বিদায়বেলায় সিঁদুরের রঙে সম্প্রীতির বন্ধন, শ্রীমঙ্গলে বিজয়া শোভাযাত্রায় হাজারো মানুষের ঢল
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫:৩৩:১৮ অপরাহ্ন
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা : পর্যটননগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। সবুজ চা-বাগান, পাহাড়-টিলা, বনভূমি আর বৈচিত্র্যময় জনপদের এই শহর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের সহাবস্থানেও স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। সেই বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল প্রকাশ দেখা গেল শারদীয় দুর্গোৎসবের বিদায়বেলায়। মা দুর্গার বিসর্জনকে ঘিরে সিঁদুর খেলা, আবেগঘন প্রার্থনা আর হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে শ্রীমঙ্গল শহরে অনুষ্ঠিত হলো বিজয়া শোভাযাত্রা। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ, আর সেই আবহে ফুটে উঠল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানুষের মিলনমেলার চিরচেনা ছবি।
আজ বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়। দুপুর ২টায় মৌলভীবাজার সড়কে অবস্থিত শ্রীশ্রী সার্বজনীন দুর্গাবাড়ীর সামনে থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রায় প্রায় ৬০টি ট্রাকে প্রতিমা বহন করা হয়। এতে অংশ নেন হাজারো মানুষ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি পরিণত হয় ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও সম্মিলিত উৎসবের এক বর্ণিল আয়োজনে।
শ্রীমঙ্গল শহর ছাড়াও আশপাশের গ্রামাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন চা বাগানের পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে আসেন পূজারিরা। দুর্গাবাড়ীর সামনে থেকে যাত্রা শুরু করে শোভাযাত্রাটি চৌমুহনী, কলেজ রোড, গুহ রোড, ভানুগাছ রোড ও স্টেশন রোড প্রদক্ষিণ করে আবার চৌমুহনী হয়ে হবিগঞ্জ সড়কে জগন্নাথদেবের আখড়ার সামনে যায়। পরে প্রতিমাগুলো নিজ নিজ মণ্ডপে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
শোভাযাত্রাকে ঘিরে শহরের সড়কগুলোতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাকের বাদ্য, মানুষের উচ্ছ্বাস আর প্রতিমার বর্ণিল সাজে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তবে আনন্দের এই আয়োজনের মধ্যে ছিল দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগও। কারণ, বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি ঘরের মেয়ের বাপের বাড়িতে আসা, কয়েক দিনের আনন্দ শেষে আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন কাহিনি।
সিঁদুরের রঙে বিদায়ের আবেগ
দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমী। এই দিনেই প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। বিসর্জনের আগে বিভিন্ন মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর একে অপরের সিঁথি ও কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। কারও গালে লেগে থাকে লাল রং, কারও চোখে জল, আবার কারও মুখে বিদায়ের বেদনা আড়াল করার হাসি।
সিঁদুর খেলার এই রীতিতে মিশে আছে বাঙালির পারিবারিক জীবন, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিফলন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সিঁদুর সৌভাগ্য, দাম্পত্যের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির প্রতীক। দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে বিদায় জানানোর সময় নারীরা প্রার্থনা করেন, সংসারে যেন শান্তি বজায় থাকে, ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকে এবং সবার জীবনে আসে কল্যাণ।
দেবীবরণের আনুষ্ঠানিকতায় সিঁদুরের পাশাপাশি পান-সুপারি, ধান-দূর্বা ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়। দেবীর চরণে সিঁদুর অর্পণের পর নারীরা পরস্পরের মধ্যে তা বিনিময় করেন এবং বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান। সময়ের পরিবর্তনে এই আয়োজন অনেক জায়গায় আরও বিস্তৃত হয়েছে। কোথাও অবিবাহিত নারীরাও অংশ নেন, আবার উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে পুরুষদের উপস্থিতিও দেখা যায়।
শ্রীমঙ্গলের দুর্গোৎসবেও এই আবেগের প্রকাশ কেবল পূজামণ্ডপের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিদায়বেলায় পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবটি হয়ে ওঠে বৃহত্তর সামাজিক মিলনমেলা।
চায়ের রাজধানীতে উৎসবের বর্ণিল আয়োজন
শ্রীমঙ্গলের পরিচয় দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, পাহাড়ি প্রকৃতি, বনাঞ্চল ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে উপজেলাটি বিশেষ আকর্ষণের। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। তাঁদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য শ্রীমঙ্গলের স্বতন্ত্র পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে।
এই জনপদে দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর আয়োজন ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সমাজে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে পূজামণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা ও শোভাযাত্রা উপভোগ করতে ভিড় করেন নানা বয়সের মানুষ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত এই শহরে ধর্মীয় উৎসবের এমন আয়োজন স্থানীয় ঐতিহ্য ও পর্যটন আকর্ষণকে নতুন মাত্রা দেয়। চা-বাগানের সবুজের সঙ্গে শহরের উৎসবমুখর পরিবেশ মিলেমিশে শ্রীমঙ্গলকে তুলে ধরে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতীক হিসেবে।
নিরাপত্তার চাদরে শোভাযাত্রা
বিজয়া শোভাযাত্রাকে নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন পূজামণ্ডপের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। নিরাপত্তা তদারকিতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়। শোভাযাত্রার বিভিন্ন অংশে দায়িত্ব পালন করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয় পর্যায় থেকে বিভাগীয় পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান চৌধুরী এবং মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন।
শোভাযাত্রার কারণে সড়কে যান চলাচল যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্যও নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের জন্য বিকল্প পথের ব্যবস্থা করা হয়। শোভাযাত্রা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিকল্প পথে যানবাহন চলাচলে সহযোগিতা করেন। প্রতিমাবাহী ট্রাক ও অংশগ্রহণকারীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করার পর মহাসড়কে আবার স্বাভাবিক যান চলাচল শুরু হয়।
শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার এই আয়োজন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের স্বস্তি বাড়িয়েছে। ধর্মীয় আবেগের এমন বড় আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রশাসন, আয়োজক ও স্থানীয় মানুষের সমন্বিত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রীতির বন্ধনেই শ্রীমঙ্গলের পরিচয়
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো শ্রীমঙ্গলেও দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে এই উৎসবের তাৎপর্য পূজার আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও বিস্তৃত। বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাসের কারণে শ্রীমঙ্গলের সামাজিক জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুভূত হয়।
দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, শোভাযাত্রা দেখতে মানুষের সমাগম এবং উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এই আয়োজন সম্প্রীতির একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও আনন্দ, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রত্যাশা যে সবার এক, শ্রীমঙ্গলের উৎসবমুখর পরিবেশ সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়। শ্রীমঙ্গলের মতো বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় জনপদে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসবকে ঘিরে মানুষের অংশগ্রহণ সেই সামাজিক বন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বিদায়ের বিষাদে ফিরে আসার প্রত্যাশা
বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রা শেষ হয় প্রতিমাগুলো নিজ নিজ মণ্ডপে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতায় সমাপ্তি ঘটে কয়েক দিনের পূজা, প্রার্থনা ও উৎসবের। মণ্ডপের আলো একসময় নিভে আসে, ঢাকের শব্দ থেমে যায়, আর মানুষের মনে থেকে যায় আবারও মা দুর্গার আগমনের অপেক্ষা।
তবু এই বিদায় নিছক বিচ্ছেদের নয়। বাঙালির কাছে বিজয়া মানে একদিকে বিষাদ, অন্যদিকে নতুন করে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা। সিঁদুরের লাল রং, পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা আর আশীর্বাদের আকাঙ্ক্ষা সেই প্রত্যাশাকেই বহন করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগানের ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় জনজীবনের জন্য পরিচিত শ্রীমঙ্গলে দুর্গোৎসবের এই আয়োজন আরও একবার তুলে ধরেছে উৎসবের সামাজিক শক্তিকে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বিজয়া শোভাযাত্রা শুধু প্রতিমা বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সম্প্রীতির বন্ধন উদ্যাপনেরও উপলক্ষ।
মা দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেলেও উৎসবের স্মৃতি থেকে যায় মানুষের মনে। সেই স্মৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকে একটি প্রত্যাশা- ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক বন্ধন সবার। শ্রীমঙ্গলের সবুজ প্রকৃতির মতোই এই সম্প্রীতি অটুট থাকুক, আর বহুত্বের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হোক এই জনপদ, দেশ ও মানুষের আগামী দিন।



