এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণকাণ্ডে ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুলাই ২০২৬, ৪:১০:৪৪ অপরাহ্ন
দেশব্যাপী আলোচিত সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে দলবদ্ধ গণধর্ষণ মামলায় ১ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এসময় বাকি চারজনকে অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন। তিনি বলেন, মামলার রায়ে আদালত সাইফুরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আর তারেক, অর্জুন ও রনিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া বাকি ৪ আসামীকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এই মামলাটি তৎকালীন সরকার দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখেছিল। তখন ভালোভাবে তদন্ত, উপযুক্ত প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়নি। নাহলে সবারই সাজা হতো। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পরে এটির যে এখন বিচার হয়েছে, সেজন্য রাষ্ট্রপক্ষ সহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হল- সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর রহমান (২৮)। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামীরা হলেন- হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গির মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৬)।
আর খালাসপ্রাপ্তরা হলেন- দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির (গাছবাড়ী) সালিক আহমদের ছেলে মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের ছেলে মিজবাউল ইসলাম রাজনকে (২৭)।
এর আগে গত বুধবার মামলার আসামি পক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ সর্বশেষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এদিনই শেষবারের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত মঙ্গলবার চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন।
এর আগে, সিলেটের নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে গত বছরের মে মাসে সিলেটের দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটো স্থানান্তর হয়ে আসলে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ ও তার স্বামী (মামলার বাদী), মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, আসামিদের স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেট, ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারসহ সর্বমোট ২৫ জন সাক্ষী আদালতে তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন।
জানা গেছে,প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য কালো থাবার মুখে আটকে যায় বিচার কার্যক্রম। এখানেই শেষ নয় ক্ষমতার দাপট এতোটাই ছিল যে, ওই সময়ে কোনো আসামিকে আদালতে পর্যন্ত আনা হয়নি। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে প্রায় এক বছর মামলা দুটোর বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকার পরে অবশেষে গতি ফিরে আসে।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরের ২৪ বছর বয়সী এক যুবক তার ১৯ বছর বয়সী নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে প্রাইভেটকারযোগে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান। প্রাইভেটকারসহ গৃহবধূ ও তার স্বামীকে জোরপূর্বক জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে ছাত্রাবাসের ৭ নং ব্লকের ৫ম তলা বিল্ডিং এর সামনে প্রাইভেটকারের মধ্যেই গৃহবধূকে জোরপূর্বক গণধর্ষণ করে। ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি ধর্ষকরা গৃহবধূর সাথে থাকা টাকা, স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।আটকে রাখে তাদের প্রাইভেট কারও। এঘটনায় নির্যাতিতার স্বামী মাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৩-৪ জনকে আসামী করে শাহপরান (র.) থানায় মামলা করেন। দেশের অন্যতম পুরনো বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে সরকার ধর্ষণের সাজার আইনের পরিবর্তন করে মৃত্যুদন্ডের ঘোষণা দেয়।২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান করে জাতীয় সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল ২০২০ পাশ হয়।
গণধর্ষণের ঘটনায় সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর রহমান (২৮), হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গির মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৬), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫) , কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির (গাছবাড়ী) সালিক আহমদের ছেলে মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের ছেলে মিজবাউল ইসলাম রাজনকে (২৭) অভিযুক্ত করে ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর দন্ডবিধি আইনে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে পুলিশ। এতে ৫২ জনকে সাক্ষী রাখা হয়।ঘ টনার মাত্র ২ মাস ৮ দিন পর ১৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেয়া হয়।
এদিকে,ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামী করে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯/১৯এ ধারায় অভিযোগপত্রটি জমা দেয়া হয়। ঘটনার ১ মাস ২৭ দিন পর অস্ত্র মামলার অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
গণধর্ষণের পর আইনশৃংখলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ধর্ষকদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত আট ধর্ষকের সকলেই ছাত্রলীগের টিলাগড় গ্রুপের গডফাদার ও জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রনজিত সরকারের অনুসারী। গ্রেফতারের পর ৮ আসামির সকলেই অকপটে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী দেয়। আসামিদের মধ্যে সাইফুর রহমান ,শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ,তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, মিজবাহুল ইসলাম রাজন ও আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ওই নববধূকে সরাসরি গণধর্ষণ করে। রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম ধর্ষণে সহযোগিতা করে।
গ্রেফতারের পর আদালত তাদের প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে ৮ আসামীর সকলেই জবানবন্দিতে গৃহবধূকে তুলে নেয়াসহ গণধর্ষণ ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত আসামিরা সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে।



