নুরুন্নবী সরকারের দুর্নীতি তদন্তে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
নিয়ম বহির্ভূতভাবে শাল্লার ইউএনও-পিআই’র অ্যাকাউন্টে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা!
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৫৬:১৮ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নুরুন্নবী সরকার চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত না হওয়া স্বত্বেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সম্পাদিত কাজ ও উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখিয়েছেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৪ প্রকল্পের সভাপতি ব্যতিত ব্যাংক থেকে পরিপত্র পরিপন্থীভাবে উত্তোলন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পিআইও’র অ্যাকাউন্টে রেখেছেন ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তে পিআইও নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (আইন) ও তদন্ত কমিটির প্রধান মো. আশ্রাফুল হক এ বিষয়ে বলেন , সরেজমিনে তদন্ত করে তথ্য উপাত্তসহ তদন্ত প্রতিবেদন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট জমা দেওয়া হয়েছে। এখন এ বিষয়ে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ে দুদক এর আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট শহিদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, যতটুকু শুনেছি অধিদপ্তরের তদন্তে পিআইও’র ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাতের তথ্য প্রমাণ মিলেছে। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের তফসিলভুক্ত। বিধায় এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদকের সরাসরি মামলা দায়ের করা উচিত।
তদন্তে দুর্নীতির যে সব প্রমাণ উঠে এসেছে-
তদন্ত প্রতিবেদনে পিআইও নুরুন্নবী সরকারের অনিয়মের বিস্তর বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, কোন কোন প্রকল্পের সামান্যতম কাজ হলেও শতভাগ বিল দেয়া হয়েছে। কোন কোন প্রকল্পের কাজ মোটে না হলেও বিল দেয়া হয়েছে শতভাগ। আবার কোন কোন প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হলেও ৫০ ভাগ বিল দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির বিল দেয়া হয়নি। পিআইও’র দাবী অনুযায়ী, ৫০ ভাগ টাকা না দেয়ায় দ্বিতীয় কিস্তির বিল দেয়া হয়নি। সকল প্রকল্প থেকে পিআইও অফিস খরচ বাবত ১০ থেকে ১৫ পার্সেন্ট টাকা নিয়েছে। আবার কোন কোন প্রকল্পের কাজের উপর ভিত্তি করে ৪০ থেকে ৫০ পার্সেন্ট টাকা নেয়া হয়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণ, প্রকল্প সভাপতিগণ, সাংবাদিকবৃন্দের দেয়া বক্তব্যে পিআইও’র দুর্নীতির এসব চিত্র উঠে এসেছে।
পিআইও নুরুন্নবী সরকার লিখিত ও মৌখিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, মোট ১৪ টি (কাবিটা ও টিআর) প্রকল্পের দ্বিতীয় কিস্তির ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ছাড় করেননি। অথচ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রকল্পের সম্পাদিত কাজ ও উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানো হয়েছে।
দশ পৃষ্টার ওই তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অর্থবছর পেরিয়ে গেলেও পরিপত্র পরিপন্থীভাবে পিআইও ১৪টি প্রকল্পের ২য় কিস্তির অর্থ ছাড় করেননি। অথচ গেল অর্থ বছর শেষে গেল ২০ জুলাই ইউএনও ও পিআইও’র যৌথ স্বাক্ষরে বার্ষিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সকল প্রকল্পের সম্পাদিত কাজ ও উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানো হয়। নিয়মানুযায়ী প্রকল্প সমূহের কাজ যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে অর্থ বছর শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সম্পাদিত কাজ ও অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানোর কোন সুযোগ নেই। কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রকল্পের সম্পাদিত কাজ ও উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানো হয়েছে।
তাছাড়া প্রকল্পের টাকা উত্তোলন পূর্বক প্রকল্প সভাপতিদের দ্বিতীয় কিস্তির অর্ধেক টাকা আটকে রেখেছেন ; যেখানে পরিপত্র মোতাবেক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতি ব্যতিত অন্যকারো প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের কোন সুযোগই নেই। অথচ ১৪ প্রকল্পের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা ইউএনও এবং পিআইও’র অ্যাকাউন্টে। এই ১৪ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৩৩ লাখ ত্রিশ হাজার টাকা। প্রকল্পের সভাপতিরা প্রথম কিস্তিতে অর্ধেক টাকা পেলেও প্রকল্পের সভাপতি ব্যতিত দ্বিতীয় কিস্তির টাকাগুলো কর্মকর্তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে-যা সম্পূর্ণ নীতিমালার পরিপন্থী।
অভিযোগ যেসব প্রকল্পের ব্যাপারে :
তদন্ত প্রতিবেদনে পিআইও’র বিরুদ্ধে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান – সদস্যদের নানান অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। আটগাও ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ড সদস্য ও প্রকল্প সভাপতি নুরুল হক বলেন,তিনি দৌলতপুর ইবনে সিনা হাসপাতাল হতে শ্যামারচর মাদ্রাসা পর্যন্ত রাস্তা পুন:নির্মাণ প্রকল্পের সভাপতি। এতে বরাদ্দ ৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রথম কিস্তিতে দেড় লাখ টাকা দেয়া হয় ; তবে এই টাকা থেকে অফিস খরচ বাবত কেটে রাখা হয়েছে ১৫ পার্সেন্ট। আট টাকা হারে ত্রিশ হাজার ঘনফুট মাটির কাজে দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির বিল নেয়ার জন্যে অফিসে গেলে পিআইও দ্বিতীয় কিস্তির বিলের জন্য ৫০ পার্সেন্ট অর্থাৎ ৭৫ হাজার টাকা দিলে বিল দিবেন। দ্বিতীয় কিস্তির বিল এখনো দেয়া হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছুটি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত …
কোনো ধরনের অনুমোদিত ছুটি ছাড়াই গত এক সপ্তাহ ধরে পিআইও নুরুন্নবী সরকার তার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। ইতোপূর্বে তিনি দুদকের ডাকে সাড়া দেননি।
বৃহস্পতিবার ও আগের দিন বুধবার পিআইও অফিসে গিয়ে তার দেখা মেলেনি।
সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. হাসিবুল হাসান এ বিষয়ে বলেন,পিআইও দু’দিনের ছুটি নিয়েছেন। তার তো চলে আসার কথা। পিআইও’র দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন অধিদপ্তরে দেয়া হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

পিআইও যা বলেন–
পিআইও নুরুন্নবী সরকারের নিকট তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগ, দুর্নীতির তথ্য প্রমাণের বিষয় জানতে চেয়ে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেন। শুরুতে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও এক পর্যায়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন।
শাল্লার ইউএনও’র বক্তব্য …..
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস এ বিষয়ে বলেন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যে আলাদা আলাদা এ্যাকাউন্ট রয়েছে। পিআইও বলল যে, কাজ করতে পারেনি ; তাই এই অর্থ রাখা হয়েছে। আমার এর বাইরে আর কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। ইউএনও বলেন, বিষয়টি অলরেডি তদন্ত হয়ে গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আশ্রাফুল হক সরেজমিনে তদন্ত করে গেল ১০ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এর আগে গত ১২ আগস্ট শাল্লার পিআইও নুরুন্নবী সরকারের দুর্নীতি-অনিয়ম তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট লিখিত অভিযোগ করেন।
প্রসঙ্গত, গত ৩০ আগস্ট শনিবার দৈনিক সিলেটের ডাক-এ “শাল্লার পিআইও নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।




