‘পরকীয়া’
পারিবারিক ভাঙন ও আত্মিক ধ্বংসের অশুভ অধ্যায়
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২০ জুলাই ২০২৬, ৭:২৯:৪১ অপরাহ্ন
রুমী চৌধুরী :
মানবসভ্যতায় পরিবার একটি মৌলিক ও প্রাচীন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। মানুষের ভালোবাসা, নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ, সন্তান প্রতিপালন এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রথম পাঠ পরিবার থেকেই শুরু হয়। একটি সুস্থ পরিবার যেমন একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি নির্মাণ করে, তেমনি পারিবারিক অস্থিরতা ও ভাঙন সমাজের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে। আর এই পারিবারিক ভাঙনের অন্যতম আলোচিত কারণ হলো বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া।
পরকীয়া শুধু একজন নারী বা পুরুষের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একাধিক মানুষের অধিকার, বিশ্বাস, আবেগ ও ভবিষ্যৎ। একটি বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তির অনৈতিক প্রবেশ স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তা নষ্ট করতে পারে এবং কখনো কখনো একটি সম্পূর্ণ পরিবারকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবেগ, গুজব বা একতরফা নৈতিক বিচার নয়; বরং বাস্তবতা, নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সামাজিক প্রভাব- সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার যে, কোনো দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধান প্রতারণা নয়; বরং পারস্পরিক আলোচনা, পরামর্শ, সম্পর্ক পুনর্গঠন অথবা প্রয়োজনে বৈধ ও সম্মানজনক বিচ্ছেদের পথ।
সাধারণ অর্থে পরকীয়া বলতে বিবাহিত ব্যক্তি ও তার বৈধ জীবনসঙ্গী ছাড়া অন্য কারও মধ্যে এমন আবেগঘন বা যৌন সম্পর্ককে বোঝানো হয়, যা দাম্পত্য বিশ্বস্ততার সীমা লঙ্ঘন করে। এর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক যেমন থাকতে পারে, তেমনি গোপন আবেগঘন সম্পর্ক, অনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও দাম্পত্য জীবনের বাইরে গভীর মানসিক নির্ভরতাও থাকতে পারে।
তবে সব বন্ধুত্ব বা নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যোগাযোগকে পরকীয়া বলা উচিত নয়। একজন মানুষের সামাজিক ও পেশাগত জীবনে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ থাকতেই পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেই যোগাযোগ গোপনীয়তা, প্রতারণা, আবেগগত নির্ভরতা বা দাম্পত্য বিশ্বস্ততার সীমা অতিক্রম করে।
এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। কারণ কোনো ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়া ‘পরকীয়ায় জড়িত’ বলে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রকৃত অবৈধ সম্পর্ককে ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ বলে বৈধতা দেওয়াও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে বিশ্বাস, আচার ও দর্শনের পার্থক্য থাকলেও পরিবার, নৈতিকতা, আত্মসংযম ও দাম্পত্য বিশ্বস্ততার বিষয়ে তাদের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।
ইসলামে ব্যভিচার ও অবৈধ যৌনসম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- “তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।” সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোরআন শুধু ব্যভিচার করতে নিষেধ করেনি; বরং তার নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছে। ইসলামী নৈতিকতার দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য হলোÑযে সব আচরণ মানুষকে ধীরে ধীরে অনৈতিক সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে, সেগুলো থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি। দৃষ্টি সংযম, লজ্জাশীলতা, চরিত্র রক্ষা এবং বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ততা ইসলামী নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খ্রিষ্টধর্মেও ব্যভিচার স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। বাইবেলের দশ আদেশে বলা হয়েছেÑ“তুমি ব্যভিচার করিও না।” নতুন নিয়মে যিশুর শিক্ষায় শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, মানুষের অন্তরের কামনাকেও নৈতিকতার আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় নৈতিকতায় বিশ্বস্ততা শুধু শারীরিক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং মন ও চরিত্রের পবিত্রতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বৌদ্ধধর্মের পঞ্চশীলের অন্যতম নৈতিক শিক্ষা হলো যৌন অসদাচরণ থেকে বিরত থাকা। বৌদ্ধ দর্শনে কামনা, আসক্তি ও অনিয়ন্ত্রিত আকাক্সক্ষাকে মানুষের দুঃখের অন্যতম উৎস হিসেবে দেখা হয়। ধম্মপদ-এর ২১৬ নম্বর শ্লোকে কামনা বা তৃষ্ণা থেকে শোক ও ভয়ের জন্মের কথা বলা হয়েছে। এই শিক্ষা মানুষের আত্মসংযম ও নৈতিক জীবনযাপনের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
হিন্দু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়েছে। গার্হস্থ্য জীবন, দাম্পত্য কর্তব্য, সতীত্ব, বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক দায়িত্ব ভারতীয় ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রামায়ণ ও মহাভারতের মতো মহাকাব্যে দাম্পত্য সম্পর্ক, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং পারিবারিক কর্তব্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।
শিখ ধর্মেও বিবাহকে পবিত্র ও আধ্যাত্মিক বন্ধন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘আনন্দ কারজ’-এর মাধ্যমে বিবাহিত জীবনকে কেবল সামাজিক চুক্তি নয়, বরং যৌথ আধ্যাত্মিক যাত্রা হিসেবে দেখা হয়। একইভাবে ইহুদী ধর্মীয় ঐতিহ্যেও ব্যভিচার নিষিদ্ধ এবং পরিবার ও দাম্পত্য বিশ্বস্ততার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অতএব, ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভাষা ও ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি সাধারণ নৈতিক শিক্ষা স্পষ্ট- দাম্পত্য জীবনে বিশ্বস্ততা, আত্মসংযম ও পারিবারিক দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরকীয়ার আলোচনায় সমাজে প্রায়ই নারীদের বেশি দোষারোপ করা হয়। এটি ন্যায়সংগত নয়। একজন বিবাহিত পুরুষ যেমন পরকীয়ায় জড়িয়ে নিজের স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, তেমনি একজন বিবাহিত নারীও একইভাবে দাম্পত্য বিশ্বাস ভঙ্গ করতে পারেন।
তাই নৈতিকতার প্রশ্নে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কোনো নারীকে কেবল নারী হওয়ার কারণে এবং কোনো পুরুষকে কেবল পুরুষ হওয়ার কারণে আলাদা নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। অপরাধের বিচার হওয়া উচিত কাজের ভিত্তিতে, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়।
একই সঙ্গে কাউকে প্রমাণ ছাড়া পরকীয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা, সামাজিকভাবে হেয় করা বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুজব ছড়ানোও নৈতিকভাবে অন্যায়। নৈতিকতা রক্ষার নামে অন্যের সম্মান নষ্ট করাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরকীয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মানুষের ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, দাম্পত্য সম্পর্ক, মানসিক অবস্থা এবং সামাজিক পরিস্থিতি- সবকিছু এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্ব, পারস্পরিক অবহেলা, একে অপরকে সময় না দেওয়া, অতিরিক্ত সন্দেহ, যোগাযোগের অভাব, সম্পর্কের মধ্যে শ্রদ্ধার ঘাটতি, আত্মসংযমের দুর্বলতা এবং বাহ্যিক আবেগের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ- এসব কারণ কখনো কখনো মানুষকে ভুল পথে ঠেলে দিতে পারে।
তবে কোনো কারণই পরকীয়াকে ন্যায়সঙ্গত করে না। দাম্পত্য জীবনে সমস্যা থাকলে তার সমাধান হতে পারে আলোচনা, পারিবারিক বা পেশাদার পরামর্শ, সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা অথবা প্রয়োজনে বৈধ বিচ্ছেদ। কিন্তু প্রতারণার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে গেলে নতুন ও আরও জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। দূরের মানুষকে কাছে আনা, পুরনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখাÑএসব ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ইতিবাচক।
কিন্তু এর অপব্যবহার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে সমস্যা তৈরি করতে পারে। পুরনো প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ, গোপন চ্যাট, গভীর রাত পর্যন্ত আবেগঘন কথোপকথন, ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান এবং দাম্পত্য সঙ্গীর কাছ থেকে যোগাযোগ গোপন করার মতো আচরণ ধীরে ধীরে সম্পর্কের সীমারেখা দুর্বল করতে পারে।
তবে এখানে প্রযুক্তিকে একমাত্র দোষী করা ঠিক নয়। মূল সমস্যা হলো মানুষের আত্মসংযম ও নৈতিকতার অভাব। একই প্রযুক্তি যেমন সম্পর্ক ভাঙতে পারে, তেমনি সঠিক ব্যবহারে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালীও করতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, তার নৈতিক ব্যবহারই আসল বিষয়।
পরকীয়ার ক্ষেত্রে পুরনো প্রেমের পুনর্জাগরণ একটি আলোচিত বিষয়। বহু বছর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরনো পরিচিত বা প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হলে অতীতের আবেগ নতুন করে জেগে উঠতে পারে।
অনেক সময় মানুষ বর্তমান জীবনের বাস্তব দায়িত্বকে ভুলে অতীতের স্মৃতিকে অতিরঞ্জিত করে দেখে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অতীতের স্মৃতি আর বর্তমান জীবনের বাস্তবতা এক নয়। আজ একজন মানুষের পরিবার, জীবনসঙ্গী, সন্তান ও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। তাই অতীতের আবেগকে কেন্দ্র করে বর্তমানের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা কোনোভাবেই নৈতিক সমাধান হতে পারে না।
বর্তমান বিশ্বে জনপ্রিয় সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কিছু সিনেমা, সিরিজ বা অনলাইন কনটেন্টে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে কখনো কখনো রোমান্টিক বা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে এসব সম্পর্ক সম্পর্কে নৈতিক সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে।
তবে সব সিনেমা বা আধুনিক সংস্কৃতিকে পরকীয়ার জন্য দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত নয়। মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিকতা, পারিবারিক শিক্ষা ও আত্মসংযমের ভূমিকাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কনটেন্ট দেখে একজন মানুষ কীভাবে প্রভাবিত হবেন, তা তার নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিচারবোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ব্যক্তিস্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। নিজের সুখের জন্য অন্যের অধিকার, বিশ্বাস ও মর্যাদা নষ্ট করার নাম স্বাধীনতা নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নিজের ইচ্ছাকে নৈতিকতার সীমার মধ্যে পরিচালনা করার ক্ষমতা।
পরকীয়ার সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়তে পারে সন্তানদের উপর। মা-বাবার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কলহ, অবিশ্বাস, বিচ্ছেদ বা পারিবারিক অস্থিরতা শিশুদের মানসিক নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করতে পারে। এর ফলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, রাগ, আত্মবিশ্বাসের সংকট বা সম্পর্ক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
অবশ্য প্রত্যেক শিশুর অভিজ্ঞতা এক নয় এবং প্রতিটি বিচ্ছেদের ফলও একই হয় না। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বিচ্ছেদের পরও সন্তান সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে, যদি বাবা-মা দায়িত্বশীলভাবে তাকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দেন। তাই সমস্যার মূল শুধু বিচ্ছেদ নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, প্রতারণা এবং শিশুর প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ।
পরকীয়া ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট হলেও এর সামাজিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। দাম্পত্য অবিশ্বাস থেকে বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক সংঘাত, মানসিক যন্ত্রণা এবং কখনো কখনো গুরুতর সহিংসতার ঘটনাও ঘটতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রতিটি আত্মহত্যা, হত্যাকাণ্ড বা পারিবারিক সহিংসতার জন্য পরকীয়াকে একমাত্র কারণ হিসেবে দায়ী করা বৈজ্ঞানিক বা গবেষণামূলকভাবে সঠিক নয়। এসব ঘটনার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আসক্তি ও অন্যান্য সামাজিক কারণও থাকতে পারে। তাই পরকীয়াকে সামাজিক সমস্যার একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, একমাত্র কারণ হিসেবে নয়।
পরকীয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো নৈতিক ও দায়িত্বশীল সম্পর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। পরিবারে সন্তানদের শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দিলেই হবে না; তাদের শেখাতে হবে সম্মান, আত্মসংযম, দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া জরুরি। দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে তা দীর্ঘদিন গোপন না রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত পরিবার-পরিজন, ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি বা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত সীমারেখা ও দাম্পত্য স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। তবে ‘সন্দেহ’ ও ‘নিয়ন্ত্রণ’কে স্বচ্ছতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত বিশ্বাস, সম্মান ও পারস্পরিক দায়িত্ব।
পরকীয়া কোনো আধুনিকতার প্রতীক নয়, আবার প্রতিটি নারী-পুরুষের স্বাভাবিক বন্ধুত্বকেও পরকীয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত সমস্যা তখনই, যখন কোনো সম্পর্ক দাম্পত্য বিশ্বস্ততা, নৈতিকতা ও অন্যের অধিকারকে লঙ্ঘন করে প্রতারণার রূপ নেয়।
প্রকৃত ভালোবাসা কখনো প্রতারণা শেখায় না। ভালোবাসা মানুষকে দায়িত্বশীল করে, বিশ্বস্ত করে এবং অন্যের মর্যাদাকে সম্মান করতে শেখায়। একটি সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে পালিয়ে যাওয়া বা গোপন সম্পর্ক তৈরি করা নয়; বরং সত্য, সংলাপ, আত্মসংযম ও নৈতিকতার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা উচিত।
পরিবারকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি দাম্পত্য সম্পর্ককে রক্ষা করা নয়; এর অর্থ হলো সন্তানদের নিরাপত্তা, প্রবীণদের মানসিক শান্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তিকে রক্ষা করা।
আজ আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে আধুনিকতা থাকবে, কিন্তু নৈতিকতার অবক্ষয় থাকবে না; ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বহীনতা থাকবে না; প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে, কিন্তু তার অপব্যবহার থাকবে না। ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিকতা, পারস্পরিক সম্মান ও আত্মসংযাপনের সমন্বয়ে গড়ে উঠুক আমাদের পারিবারিক জীবন। কারণ একটি শক্তিশালী পরিবারই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। আর সেই পরিবারকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হলোÑ বিশ্বাস, বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট।


