দৈনিক সিলেটের ডাক : পুরনো দিনের কিছুকথা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ জুলাই ২০২৬, ৮:০৭:৪৮ অপরাহ্ন
জাবেদ আহমদ :
সিলেটের ডাক সিলেট বিভাগের প্রথম দৈনিক। ১৯৮৪ সালের ১৮ জুলাই দৈনিক পত্রিকা হিসেবে বাজারে আসার পর ‘সিলেটের ডাক’ বিয়াল্লিশ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রতিটি ভোরে পাঠকের হাতে পোঁছাচ্ছে। আজ কোটি মানুষের মুখপত্রে পরিণত হয়েছে দৈনিক সিলেটের ডাক।
সিলেটের ডাকের সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় শুরুর দিক থেকেই। ১৯৮৪ সালের শেষ ও ১৯৮৫ সালের শুরুর দিকে আমি দৈনিক সিলেটের ডাক এর জিন্দাবাজার কাজী ম্যানশনের অফিসে সাইক্লোন, মোহামেডান ফ্যান ক্লাব, আম্বরখানা কলোনির কার্যক্রমের প্রেস রিলিজ লেখে ছাপানোর জন্য নিয়ে যেতাম। সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান ও সে সময়ের সিনিয়র সাংবাদিক মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার’র সাথে দেখা করতাম, সালাম দিয়ে ছাপানোর অনুরোধ করে প্রেস রিলিজ দিয়ে আসতাম। সিলেটের ডাকের সুবিদবাজার অফিসে (দোতালায় পত্রিকা অফিস, নিচে ছাপাখানা) নিয়মিত প্রেস রিলিজ নিয়ে যেতাম। সে সময়ে লেটার প্রেসে পত্রিকা ছাপা হতো, তখন আজকের মতো অফসেট প্রেসে ছাপা শুরু হয়নি। দৈনিক সিলেটের ডাক এর মালিকানায় পরিবর্তন হয়। সম্পাদক হন মুজিবনগর সরকারের আইন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ আব্দুল হান্নান চৌধুরী ও সম্পাদকমন্ডলির সভাপতি দানবীর ড. রাগীব আলী’র মালিকানায় নব উদ্যোমে দৈনিক সিলেটের ডাক সিলেটের পত্রিকার বাজারে একক আধিপত্য অর্জন করে।
মধুবন মার্কেটের তৃতীয় তলায় হার্ডবোর্ডে ঘেরা অফিসে দৈনিক সিলেটের ডাক স্থানান্তরিত হলে অফসেট প্রেসে ছাপা শুরু হয়। শুরুর দিকে দৈনিক সিলেটের ডাকে কম্পিউটার বিভাগ চালু হয়, ছাপা হয় বাইরের প্রেস থেকে। কয়েক বছরের মধ্যেই মধুবন মার্কেটের পঞ্চম তলায় নিজস্ব প্রেস চালু হয়। পত্রিকা অফিস চতুর্থ তলায় স্থানান্তরিত হয়, যা সর্বশেষ স্থানান্তর হয় একই মার্কেটের পঞ্চম তলায়। ১৯৯২ সালের ১ নভেম্বর আমি আকস্মিকভাবে দৈনিক সিলেটের ডাক এর বার্তা কক্ষের সদস্য হয়ে যাই, সাংবাদিকতায় নাম লেখাই। অক্টোবর মাসে ‘আমরা মোহামেডান’ সিলেট জেলা শাখার ক্রোড়পত্র ছাপানোর কাজে রাত জেগে সিলেটের ডাক এর সাংবাদিকদের সাথে ছিলাম। দৈনিক সিলেটের ডাক এর নির্বাহী সম্পাদক সেসময়কার সিলেটের সবচেয়ে ক্ষুরধার লেখনীর সাংবাদিক মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার ভাই আমাকে তাঁর রুমে ডেকে নিয়ে ১ নভেম্বর থেকে পত্রিকার বার্তা কক্ষে যোগদানের আমন্ত্রণ জানালেন। আমি কিছুটা ইতস্তত বোধ করলে তিনি সাহস দিয়ে বললেন ‘তোমার প্রেস লেখা আমি পড়ি, ভাল লেখ, আরেকটু মনযোগ দিয়ে লিখলে পত্রিকায় কাজ করা অসুবিধা হবে না’। শুরু আমার নতুন পেশা দিনের বেলা ব্যাংকারের পাশাপাশি রাতে সাংবাদিকতা।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত আমি দৈনিক সিলেটের ডাক এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম। সে সময়ে তথ্য প্রযুক্তি আজকের মতো ছিল না। বার্তা কক্ষে আমরা পুরনো কাগজে হাতে নিউজ লিখে এডিট হয়ে কম্পিউটার বিভাগে গেলে কম্পোজ হতো। রেডিও টিভির সংবাদ থেকে টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে, জেলা উপজেলা সংবাদদাতাদের সাথে টেলিফোনে কথা বলে নিউজ সংগ্রহ করা হতো। টেলিফোনের মাধ্যমে ফ্যাক্স মেশিন চালু হলে নিউজ ফ্যাক্সে আসতো। এখন সাংবাদিকরা সকলেই কম্পিউটার ল্যাপটপ ব্যবহার করেন, অনেকেই মোবাইলে নিউজ লিখে মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে দেন।
আমাদের সময়ে (১৯৯৩ সালে) সিলেটের ডাকের নির্বাহী সম্পাদক মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার জাতীয় নির্বাচন কাভার করতে পাকিস্তান যাওয়া ছিল সিলেটের আলোচিত সংবাদ। ফ্যাক্সে তিনি সংবাদ পাঠাতেন, পাকিস্তানের নির্বাচনের তরতাজা খবর আসতো পত্রিকায়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দৈনিক সিলেটের ডাক এর সম্পাদকমন্ডলির সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার প্রিন্টিং লাইনে নাম আসে আলহাজ্ব মোঃ মবশ্বির আলী ও দানবীর ড. রাগীব আলী। সম্পাদক হিসেবে নাম ছাপা হয় মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মুহাম্মদ আব্দুল হান্নান চৌধুরী, মহীয়সী নারী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী, এনামুল হক জুবের, দেওয়ান তৌফিক মজিদ লায়েক, মোঃ আব্দুল হান্নান, বনমালী ভৌমিক, মোঃ আব্দুল হাই প্রমুখের। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন দেওয়ান তৌফিক মজিদ লায়েক এবং ওয়াহিদুর রহমান ওয়াহিদ। নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, মো. ইকবাল সিদ্দিকী, সরকার শাহাবুদ্দিন, আবদুল হামিদ মানিক। বার্তা সম্পাদকরা ছিলেন জিয়াউস শামস শাহীন, এনামুল হক জুবের, সেলিম আউয়াল ও সমরেন্দ্র বিশ্বাস সমর। বর্তমানে অতিথি সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাসন, প্রধান বার্তা সম্পাদক এনামুল হক জুবের, বার্তা সম্পাদক সমরেন্দ্র বিশ্বাস সমর ও চিফ রিপোর্টার মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম দায়িত্বে রয়েছেন।
২০১৭ সালে একটি মিথ্যা অভিযোগে সরকারের নির্দেশে সিলেটের ডাক পত্রিকা কয়েকদিন ছাপা না হলে পাঠকদের মধ্যে বিরাট শূন্যতা ও হতাশা দেখা দেয়। আইনি মোকাবেলা করে দ্রুতই পাঠকদের মাঝে ফিরে আসে দৈনিক সিলেটের ডাক।
বিভিন্ন সময়ে দৈনিক সিলেটের ডাক এর বার্তা কক্ষে কর্মরত সাংবাদিকরা হলেন (সাবেক ও বর্তমান) আব্দুল মালিক জাকা, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, আশিক মোহাম্মদ (মরহুম), আব্দুস সবুর মাখন, গোপেন দেব, পুলিন রায়, জামাল উদ্দিন আহমদ, জাহেদুল ইসলাম শাহজাহান মামা, হাবিবুর রহমান হাবিব, বদরুদ্দোজা বদর, ডাক্তার এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল, এডভোকেট খাদিমুল মিল্লাত মোঃ জালাল (মরহুম), জাবেদ আহমদ, আহমেদ শামীম, হাবিবুর রহমান, রিয়াজ উদ্দিন ইসকা, সালেহ আহমদ খান, শাহেদ হোসাইন, রাজু আহমদ, ভানুজ কান্তি ভট্টাচার্য্য, মইন উদ্দিন মনজু, খালেদ আহমদ, রাজু ওয়াহিদ, ইব্রাহিম খলিল, ইকবাল মাহমুদ, ফয়সাল আইয়ুব, মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন, মোহাম্মদ শামসুল আলম, ড. মোজাহিদ আলী, আব্দুল মুকিত অপি, সাব্বির আহমদ, এম. আহমদ আলী, মোহাম্মদ জুবায়ের, সাঈদ নোমান, সুনীল সিংহ, সাদেক আহমদ আজাদ, আহমেদ ইয়াসিন খান, কাউসার চৌধুরী, আহমাদ সেলিম, এনামুল হক রেনু, আনাস হাবিব কলিন্স, ইউনুছ চৌধুরী, নুর আহমদ, হাফেজ ফায়যুর রাহমান, লবিব আহমদ, ফটো সাংবাদিক আব্দুল বাতিন ফয়সল, জাবেদ আহমদ, সিলেটের ডাক এর কম্পিউটার বিভাগে মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান, সিতাব আহমদ, বদরুল কাদির শিহাব, বিজ্ঞাপন বিভাগের মোঃ আব্দুস সোবহান, নামব্রম শংকর, মোঃ রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলমগীর, সার্কুলেশনে মাহতাব উদ্দিন, স্বপন মাহমুদ, রাসেল আহমদ আনিস, অফিস সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান (মরহুম), হাবিবুর রহমান, ইকবাল, রিকশা চালক আব্দুল হাকিম (মরহুম), পেইস্টার মরহুম মোঃ খলিলুর রহমান, আব্দুল মন্নান, প্রেস ম্যানেজার কানু লাল দেবনাথ, ঢাকা প্রতিনিধি ফজলুল বারী, হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি মরহুম এডভোকেট আমীর হোসেন, এডভোকেট মনসুর উদ্দিন আহমদ ইকবাল, সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি আইনুল ইসলাম বাবলু, মোঃ শাহজাহান চৌধুরী, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি আব্দুল হামিদ, সম্পাদনা সহকারীদের মধ্যে ছিলেন ও বর্তমানে আছেন মরহুম জাহেদুর রহমান জাহেদ, চঞ্চল মাহমুদ ফুলন, নির্মল চন্দ্র দত্ত, মাহমুদুল হক ওসমানী, রায়হান আহমদ হেলন, বনবীর রায়, আমিরুল ইসলাম চৌধুরী এহিয়া, অপূর্ব কর সুমন প্রদীপ চন্দ্র দাশ। অনেকের নাম লিখতে পারিনি, অনিচ্ছায় ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। দৈনিক সিলেটের ডাক এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।
লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।



