বিদায় ওসমান হাদি, এক সাহসী কণ্ঠের প্রস্থান
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:২০:২২ অপরাহ্ন
ডাক ডেস্ক : ঢাকার রাজনীতির কোলাহল, মিছিলের স্লোগান আর টকশোর উত্তপ্ত বিতর্ক- সবখানেই যিনি ছিলেন দৃপ্ত ও নির্ভীক, সেই শরিফ ওসমান হাদি আর নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এই তরুণ কণ্ঠ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে থেমে যায় তার স্পন্দন, থেমে যায় এক সাহসী জীবনের সংগ্রাম (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেমে আসে শোকের ছায়া। সমর্থকদের কাছে তিনি ‘জাতীয় বীর’, প্রতিবাদী রাজনীতির এক প্রতীক। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবাই একমত, ওসমান হাদি ছিলেন সময়ের সাহসী এক চরিত্র। তার মৃত্যুর খবরে শোক জানিয়েছে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল।
ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে এক বার্তায় বলা হয়, ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে আল্লাহ শহিদ হিসেবে কবুল করেছেন।’
এর আগে বুধবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছিল, গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সেই ঘোষণার পর থেকে তাঁর জীবন নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে দোয়া ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধী বক্তব্যের কারণে শরিফ ওসমান হাদি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা হাদিকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে শনাক্ত করে। ওই আসামি ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে আলোচনা রয়েছে।
ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ওসমান হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের উদ্যোগে তাঁকে গত সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়।
ওসমান হাদিকে দিনে-দুপরে গুলি করে হত্যাচেষ্টার এই ঘটনার পরপরই দেশে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঘটনাটিকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নির্বাচনের পথে গুপ্ত হামলা, নাশকতা বাড়তে পারে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক মাস আগেই হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদি।
গত নভেম্বরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাঁকে ফোন ও মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগের ‘খুনি’ সমর্থকেরা তাঁকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে। তবে জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে পিছিয়ে যাবেন না।
ঝালকাঠির নলছিটি থেকে উঠে আসা শরিফ ওসমান হাদিকে শুরুতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যায়নি। মাদ্রাসার শিক্ষক বাবার সন্তান হাদি নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে আলোচনায় আসেন হাদি। ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার দাবিতে শাহবাগে ধারাবাহিক সমাবেশ আয়োজন করেন হাদি। বিভিন্ন টেলিভিশনের টক শোতেও নিয়মিত আমন্ত্রণ পেতে থাকেন। প্রথমে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হলেও পরে আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। দ্রুত তাঁর একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে উঠে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিতেও ছিলেন সরব। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষেও প্রকাশ্যে মত দেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার ঘটনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর হাদি জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যোগ দিলেও পরে নতুন দল এনসিপিতে যোগ দেননি। বরং ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে কয়েক মাস ধরে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ফজরের নামাজের পর মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট চাওয়া, বাতাসা-মুড়ি নিয়ে প্রচার, ভোটারদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ সবই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরতেন।
ওসমান হাদিকে হত্যার এই ঘটনাকে নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘পলাতক শক্তির’ সহিংসতার একটা সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখছে সরকার।
ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে আটক ও গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র্যাব। তাঁদের মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০) ও মা মোসা. হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভিন সামিয়া ও শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু রয়েছেন।
গ্রেফতার বাকি ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন- মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ¦ল, মো. কবির, আব্দুল হান্নান, মো. হিরন, মো. রাজ্জাক, ফয়সালের বান্ধবী মারিয়া আক্তার এবং হালুয়াঘাট সীমান্তে মানব পাচারকারী হিসেবে পরিচিত সিমিরন দিও ও সঞ্জয় চিসিম।
গুলিবিদ্ধ থেকে প্রবাসের আইসিইউ
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ওসমান হাদি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে রাখা হয় তাকে। চিকিৎসকদের ভাষায়, তার অবস্থা ছিল ‘অত্যন্ত সংকটজনক’।
উন্নত চিকিৎসার আশায় সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে নেয়া হয় সিঙ্গাপুরে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল; দীর্ঘ এক যাত্রা, যার শেষটা আর দেশে ফেরা হলো না। তিন দিনের জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে হার মানেন এই তরুণ নেতা।
ঝালকাঠির নলছিটি থেকে ঢাকার রাজপথ
ঝালকাঠির নলছিটিতে জন্ম নেয়া ওসমান হাদির শৈশব কেটেছে এক মাদ্রাসা-শিক্ষক বাবার স্নেহছায়ায়। বাবা মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক। নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবনের শুরু, সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন হাদি। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন, লিখেছেন বই। জীবন সংগ্রামে একসময় প্রাইভেট পড়িয়েছেন, শিক্ষকতা করেছেন কোচিং সেন্টার সাইফুরসে। সবশেষ তিনি ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন।
জুলাই অভ্যুত্থান ও ‘ইনকিলাব মঞ্চ’
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানই ওসমান হাদিকে এনে দেয় জাতীয় পরিচিতি। সাহসী ভূমিকা, ঝাঁঝালো বক্তব্য আর আপসহীন অবস্থানের কারণে অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য, সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
এই মঞ্চ থেকে তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি, জুলাই শহিদদের স্বীকৃতি, অপরাধীদের বিচার এবং ‘জুলাই চার্টার’ ঘোষণার দাবিতে রাজপথ ও সভা-সমাবেশে সরব ছিলেন। টকশো, সামাজিক মাধ্যম, সবখানেই তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, পেয়েছেন হুমকি
স্পষ্টভাষী হাদির বক্তব্য যেমন সমর্থকদের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তোলে, তেমনি তার কিছু মন্তব্য ও ভাষা ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙচুর, গোপালগঞ্জে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলার পর দেয়া বক্তব্য এসব ঘটনায় তার কিছু শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। বরং আরও উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন। গত নভেম্বরেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বাড়িতে আগুন দেয়া, মা-বোন, স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকির কথাও জানান তিনি। লিখেছিলেন, ‘জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ইনসাফের লড়াই থেকে পিছিয়ে যাব না।’
ভোটের মাঠে নামার আগেই থেমে গেল পথচলা
ঢাকা-৮ (মতিঝিল, পল্টন, রমনা ও শাহজাহানপুর) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন হাদি। মুড়ি-বাতাসা বিতরণ, ভোররাতে লিফলেট বিলি, ডোনেশনের মাধ্যমে ফান্ড সংগ্রহভিন্নধর্মী প্রচারণায় তিনি নজর কাড়েন। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পরদিনই বন্দুকধারীর গুলিতে আহত হন তিনি। সেই গুলিই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিলো তার প্রাণ।
নীরব প্রস্থান, প্রশ্নের রেশ
ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়; এটি প্রশ্ন রেখে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে। তার অনুপস্থিতি এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করবে বলেই অনুমেয়।
এক সময় যিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করা হতে পারে, তবু আমি পিছাব না’। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। কিন্তু থেমে গেলেও তার কণ্ঠ, তার বক্তব্য আর তার সাহসী অবস্থান থেকে যাবে সময়ের স্মৃতিতে।
বিদায় শরিফ ওসমান হাদি- এক সাহসী, সত্যভাষী তরুণ নেতা।




