সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তর বনাম সদরের ইউএনও
সাহেববাজার এলাকায় অবৈধ পোল্ট্রি খামারের বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে মুখোমুখি দুই প্রশাসন, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ মে ২০২৬, ১১:৩৩:২৪ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সিলেট সদর উপজেলার সাহেবের বাজার পাঠানগাঁও এলাকায় ছাড়পত্রবিহীন অবৈধ ‘নাহিশা পোল্ট্রি ফার্ম’-এর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে সিলেট সদর উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ওই ফার্মের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও, তা ‘সঠিক হয়নি’ দাবি করে পুনরায় সংযোগ দিতে পল্লী বিদ্যুৎকে চিঠি দিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোশনূর রুবাইয়াৎ। পরিবেশ অধিদপ্তরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ইউএনও’র এমন একতরফা চিঠির ঘটনায় খোদ প্রশাসনিক চেইনে যেমন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তেমনি ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৩নং খাদিমনগর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের পাঠানগাঁও গ্রামে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ভেতরে সম্পূর্ণ অবৈধ ও পরিবেশ আইন অমান্য করে গত ৭ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে ‘নাহিশা পোল্ট্রি ফার্ম’। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৭ মে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া আক্তারের নেতৃত্বে ওই খামারে একটি উচ্ছেদ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। খামারটির কোনো বৈধ ছাড়পত্র না থাকায় এবং মারাত্মক পরিবেশ দূষণের দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
তবে, পরিবেশ অধিদপ্তরের এই আইনি পদক্ষেপকে ‘ভুল’ দাবি করে মাঠে নেমেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোশনূর রুবাইয়াৎ। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের কারো সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ বা সমন্বয় না করেই, খামারটিতে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার জন্য পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগকে একটি সরকারি চিঠি পাঠিয়েছেন।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফায়ইজুল কবির বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘এটি ছিলো ডিজি মহোদয়ের লিখিত নির্দেশনার প্রেক্ষিতে অভিযান। বিদ্যুৎ সংযোগ কাটার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেননি।’
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, ‘নাহিশা পোল্ট্রি ফার্ম’ এর মালিক নজরুল ইসলাম মূলত পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের পলাতক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরীর একান্ত সহযোগী ও আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন। বিগত সরকারের সময় এই রাজনৈতিক দাপট খাটিয়েই তিনি গ্রামের ভেতর ঘরবাড়ির লাগোয়া এলাকায় খামারটি চালু করেন।
গ্রামের বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা জানান, বিগত ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ খামারটি চালুর পর থেকেই তীব্র দুর্গন্ধ ও বর্জ্যের কারণে তারা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার গরমে খামার বন্ধ করা তো দূরের কথা, উল্টো খামারের মালিক নজরুল ইসলাম প্রতিবাদী গ্রামবাসীর নামে একাধিক মিথ্যা মামলা-হামলা দিয়ে গত ৭ বছর ধরে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন। এর আগেও পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় খামার মালিককে একাধিকবার জরিমানা করা হয় এবং খামারটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তা মানেননি।
এলাকাবাসীর পক্ষে মো. কাহের মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ৭ মে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও খামার মালিকের দৌরাত্ম্য কমেনি। বর্তমানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর চালিয়ে খামারের কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। এর ওপর আবার খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খামার মালিকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করায় গ্রামবাসীর মনে চরম ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ এবং মাছির উপদ্রবের কারণে ২ গ্রামের সাধারণ মানুষ, স্কুলগামী শিশু এবং পথচারীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। গন্ধে শিশুরা বাড়ির বাইরে বের হতে পারছে না, এলাকায় আত্মীয়-স্বজন আসা বন্ধ হয়ে গেছে।
মো. কাহের মিয়া আরো বলেন: আমরা এমন কোন দপ্তর নেই, যেখানে অভিযোগ না দেইনি। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে আমাদের বাঁচিয়েছিল। কিন্তু, ইউএনও সাহেব পরিবেশ অধিদপ্তরকে না জানিয়েই কীভাবে একজন অবৈধ খামার মালিকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্যুৎ দেওয়ার চিঠি লেখেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা এই অবৈধ খামারের স্থায়ী উচ্ছেদ চাই।
সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোশনূর রুবাইয়াৎ জানান, পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগকে তিনি একটি চিঠি দিয়েছেন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার জন্য। তিনি দাবি করেন, এখানে মোরগের বাচ্চা রয়েছে। সেগুলো মরে যাচ্ছে। প্রাণী সম্পদ বিভাগের উপজেলা ও জেলা কর্মকর্তাদের পরিদর্শন করিয়ে এরপর তিনি চিঠি লিখেছেন পল্লী বিদ্যুতের এজিএমকে, যাতে তিনি বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেন। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোন কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জানান, জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে অবহিত রয়েছেন।
অন্যদিকে সিলেট সদর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ নাহিদ আরজুমান বানু দাবি করেন ‘নাহিশা পোল্ট্রি ফার্ম’ তিনি বছরখানেক আগে পরিদর্শন করেছিলেন। এরপর কখনো যাননি। এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে তার কথাও হয়নি।
সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ মিজানুর রহমান মিয়া দাবি করেন, বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া না দেয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তার কোন কথা হয়নি, তবে জেলা সমন্বয় সভায় পোল্ট্রি ফার্মের বিষয়ে নমনীয় থাকার বিষয়ে কথা হয়েছে বলে জানান।
গত ৭ মে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া আক্তারের নেতৃত্বে ফার্মের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া আক্তার বলেন, ডিজি মহোদয়ের লিখিত নির্দেশনার প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পালন করেছি। সদরের (ইউএনও) ম্যাডাম পরিবেশের সহকারী পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন।
‘নাহিশা পোল্ট্রি ফার্ম’ এর মালিক নজরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তিনি পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েই বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে চান। তবে সংযোগ পেতে ঈদের পর হতে পারে। এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রসঙ্গে নজরুল দাবি করেন, অভিযোগকারীদের সঙ্গে আপস মীমাংসা হয়েছে। কারো অভিযোগ না থাকলে তো আর কিছু করার নেই। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি হাইকোর্টে যাবেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক ফায়ইজুল কবির বলেন, পরিবেশের বিষয়ে কোন আপোষ নেই। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকালীন সময়ে তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান। ফায়ইজুল কবির বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে এলাকাবাসী অভিযোগ করে আসেন। অতীতে একাধিকবার জরিমানা করা হয়েছে। এই খামারের কারনে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার প্রমাণ রয়েছে এবং পরিবেশের ছাড়পত্র নেই বলেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২ এর এজিএম আহসান হাবীব বলেন, সিলেট সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রথমে মৌখিকভাবে ‘নাহিশা পোল্ট্রি ফার্ম’ এর বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের কথা জানিয়ে তাকে লিখিত দেয়া কথা বললে শুনেছি তিনি গতকাল রোববার সন্ধ্যায় একটি লিখিত চিঠি দিয়েছেন। তবে সংযোগ দেয়ার বিষয়ে আমরা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো।



