবেন। পরে সিদ্ধান্ত আসলে নির্বাচন হবে। ’
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে শাবির সিন্ডিকেট সদস্য ও সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জহির বিন আলম সোমবার রাতে জানান, ‘কালকে উনারা আবার রিট করবে। রিট করার পরে যদি কালকে রায় পেয়ে যায়, তাহলে পরেরদিন আবার নির্বাচন হয়ে যাবে। কেইস করেই এটাকে সমাধান করতে হবে। এখন কোর্ট দিয়েই এটাকে সমাধান করতে হবে। আমরা চিল্লালেও কাজ হবে না। আমরা সিন্ডিকেট সভা থেকে ৪/৫ জন বড় উকিলের সাথে কথা বলেছি। তারা বলছে কোর্টের যেটা নিয়ম, ওইটার কাউন্টার ব্যালেন্স দিতে হবে। ওইটা কালকে আমরা আবার তুলবো। যদি ওইটা ওখানে রায় হয়, সেজন্য আমরা আমাদের নির্বাচন কমিশনকে একটিভ রাখছি। কালকে রায় পেলে পরশুদিন শাকসু নির্বাচন হবে ইনশাআল্লাহ। নির্বাচনের জন্য সবাই প্রস্তুত। যদি রায় না পাওয়া যায়, তাহলে আবার উকিলদের সাথে কথা বলবো। শাকসু না হওয়ার কারণ নাই। কারণ নির্বাচন কমিশন তো একটা কাগজে সই করে দিছে যে আমরা নিতে পারবো। কাল যদি রায় আসে, তাহলে পরশু নির্বাচন। পরশু আসলে এর পরদিন নির্বাচন।




