সিলেটে নির্মাণ শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে কারা?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ মে ২০২৬, ২:২২:১২ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
সিলেটে নির্মাণ শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে কারা-এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। সড়ক পরিবহন আইনে ডিআই পিকআপে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ থাকলেও সিলেটে যেন এর কোন প্রয়োগ নেই। নগরীতে প্রতিদিনই সকালবেলা দেখা যায়, ডিআই পিকআপ নির্মাণ সামগ্রীর পাশাপাশি নিরীহ নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়ে দেদারছে ছুটে চলেছে। রোববার ভোরে সিলেটে যে ৯ জন নিরীহ শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে- পিকআপের ওপর যাত্রী পরিবহনের কারণেই। ২০২৩ সালের ৭ জুন সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের নাজিরবাজারে ১৫ নির্মাণ শ্রমিকের প্রাণহানির পর পিকআপে যাত্রী পরিবহন নিয়ে সর্বত্র তোড়জোড় শুরু হলেও এখন এটা থেমে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এ ধরণের যানবাহনের চালকরা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৪৯(১)(ঝ) ধারায় উল্লেখ আছে-‘মোটরযানের বডির সামনে, পিছনে, উভয় পার্শ্বে, বডির বাহিরে বা ছাদে কোন প্রকার যাত্রী বা ছাদে কোন প্রকার যাত্রী বা পণ্য বা মালামাল বহন করা যাইবে না।’ কিন্তু, মামলা-জরিমানা করেও এ ধরণের যানবাহনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) ডেপুটি কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় পিকআপ ভ্যানে কিংবা ট্রাকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। রোববারের দুর্ঘটনার পর থেকে এ বিষয়ে অভিযান শুরু করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, রাস্তায় যাতে যাত্রী নিয়ে এ ধরণের যানবাহন চলাচল করতে না পারে-সে বিষয়ে এসএমপি’র ট্র্রাফিক বিভাগ দায়িত্ব পালন করবে। এ ধরণের পিকআপ যাত্রী নিয়ে যাতে নগরীতে চলাচল করতে না পারে-সে ব্যাপারে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিওনের পুলিশ সুপার মো: রেজাউল করিম সিলেটের ডাককে জানান, এ নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় সচেতনতা কর্মসূচি পালন করা হয়। কিন্তু, বাস্তবতা কেউ মানতে চায় না। এমনিতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের অবস্থা খারাপ। তার ওপর ফিটনেটবিহীন গাড়ি চলাচল ও যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই-আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার। এ ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির তাগিদ তার।
সিলেট নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের(টি আই) দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খরচ বাচানোর জন্য ডিআই পিকআপের চালকরা মিক্সার মেশিন ও নিরীহ শ্রমিকদের এক সাথে গাড়িতে তুলে। এর সাথে ঠিকাদার, বিল্ডিংয়ের মালিকপক্ষের যোগসাজস রয়েছে। তারা খরচ বাাঁচানোর জন্য মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। বিধান আছে, ডিআই পিকআপে বালু-পাথর পরিবহন করা হলেও তা যেন ত্রিপলি(সিলেটী ভাষায় তেরপাল) দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। যাতে বাতাসের ফলে এগুলো কারো গায়ে গিয়ে না লাগে। কিন্তু, সিলেটে কোন চালকই এসবের তোয়াক্কা করে না। উপরন্তু, তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে গেলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। সার্জেন্টরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে গেলে তারা আরো মারমুখী হয়ে উঠে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তারা আন্দোলনে নামে।
এই টি আই আরো বলেন, সিলেট নগরীর আম্বরখানা, কালীঘাট, চাঁদনীঘাট, সিলেট সরকারি কলেজ, তামাবিল রোড, মেন্দিবাগ সব্জিবাজারে তাদের অস্থায়ী স্ট্যান্ড রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযান চালিয়েও তাদেরকে উচ্ছেদ করা যায়নি। সিলেটে কৃত্রিম যানজট সৃষ্টির পেছনে দায়ী এসব পিকআপ। বিআরটিএও এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কোন অভিযানে যায় না বলে এ কর্মকর্তার অভিযোগ।
সিলেট ঢালাই সমিতির সেক্রেটারি মো: রেনু ভুইয়া জানান, ২০২৩ সালের দুর্ঘটনার পর তারা সংশ্লিষ্টদের একই গাড়িতে মিক্সার মেশিন ও মানুষ না তোলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিছুদিন মানার পর কেউ আর সেটি মানছে না। যে কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, রোববার যে ঠিকাদার শ্রমিক ও মিক্সার মেশিন নিয়ে যাচ্ছিল-এটা তাদের সংগঠনের কেউ না।
দক্ষিণ সুরমা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার টিটপ শিকদার স্থানীয় লোকজনের সাথে আলোচনার বরাত দিয়ে জানান, খাগড়াছড়ি থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা কাঁঠালভর্তি ট্রাকটি মূলত হেলপার চালাচ্ছিল। তার ঝিমুনিভাবের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তারা ধারণা করছেন। খবর পেয়ে তাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। দুর্ঘটনার পর ট্রাক চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজারে রোববার সকালে ট্রাক ও ডিআই পিকআপ সংঘর্ষে ৯ নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পিকআপটি আম্বরখানা বড় বাজার থেকে দয়ামীরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। পথে এটি দুঘটনায় পতিত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরো কয়েকজন শ্রমিক।



