গ্রন্থালোচনা
‘দ্বিতীয় জীবনের গল্প’ : মানবিকতার আরেক ম্যাগনাকার্টা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৯:২২ অপরাহ্ন
সেলিম আউয়াল :
আমাদের একজন সাংবাদিক, সেই সুনামগঞ্জের দিরাই অঞ্চলে যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা- সেই হাওর রাজ্যে সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি। তিনি আমাদের একজন মোনাজাত উদ্দিন হয়ে হাওর-জলের দেশ পাড়ি দিয়ে বিভাগীয় শহর সিলেটে এসে সূচনা করেন সাংবাদিকতার নতুন অধ্যায়।
‘সিলেটের ডাক’ নামের দৈনিকের পাতায় নিজের জ্ঞান-মেধা-দক্ষতাকে পুঁজি করে আবেগ মিশিয়ে লেখেন সংবাদ। আলোড়ন তৈরি করা অনেকগুলো রিপোর্ট বেরোলো তার হাত দিয়ে। কম সময়েই নিজের একটি পরিচিতি গড়ে উঠলো সিলেটের সাংবাদিকতার জগতে। সেই মানুষটি হঠাৎ একদিন জানলেন- তার কিডনি, লিভার দুটোরই বিনাশ হয়ে গেছে; তিনি মৃত্যু দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে অন্ধকার, অবধারিত মৃত্যু জেনেও মানুষ তো, সেই রবীন্দ্রনাথের কথায়-‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’- ফেইসবুকে লিখলেন করুণ ভাষায় নিজের দুর্দশার কথা।
ফেইসবুকের সেই লেখা পড়ে তার পুরনো সতীর্থরা জমলেন, উদ্যোগ নিলেন, চিকিৎসার বিশাল ব্যয় ভার মেটানোর জন্যে অর্ধ কোটিরও বেশি টাকা সংগ্রহ করলেন। বিলাতে ছিলো সেটা এক বিশাল কার্যক্রম। বিলাতের সকল দলমতের সাংবাদিকরা সবাই মিলিত হলেন। ইংল্যান্ডের ব্যস্ত জীবনে যেখানে তারা সময় হিসেব করেন পাই পাই করে, সেই জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষেরা প্রচুর সময় ব্যয় করলেন কাউসার চৌধুরীর চিকিৎসার তহবিল গঠনের জন্যে। কাউসার চৌধুরীর সুচিকিৎসা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়- সেই বিষয় নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করে তার জন্যে সভা করেন। নানান জায়গার, নানান চিন্তা মতের মানুষেরা দাঁড়ান একই প্লাটফর্মে। বিলাতের সবগুলো পত্রিকা তার রোগ-চিকিৎসা নিয়ে লেখলো, চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে আসার আহবান জানালো। ইংল্যান্ডের বাংলাদেশি কম্যুনিটির টিভিগুলো নিজেদের টিভিতে আয়োজন করে ফান্ড রাইজিং প্রোগ্রাম।
বাংলাদেশেও কাউসার চৌধুরীর সতীর্থরা তহবিল গঠনের জন্যে নানাজনের কাছে ছুটে গেলেন, নিজেরাও সামর্থ মতো সহযোগিতা করলেন। একটি তহবিল গঠনের পর কাউসার চৌধুরী চিকিৎসার জন্যে ভারত গেলেন। কিডনি আর লিভার পরিবর্তনের জন্যে ডোনার পেলেন, ডোনারদের সাথে তার শারিরীক নানামুখী পরীক্ষা পর নিশ্চিত হলেন ডোনারদের কিডনি ও লিভার তার শরীরে স্থাপন করা যাবে।
তারপর এগুলোর জন্যে আইনগত ব্যবস্থা, এইসব নানামুখী ঝামেলা শেষে কাউসার চৌধুরীর শরীরে ডোনারের কিডনি আর লিভার প্রতিস্থাপন করা হলো। একই সাথে কিডনি আর লিভার প্রতিস্থাপনের বিষয়টি বিরল এবং সেই বিরল ঘটনা ঘটলো কাউসার চৌধুরীর জীবনে। একটি নতুন জীবন পেলেন তিনি। সেই নতুন জীবন ফিরে পাওয়া এবং নতুন জীবন ফিরে পেতে একঝাঁক মানুষের সম্মিলিত মানবিক তৎপরতার কথা নিয়ে কাউসার চৌধুরী বড়ো ক্যানভাসে লিখলেন তার ‘দ্বিতীয় জীবনের গল্প’ নামের আত্মস্মৃতিকথা- রোগ ধরা পড়ার পর ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন।
এই বইয়ের মুল সুর মানবিক বোধ, ভূপেন হাজারিকার সেই গানের কলি- ‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ, দানব কখনো হয় না মানুষ…।’ বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে মনে হয়েছে কাউসার চৌধুরীর ‘দ্বিতীয় জীবনের গল্প: মানবিকতার আরেক ম্যাগনাকার্টা’।
কাউসার চৌধুরীর সাথে যাঁদের রক্তের সম্পর্ক, যাদের জন্যে কাউসার চৌধুরীর অনেক ত্যাগের কাহিনি আছে- বিপদের সেই দিনগুলোতে কাউসার চৌধুরীর জন্যে তারা বাড়ালেন না তাদের সহযোগিতার হাত।

কাউসার চৌধুরী লিখেছেন- ‘লন্ডনে যখন মহিব ভাইয়েরা আমার চিকিৎসার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বসলেন, ঠিক তখন পর্যন্ত আমার নিজের কোনো প্রবাসী আত্মীয় আমার খোঁজখবরই নেননি। অথচ অসুস্থ হওয়ার আগেও বেশ কয়েকজন লন্ডনপ্রবাসী আত্মীয়ের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।’
কাউসার চৌধুরী সেদিন তাদেরকে কাছে পেয়েছিলেন, যাদের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু সম্পর্ক কাজের, সম্পর্ক মানবিকতার, সম্পর্ক সতীর্থের।
কাউসার লিখেছেন- ‘শুনেছি, এক মহিলা আমার চিকিৎসা-সহায়তা তহবিলে অর্থ দেবেন। কিন্তু তার কাছে পর্যাপ্ত পরিমানে অর্থ নেই। তিনি তাঁর গহনা বিক্রি করেন। গহনা বিক্রির অর্থ পাঠিয়ে দেন আমার চিকিৎসা-সহায়তা তহবিলে। কে সেই মাতৃসম মহিলা আমি জানি না, কেউ যদি তার সাাক্ষাৎ পান জানিয়ে দেবেন আমার সালাম। শুনেছি, আমার এই ফান্ড রেইজিংয়ে এমনি ঘটনা আরো ঘটেছে।’ এইসব ঘটনার জন্যেই পৃথিবী আজো সুন্দর।
কাউসার চৌধুরী তার এই বইয়ের মাধ্যমে মুলত পৃথিবীর সৌন্দর্যই ফুটিয়ে তুলেছেন।
একজন সম্ভাবনাময় অসুস্থ সাংবাদিকের খোঁজ নেবার জন্যে কাউসার চৌধুরীর ভাড়া করা টিনশেডের ছোট্ট ঘরে ছুটে গেলেন মন্ত্রী পদ মর্যাদার সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, মেয়র বদর উদ্দিন কামরান, ধনাঢ্য দানবীর রাগীব আলী আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা। দানবীর রাগীব আলী তার জন্যে বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস-এর ব্যবস্থা করে দিলেন।
কাউসার চৌধুরীর এই আত্মস্মৃতিকথার মাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থারও একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে দেখা যাচ্ছে কাউসার চৌধুরী একজন চিকিৎসককে কটাক্ষ করেছেন, আবার মানবিক চিকিৎসক ডা. নাজমুস সাকিবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘তিনি (ডা. সাকিব) মনোযোগ দিয়ে ধৈর্য সহকারে আমার কথাগুলো শুনলেন। পরে তিনিও কিছু পরামর্শ দিলেন। তাঁর সাথে কথা বলে মানসিকভাবে শক্তি পেলাম, পেলাম শান্তির ছোঁয়া। তিনি প্রেসক্রিপসন করলেন।’
২০১৪ সালের ১৩ জুলাই কাউসার চৌধুরী চিকিৎসার জন্যে ভারত গেলেন। তার সাথে তার স্ত্রী এবং সহকর্মী মুহাম্মদ তাজ উদ্দিন। তাজ উদ্দিন ভালো ইংরেজি জানেন, অত্যন্ত মেধাবী। তার মুল পেশা আইন ব্যবসা এবং সেই ব্যবসার প্রসারও আছে। কিন্তু তিনি সেই সব ফেলে দু দফায় কাউসারের সাথে প্রায় দুই মাস ভারত কাটালেন। এতো ত্যাগী মানুষ পাওয়া কাউসার চৌধুরীর সৌভাগ্য। তিনি সৌভাগ্যবান এজন্যে তার অসুস্থতার খবর পেয়ে সেই সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ভালোবাসার স্মারক হিসেবে আম-আপেল ফলমুল বোঝাই ফলের কার্টুন আসে কুরিয়ারে তার বাসায়।
সেই কবিতার কথা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে- ‘ব্যথিত বেদন, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশি বিষে দংশেনি যারে।’ কাউসার চৌধুরীর চেয়ে কে বেশি অনুভব করবে কিডনি হারানো, লিভার হারানোর বেদনা। এজন্যে বইয়ে তিনি ‘জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসুন’ শীর্ষক পরি্েচ্ছদে কিডনি প্রতিস্থাপন বিষয়ে তার জানা তথ্য পরিবেশন করেছেন। ‘যেভাবে লিভার সুস্থ রাখবেন’ শীর্ষক আরেকটি পরিচ্ছেদে লিভার ভালো রাখার ব্যাপারে তথ্য পরিবেশন করেছেন। একইভাবে ‘কিডনি সুস্থ রাখতে হলে…’ শীর্ষ পরিচ্ছদে কিডনি ভালো রাখার কথা বলেছেন।
কাউসার চৌধুরীর দ্বিতীয় জীবনের গল্প পড়লে কখনো মনে হয় পত্রিকার রিপোর্ট, কখনো মনে হয় ভ্রমণকাহিনি, কখনো মনে হয় মানবতার জয়গানে গাঁথা কাব্যমালা। পুরো বই জুড়ে অসংখ্য মানুষের নাম, কাউসার চৌধুরী এই নাম উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতার ফুল ফুটিয়েছেন, জয়গান করেছেন মানবতার- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ কাউসার চৌধুরীর চাচা ওহাবুর রহমান চৌধুরী (ময়না মিয়া)-র মৃত্যু সংবাদ তিনি পেলেন। মন ভীষণ খারাপ, চলে আসলেন ভারতে তার ভাড়া বাসায়। তিনি লিখেছেন, ‘বাসার মালিক রামজিৎ শর্মা আমার মানসিক অবস্থা খারাপ দেখে পাশে বসে কারণ জানতে চাইলেন। চাচার মৃত্যুর খবর বলার পর তিনিও ব্যথিত হন। ওই পুরোদিন তিনি আমার পাশেই কাটিয়েছেন। ছিলেন রাত দশটার পরেও।’ শর্মা সমবেদনাসূচক কিছু কথা কাউসারকে বললেই চলতো, তার ব্যবসার কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু তিনি পুরো দিনটি কাটিয়ে দিলেন একজন ব্যথিত মানুষের জন্যে-এটাই মানবিকতা।
কাউসার চৌধুরী আশার পাশাপাশি মৃত্যু ভাবনায়ও ছিলেন পীড়িত। এরপরও পৃথিবীর স¦াদ শেষবারের মতো নিতে চেয়েছেন, এখানেই ফুটে উঠেছে মানুষের বৈশিষ্ট্য। তিনি ছুটে গেছেন দিল্লি জামে মসজিদে, ইন্ডিয়া গেইটে, তাজমহলে, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে, কুতুব মিনারে। সুন্দরের প্রতি মানুষের চিরন্তন বোধের কারণে আমরা দেখি কাউসার লিখছেন,‘‘সকালে চা-নাশতা খেয়ে বসে আছি, এমন সময় হঠাৎ চোখে পড়ল ময়ূর। এভাবে জনারণ্যে ময়ূর দেখে আমি তো অবাক। এটা কি সত্যি ময়ূর! তাজ ভাইকে ডেকে আনলাম। আমার মোবাইলে ময়ূরের কয়েকটি ছবি তুললাম। সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ময়ূরের দুটি ছবিসহ পোস্ট দিলাম। শিরোনাম দিলাম ‘আহারে ময়ূর’।[…] আরেকদিন বিকেলবেলা। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে। বৃষ্টি কেবল থেমেছে। হঠাৎ ময়ুরের ডাক। আমার স্ত্রী বললেন চেয়ে দেখো। দেখি ময়ূর তার মনের আনন্দে পেখম মেলেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি বাসার ছাদে ময়ূরের পেখম দেখে আমি তো বিস্মিত। এরকম দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগবে।’
ভারতের উত্তর প্রদেশের নয়ডার এলাকায় বিশেষায়িত জেপি হাসপাতালে কাউসার চৌধুরীর চিকিৎসা হচ্ছিলো। একদিন কুয়েতি আমির সাবাহ আল আহমেদ আল জাবের আল সাবাহ সেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। কাউসার লিখেছেন, ‘একাধিক রোগের চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা কুয়েতি আমিরের সঙ্গে আছেন তাঁর ৮ জন স্ত্রী আর পরিবারের ২৮ সদস্য। কুয়েতি শাসক নয়ডার জেপি রিসোর্টে অবস্থান করছেন এবং তাঁর চিকিৎসা চলছে জেপি হাসপাতালে। সেখানে ২০ জন চিকিৎসকের একটি টিম আমির ও তাঁর পরিবারের স্বাস্থ্য সেবায় ব্যস্ত রয়েছে। এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, রিসোর্ট থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার পথ আমির ও তাঁর পরিবার হেলিকপ্টারে আসা-যাওয়া করেন। এছাড়া হাসপাতালের তিনটি স্যুইটের ইন্টেরিয়র ডিজাইন কুয়েতি আমির সেখানে পৌঁছার ১৫ দিন আগেই পালটে সেগুলো শানদার করা হয়েছে।’
কাউসার চৌধুরী প্রায় ২৩ ঘন্টা ছিলেন অপারেশন থিয়েটারে। অত্যন্ত জটিল একটি অপারেশন হয়, একসাথে একজন মানুষের লিভার ও কিডনি বদল! অপারেশনকালে পুরো তিনদিন তিনি ছিলেন অচেতন। পোস্ট অপারেটিভ রুমে ছিলেন নার্স আর চিকিৎসকেরা। তার জ্ঞান ফেরার পরই তিনি তার স্ত্রীকে খোঁজলেন। তারপর নার্সের হাতের ফোন দিয়ে কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু ফোন হাতে নেবার মতো তার অবস্থা নেই। কাউসার চৌধুরীর মনের শাক্তি আমাদেরকে বিস্মিত করে।
কাউসার লিখেছেন-‘এবার আমার হাতে না নিয়ে আমার স্ত্রী সায়েরা বেগমের মোবাইলের ইন্ডিয়ার নম্বর বলতে লাগলাম। টানা তিনদিন অচেতন থাকার পর চেতনা ফেরার সাথে সাথেই একটি মোবাইল নম্বর বলে দেওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তবুও বলতে লাগলাম প্লাস নাইন ওয়ান নাইন সেভেন..। লক্ষ্য করলাম, রুমের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি কিন্তু নম্বর বলে যাচ্ছি। একজন রোগী টানা তিনদিন পরে চেতনা ফিরে এভাবে মোবাইল নম্বর বলে দেবে, হয়তো নার্স-ডাক্তারদের এমন ধারনা ছিল না। কিন্তু আমি নম্বর বলছি।’ তারপর তিনি কথা বললেন স্ত্রীর সাথে। নাম্বারটা অপরিচিত ছিলো স্ত্রীর। অপরিচিত ভারতীয় নাম্বার তাদের মনে প্রথমে অজানা আশংকা তৈরি করলে সেটা পরে পরিণত হয় আনন্দ সংবাদে।
বিদেশ বিভূইঁয়েও কাউসার চৌধুরী প্রত্যাশা করেছেন দেশি খাবার। শাহপুর নামে যে এলাকায় তারা বাস করতেন, সেখানে বাজারে মাছ মাংসের সন্ধান না পেয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে কাছাকাছি ‘বাঙ্গেল’ নামে একটি বাজার খোঁজে পেলেন, দুই কিলোমিটার দূরে। সেখানে ছুটে গেছেন, এটাও তাদের শেকড়ের প্রতি এক ধরনের টান। শেকড়ের এই টানেই দেশি ভাই ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, যিনি সাহিত্যিক, বহু ভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলীর পুত্র ছুটে এসেছেন হাসপাতালে ‘সিলটি এক অসুস্থ সাংবাদিক ফুয়ারে’ দেখার জন্যে। সাথে ছিলেন হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার এপি’র ফরিদ হোসেন। পুরো তিনটে ঘন্টা তিনি হাসপাতালে কাটিয়েছিলেন। এটি একটি বিরল এবং ভালোবাসাপূর্ণ ঘটনা।
কাউসার চৌধুরী বইটিতে প্রশংসা করেছেন সতীর্থ সাংবাদিকদের, প্রশংসা করেছেন দানশীল-মানবিক মানুষের, প্রশংসা করেছেন চিকিৎসকদের, প্রশংসা করেছেন নার্সদের, প্রশংসা করেছেন সহধর্মিণী সায়রা বেগমের। এইভাবে কৃতজ্ঞতার ফুলে গাঁথা মালা তৈরি করেছেন কাউসার, ফুলঝুরি হয়ে ঝরিয়েছে কৃতজ্ঞতার ফুল।
কাউসার চৌধুরীর তেইশ ঘন্টার অপারেশন, তিন দিন তিন রাত জ্ঞানহীন থাকা, টাকার চিন্তা, মৃত্যুভাবনা-শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে। তারপরও দেখা যায় বই লিখতে বসে তিনি সেই ইব্রাহিম খলিল থেকে শুরু করে কে কিভাবে সহযোগিতা করেছেন, কে কখন তাকে দেখতে এসেছিলেন, এমনি কি সেই ছোট্ট আত্মীয় মারুফ আহমদ চৌধুরী রেজার নামটিও তিনি বইয়ে উল্লেখ করেছেন। ভারতে টাকা খরচ করে চিকিৎসা গ্রহণ করলেও নার্স-চিকিৎসকদের প্রশংসায় তিনি ছিলেন পঞ্চমুখ।
কাউসার চৌধুরীর বই আমাদেরকে আরো মানবিক হতে উৎসাহিত করে। পৃথিবীর নৃশংসতা দেখে হতাশ না হয়ে আমাদেরকে মানবিক হতে উৎসাহ যোগায়। তার বই আমাদেরকে শেখায় পৃথিবীকে ভালোবাসতে, পৃথিবীর মানুষকে ভালোবাসতে। কারণ আমাদের প্রার্থনাই- হে আল্লাহ আমাদের দুনিয়া সুন্দর করে দাও, আমাদের সেই অনন্তকাল সুন্দর করে দাও। আমার বিশ্বাস বইটি পড়লে আমরা আরো মানবিক হবো, সুন্দর পৃথিবী রচনার জন্যে আমরা প্রয়াস চালিয়ে যাব নিরন্তর।
কাউসার চৌধুরীর ‘দ্বিতীয় জীবনের গল্প’ বইটি প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের এম জে এম পাবলিশার্স -এর চেয়ারম্যান মহিব চৌধুরী। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। ২১৬ পৃষ্ঠার বইটির মলাটমূল্য চারশো টাকা। বইটির পরিবেশক ঢাকার উৎস প্রকাশন।



