পর্যটকের ঢল লাউয়াছড়ায়
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫:১০:৫৪ অপরাহ্ন
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা : লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে মাধবপুর লেক, চা-বাগানের সবুজ পাহাড় থেকে দুর্গামণ্ডপ- দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ। বিজয়া দশমীতেও প্রকৃতির টানে ছুটে আসা মানুষের ভিড়ে জমে উঠেছে চায়ের রাজধানী ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো।
দুর্গাপূজার টানা দীর্ঘ ছুটিতে প্রকৃতির টানে পর্যটকদের ঢল নেমেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে। পাহাড়ঘেরা বন, সবুজ চা-বাগান, লেক, জলপ্রপাত আর দুর্গাপূজার বর্ণিল আয়োজন- সব মিলিয়ে উৎসবের এই সময়ে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে এ দুই উপজেলা। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক ও বিভিন্ন চা-বাগানে গত পাঁচ দিনে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। আজ বিজয়া দশমীতেও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ও আশপাশে ছিল মানুষের ভিড়, পাশাপাশি বেড়েছে যানবাহনের চাপ।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। চারপাশে বিস্তৃত চা-বাগান, ঘন সবুজ বনাঞ্চল, উঁচু-নিচু পাহাড় আর নানা প্রজাতির গাছপালা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল- সব মিলিয়ে উদ্যানটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। নগরজীবনের কোলাহল থেকে দূরে কিছুটা সময় কাটাতে এবং বনের নৈসর্গিক পরিবেশ উপভোগ করতে ছুটির দিনগুলোতে এখানে ভিড় করছেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা।
লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে চলে গেছে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগের সড়ক। একই সঙ্গে উদ্যানের ভেতর দিয়ে বিস্তৃত ঢাকা-সিলেট রেলপথ। ফলে বনের সবুজ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে সড়ক ও রেলপথে চলাচলের দৃশ্যও পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। বিজয়া দশমীর দিনেও উদ্যানের প্রবেশপথ ও ভেতরের সড়কে প্রচুর যানবাহন এবং পর্যটকদের উপস্থিতি চোখে পড়েছে।
শুধু লাউয়াছড়া নয়, প্রকৃতির আরেক অনন্য আকর্ষণ কমলগঞ্জের মাধবপুর চা-বাগানের মাধবপুর লেকেও ছিল পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। পাহাড় ও চা-বাগানের সবুজে ঘেরা এই লেক দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। দুর্গাপূজার ছুটিতে গত পাঁচ দিনে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে লেকের চারপাশ। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি মুঠোফোনে ছবি তুলে স্মরণীয় করে রাখছেন ছুটির মুহূর্তগুলো।
কমলগঞ্জের অন্যান্য পর্যটন এলাকাও ছিল সরগরম। শমশেরনগর চা-বাগানের বিমানবন্দর এলাকা, গলফ ক্লাব, ক্যামেলিয়া লেক, হামহাম জলপ্রপাত এবং ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন চা-বাগানগুলোতে পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে। পাহাড়, বন ও চা-বাগানের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে এসব স্থানে ছুটে যাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানগুলোও পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ভূড়ভুড়িয়া চা-বাগানের শংকরটিলা, ফুলছড়া চা-বাগানের লালটিলা এবং হোসেনাবাদ চা-বাগানের পথ ধরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন অনেকে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে কালিঘাট সড়ক হয়ে কুশিয়ানাবাদ চা-বাগানসংলগ্ন ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত পথের দুই পাশে সবুজ চা-বাগান, উঁচু পাহাড় ও গাছপালার সমারোহ পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। প্রতিদিনই এসব পথে শত শত পর্যটকের আসা-যাওয়া লক্ষ্য করা গেছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো। শ্রীমঙ্গলে এ বছর ১৭৩টি দুর্গামণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। শহরের শাপলাবাগ, পূর্বাশা, রূপসপুর, সবুজবাগ, লালবাগ, মাস্টারপাড়া, রামকৃষ্ণ মিশন, শ্রীমঙ্গলেশ্বরী কালীবাড়ি, বারোয়ারি কালীবাড়ি ও সার্বজনীন দুর্গাবাড়িসহ বিভিন্ন মণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও ভিড় দেখা গেছে।
দুর্গাপূজার ছুটিতে অনেকেই পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করছেন। পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক কিংবা আশপাশের চা-বাগান ও পাহাড়ি এলাকায়। আবার কেউ কেউ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি বিভিন্ন পূজামণ্ডপের বর্ণিল সাজসজ্জা দেখতে ছুটে যাচ্ছেন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ধর্মীয় উৎসব ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের এই সম্মিলন শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের ছুটির দিনগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
পর্যটকদের এমন আগমনের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় আবাসন খাতেও। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্টের পাশাপাশি দেশীয় রিসোর্ট, কটেজ ও হোটেলগুলোতে দেখা গেছে ব্যাপক ভিড়। দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের এই সমাগম স্থানীয় পর্যটননির্ভর পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
প্রকৃতি আর উৎসবের এই মিলন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান বিজয়া দশমীর দিনে। শ্রীমঙ্গল শহরে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখতে দুপুর থেকেই রাস্তাঘাট, ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন তলায় জড়ো হতে থাকেন হাজারো মানুষ। নারী-পুরুষ, শিশু, প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও শোভাযাত্রা উপভোগ করতে অপেক্ষা করেন। শহরের বিভিন্ন সড়ক ও ভবনের ছাদে মানুষের উপস্থিতিতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। পর্যটকেরাও এই বর্ণিল আয়োজন দেখতে ভিড়ের সঙ্গে যোগ দেন।
শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগানের বিস্তৃতি, বনাঞ্চল এবং বৈচিত্র্যময় পর্যটনকেন্দ্রের কারণে দেশ-বিদেশে পরিচিত এই জনপদ। দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে মাধবপুর লেক, পাহাড়ি পথ থেকে পূজামণ্ডপ—সবখানেই মানুষের উপস্থিতি আবারও তুলে ধরেছে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পর্যটন আকর্ষণ।
প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য আর উৎসবের বর্ণিল আবহে দুর্গাপূজার এই ছুটি তাই শুধু ভ্রমণের উপলক্ষ নয়; শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন এবং সার্বজনীন উৎসবের এক সম্মিলিত চিত্রও।




