সিলেটে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ মার্চ ২০২৬, ৬:৫৭:৪৬ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী
সিলেট বিভাগে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার পাশাপাশি ধর্ষণকান্ড বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। গেল পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে নারী নির্যাতনের এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের গেল দুই মাসেই ১৬৭ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫ নারী শুধু ধর্ষণের শিকার হন।
গেল বছর ১ হাজার ৪৭৬ জন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৫৪ জন নারী। ৯২২ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এর আগের বছর নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ১ হাজার ৩৩০ জন নারী। এর মধ্যে ৪৮৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। বাকী ৮৪৫ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এভাবে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ বৃদ্ধির ঘটনার বিষয়টি সচেতন লোকজনদের ভাবিয়ে তুলেছে।
তাদের মতে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ,ব্যাপকভাবে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেটের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৪ নারী। এর আগে বছর শুরুর মাস জানুয়ারিতে ৩৫ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন এবং ৫৮ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এরও আগে গেল ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ৩৪ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৫৩ নারী। ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৪৫ নারী। ওই মাসেই ৫১ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মার্চ মাসে ৪১ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৭০ জন নারী। এপ্রিল মাসে ৫২ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ওই মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৯১ নারী। মে মাসে ৪৯ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং একই মাসে ৮১ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জুন মাসে ধর্ষন ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৫০ নারী। ওই মাসে ১০৯ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। জুলাই মাসে ৬২ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন ৭৫ নারী। আগস্ট মাসে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৫০ নারী আর ৬৬ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। সেপ্টেম্বর মাসে ৪৬ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। একই মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯৫ জন। অক্টোবর মাসে ৪৬ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ওই মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৯৬ জন নারী। নভেম্বর মাসে ৩৯ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। আর ৭৬ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ডিসেম্বর মাসে ৩৩ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং ৫৯ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে ওসিসি সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৫১৩ নারী নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৬০০ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ৯১৩ জন। ২০২২ সালে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা ১ হাজার ২২১ জন। এর মধ্যে ৬২১ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৬০০ নারী। ২০২১ সালে ৯১৩ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৬০৯ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ওই বছর ৩০৪ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
সিলেটের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) কো-অর্ডিনেটর ডা. মোস্তফা আল্লামা তালুকদার (পিয়াল) এবিষয়ে সিলেটের ডাককে বলেন, ওসিসি নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। কেবল চিকিৎসাই নয়, চিকিৎসার পাশাপাশি যথাযথ আইনী সহযোগিতাও করা হয়। ঘটনার শিকার নারীর মামলার এজাহার লিখে দেয়া আবার ওই এজাহার থানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্যে ওসিসির আইন কর্মকর্তা রয়েছেন। পরবর্তীতে আদালতে আইনী পদক্ষেপ ভিকটিম নিজে বা সরকারি কৌসুলিগণও সহযোগিতা করেন।
এদিকে, সিলেটে নারী নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা সিলেট মহানগর সাধারণ সম্পাদক আনাস হাবিব কলিন্স উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন। দ্রুত সময়ের মধ্যে ন্যায় বিচারও নিশ্চিত করা দরকার। ওসিসিকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ওসিসি’র ল্যাবকে শক্তিশালী করা গেলে ডিএনএ টেস্ট আরো সহজ হবে। এতে ভুক্তভোগীদের আইনী সহায়তা পাওয়া আরও সহজ হবে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) সিলেটের সাবেক কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ করতে হলে সমাজে ব্যাপক হারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হতে হবে আরও তৎপর ও কঠোর। বিচার তরান্বিত করা গেলে নারী নির্যাতন কমে আসতে পারে।
সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের দাবি, মহানগর এলাকায় আগের চেয়ে নারী নির্যাতনের সংখ্যা কমেছে। তারপরও নারী নির্যাতন রোধ করার লক্ষ্যে আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি।




