রাজনীতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২০ মে ২০২৬, ১:৪৩:৪৯ অপরাহ্ন
নজরুল ইসলাম বাসন
[পূর্ব প্রকাশের পর] শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, নুরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ.স.ম আব্দুর রব ছিলেন আওয়ামী লীগের চালিকা শক্তি ছাত্রলীগের প্রাণ। এরা প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদের প্রবাসী সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালেই তারা বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা মুজিব বাহিনী নামে একটি এলিট ফোর্স গঠন করেছিলেন। এই বাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ফ্রিডম ফাইটার এর সমান্তরাল বাহিনী ছিলো। সিইনসি কর্ণেল ওসমানীর নেতৃত্বে বাইরে ছিলো এই বাহিনী।
মুক্তিযুদ্ধের পর বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর শেখ মনির সমর্থকদের রক্ষি বাহিনীতে চাকুরি দেয়া হয়। রক্ষি বাহিনী ছিলো ইন্ডিয়ান আর্মির মতো পোষাক, তাদের জীপ ও ট্রাক ছিলো ভারতীয় বাহিনীর মতো। সিরাজুল আলম খান, হাসানুল হক ইনু’র গ্রুপই ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের জন্ম দেন। আহবায়ক কমিটিতে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর এম জলিল এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি আ.স.ম. আব্দুর রব। মুজিব বাহিনীর সমাজতান্ত্রিক বলয়ই ‘জাসদে যোগ দেয়। সারা বাংলাদেশে নব গঠিত ‘জাসদ’ এক আলোড়নের জন্ম দেয়। যুবক ও তরুণদের মাঝে ‘জাসদ’ যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৭২ সালে
ডাকসুতে জাসদ সমর্থক হারলেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কলেজে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সমর্থকরা বিজয়ী হয়েছিলো।
মাহমুদুর রহমান মান্না ছিলেন ‘ডাকসুর ভিপি’। সেখান থেকে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং আ.ফ.ম মাহবুবুল হক কে সভাপতি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয় (১৯৭৩)। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মাহমুদুর রহমান মান্না ২ বার ডাকসু
ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে জাসদ ভেঙ্গে তিনি ‘বাসদ’ গঠন করেছিলেন। এখনও তিনি রাজনীতিতে আছেন। তবে ৭০ ও ৮০ দশকের মাহমুদুর রহমান মান্না এবং এখনকার মান্না ভাই এক নয়। তিনি যেন এখন অস্তায়মান সূর্য। আমরা যারা ৭০ দশকের ছাত্র রাজনীতির
সিলেট থেকে ঢাকা গেলাম ট্রেনে চড়ে। সেই প্রথম ট্রেনে চড়া, ট্রেনের কামরায় তিল ধারণের ঠাই ছিলো না, ছাদের উপরেও যাত্রী ছিলো। বিনা টিকেটে ট্রেন ভ্রমণ সেই প্রথম এবং শেষ।
মুজিববাদী ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়েছিলো ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর
মাঠকর্মী আমাদের দেখা ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের পর জাসদ এবং বিএনপি’র জন্ম আমার চোখের সামনে কাকতালীয়ভাবে ছাত্রলীগ (জাসদ পন্থী) জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (বিএনপি’র সহযোগী সংগঠন) এর সাথে আমার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিলো। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়েছিলো ঢাকার পল্টন ময়দানে। বড় ভাইদের পেছন পেছন
রহমান সেই সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ছাত্রলীগ এই ভাঙন পরবর্তীকালে জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিরাজুল আলম খান ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক, তিনি তার অনুসারীদের কাছে ছিলেন তাত্ত্বিক। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এই ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহযোগী। ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতাদের তিনি একজন, রাজনৈতিক বিশ্বাসের মতদ্বৈততার কারণে সরকারী দল ছেড়ে দিয়েছিলেন। জাসদ গঠনের নেপথ্যে ছিলেন তিনি। কিন্তু এমপি বা মন্ত্রী হবার দৌড়ে তিনি কখনো সামিল হননি। তারই গড়া জাসদের অনেক এমপি এবং মন্ত্রী হয়ে ছিলেন, কিন্তু সিরাজুল আলম খান সে পথ মাড়াননি। তিনি দেশের সাধারণ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাকে নিয়ে ও জাসদ রাজনীতিতে তার ভূমিকা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, গ্রন্থ রচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি এখনো রয়ে গেছেন অন্তরালে।
লন্ডনে তার সাথে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে, তার সাক্ষাৎকার নিতে চেয়ে ছিলাম দেননি। শুনেছি তিনি কাউকে সাক্ষাতকার দেননি, তবে আমি সিরাজুল আলম খান বলছি এবং জাসদ ও অস্থির সময়ের রাজনীতি গ্রন্থে সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতক কর্মতৎপরতার কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সিরাজুল আলম খান আমেরিকার একটি বিশ্ব বিদ্যালয়ের পড়াতেন। আর মওলানা ভাসানীর উপর গবেষণা করেছেন কুইনমেরি ইউনিভার্সিটির (লন্ডন) শিক্ষক ড. লাইলি উদ্দিন তার গবেষণা পত্রের নাম দি রেড মওলানা।
লেখক: অতিথি সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক।।



