কবি লায়লা রাগিব : প্রেরণার বাতিঘর
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১০ জুলাই ২০২৬, ৬:২৪:৩৭ অপরাহ্ন
ইশরাক জাহান জেলী :
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশাল অংশ জুড়ে নারীদের অবদান অনন্য। সাহিত্য সাধনায় যুগে যুগে নারীরা এসেছেন আলোকবর্তিকা হয়ে। মনোরম প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান পূণ্যভূমি সিলেট। এ অঞ্চলের নারী লেখকেরা তাদের মননশীল লেখনীর ছোঁয়ায় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি সৈয়দ শাহনূরের সহধর্মীনী সৈয়দা সামিনা বানুকে প্রথম মুসলমান কবি বলা হয়। মধ্যযুগ ও তার পরবর্তী সময়ে যে কয়জন নারী লেখক পুরুষদের পাশাপাশি সাহিত্যে অবদান রেখে গেছেন, তাদের মধ্যে হাজি বিবি নামে সমধিক পরিচিত, মরমী কবি হাসান রাজার বৈমাত্রেয় বোন দেওয়ান আলি রেজার কন্যা সহিফা বানু, কৃষ্ণপ্রিয়া চৌধুরী, হেমন্ত কুমারি চৌধুরী, সৈয়দা হাবিবুন্নেসা ও পরবর্তীকালে সিতারা বেগম, লাভলী চৌধুরী, নুরুন্নেসা হক, ফাহমিদা রশিদ চৌধুরী, নুরুন্নেসা চৌধুরী, শামসাদ হুসাম, মাহবুবা সামসুদ-সহ আরো অনেক নারী লেখকদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। তাদেরই একজন কবি লায়লা রাগিব। যিনি সত্তরের দশকে সিলেটের সাহিত্য জগতে ‘ঠোঁটের ভাষায় কবিতা লিখুন’ শ্লোগান তুলে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
কেবল সিলেট কিংবা বাংলাদেশ নয়, কবি লায়লা রাগিবের লেখনি তখনকার সময়ে কলকাতায়ও প্রভাব বিস্তার করে। সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার পারিবারিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠে ১৯৬৬ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘অভিশাপ’ নামক ছোটগল্পের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখলেও কবি হিসেবেই তিনি বহুল পরিচিত। কবি লায়লা রাগিবের কবিতার ভাব ও ভাষা, লেখার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। প্রেম, প্রকৃতি, প্রার্থনা, সমাজ, দেশপ্রেম, ক্ষোভ ও জীবনবোধের গভীরতা অতি সহজ সাবলীল ভাষায় চিত্রায়িত হয়েছে তাঁর কবিতায়।
তিনি আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতা ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত হয়ে সহজ সরল রুচিশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে কবিতাকে সাধারণের মাঝে পৌঁছে দিতে চান। লায়লা রাগিব একজন আধুনিক কবি। দুর্বোধ্যতা, অশ্লীলতা, নগ্নতা বর্জন করে যে আধুনিক কবিতা লিখা বা সাহিত্য চর্চা সম্ভব তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি একজন সংগঠক ও সম্পাদক হিসেবেও রেখে গেছেন দূরদর্শিতা, সাহসিকতা ও দক্ষতার ছাপ।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই ক্ষণজন্মা কবির অনুপস্থিতি আমাদের শোকাচ্ছন্ন করলেও তার সৃজনশীল সাহিত্য তাঁর মৃত্যুর ৪০ বছর পরেও প্রখর আরো দ্যোতিময়।
কবি লায়লা রাগিবকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ বলেন, ‘লায়লার মত হৃদয় নিয়ে খুব বেশি নারী বাংলাদেশে জন্মাননি। তার রচনার মধ্যে তিনি থাকবেন অসমাপ্তের মত একথা মন মানতে চায় না, এধরনের কবিরা কেন যে পৃথিবীতে আসেন তা এক রহস্যময় বিষয় বটে…. মৃত্যু একজন প্রকৃত কবিকে শেষ পর্যন্ত নিঃশেষে মুছে ফেলার মত ক্ষমতাশালী নয়।’
লায়লা রাগিব আধুনিক কবিতার নামে দুর্বোদ্ধতা পরিহার করে সহজ সরল ভাষায় কবিতা লেখার আহ্বান জানিয়ে ‘ঠোঁটের ভাষায় কবিতা লিখুন’ ঘোষণা দিয়ে শুরু করেন কবিতা আন্দোলন। এ আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে লায়লা রাগিবের সম্পাদনায় ১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয় কবিতা পত্রিকা ‘কবি সংলাপ’। প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ‘ঠোঁটের ভাষায় কবিতা লিখুন’ ঘোষণা দিয়ে চারিদিকে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
ঠোঁটের ভাষায় উচ্চারিত মানুষের হৃদয়ের কথা,জটিল, দুর্বোধ্যতার প্রতিবাদে কাব্যকথায় সত্য শব্দচয়নে একটি শ্লোগান হয়ে ওঠে কাব্যভুবনে প্রজন্মের প্রাণশক্তি ও কল্যাণময় নতুন দিগন্তের দিশারী। তাই তো কবি লায়লা রাগিব বলেন, ‘কবিতায় দুর্বোধ্যতা সম্পূর্ণরূপ বর্জনীয়, ঠোঁটের ভাষাই হবে কবিতার ভাষা, গণ-কবিতায় জটিলতার ধোঁয়া থাকতে পারে না’। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য নবীন প্রবীণ লেখকেরা চিঠিপত্র লিখে কবিতা সংলাপ সম্পাদকের সাথে এ আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
‘কবি সংলাপ’ এর দ্বিতীয় সংখ্যার সম্পাদকীয়তে সম্পাদক লায়লা রাগিব আবার লিখলেন, ‘কবিতা আজ প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়েছে। কবিতা এখনো কবিদের দুর্বোধ্য প্রাসাদে বন্দী। এ বন্দিত্ব থেকে কবিতাকে জনগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে হবে। খোলা চোখে, সহজভাবে, অতি সাধারণ হয়ে আমাদের কাছে ধরা দেবে, তাই হবে আমাদের কবিতার বক্তব্য। ঠোঁটের ভাষাই হবে কবিতার ভাষা। তা হবে গণকবিতা। গণ-কবিতায় জটিলতার ধোঁয়া থাকতে পারে না। অশ্লীলতার স্থান নেই। আমাদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়ান।’
‘কবি সংলাপ’ প্রায় বিশটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ সংখ্যাটি বের হয় ১৯৮৪ সালে। ‘কবি সংলাপের’ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় লিখেন দেশবরেণ্য কবি আল মাহমুদ, আফজাল চৌধুরী, আব্দুল হালিম খাঁ, রফিক আজাদ, লায়লা ইউসুফ, শিশির বড়ুয়া, শাহাবুদ্দিন আল ফেরদৌস, শাহেদা জেবু, রাগিব হোসেন চৌধুরী, হোসনে আরা হেনা, ফরিদ আহমদ রেজা-সহ অনেকে।
পঞ্চম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালের ২৩শে জুন। এ সংখ্যায় পূর্ববর্তী লেখকদের সাথে যারা কাব্যভূবন রাঙিয়ে তুলেন- তারা হলেন মুকুল চৌধুরী, নিজাম উদ্দিন সালেহ, কামাল আহমদ, আসলাম সানি, নুরুল করিম খসরু, মীর লিয়াকত আলী, নাজনীন কাসেমী, মহিউদ্দিন শিরু, শাব্বির জালালাবাদী, আব্দুল ওয়াদুদ, খালেদা এদিব চৌধুরী প্রমুখ। পঞ্চম সংখ্যাটি তুমুল আলোচিত ছিল। কারণ এ সংখ্যার প্রতিবেদনে বলা হয় ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রুখতে হলে ঠোঁটের ভাষায় কবিতা লিখুন’।
‘টোকাই, কার্টার, ব্রেজনেভ, খোমেনীকে কবিতা বুঝতে দিন। আমরা বলতে চাই, ঠোঁটের ভাষায় কবিতা বিশ্বজোড়া চর্চা হলে নাগরিক থেকে শুরু করে সমর নায়করা কবিতার পাঠক হলে, কবিতা বুঝতে পারলে, কবিদের মতো মানবতাবাদী হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সকল পথ ও মত একাকার হয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব থেমে যাবে।’
লায়লা রাগিব সিলেটে বসে বিশ্বময় শান্তি ও তার সমাজসচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে কবিতাকেই বেছে নিয়েছেন। প্রতিভাবান এ কবির কবিতা আন্দোলনের মাধ্যমে সত্তরের দশকে বাংলা সাহিত্যে অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়। দেশের খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিকেরা বিশেষ করে কবি ওমর আলী, আব্দুল হালিম খাঁ, ফরিদ আহমদ রেজা, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কামাল মাহমুদ এ আন্দোলনকে সমর্থন করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী কবি আফজাল চৌধুরী কবিতা আন্দোলনের জোরালো আওয়াজ শোনে বলতে বাধ্য হন ‘কবি সংলাপ আমাদের কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে’।
কবি লায়লা রাগিব ‘কবি সংলাপ’ ছাড়াও ‘রাত পোহাবার কত দেরি’ এবং প্রয়াত সাংবাদিক বুদ্ধদেব চৌধুরী ও তার যৌথ সম্পাদনায় ‘শব্দ পাশ’ নামে একটি চমৎকার সংকলন প্রকাশিত হয়।
সিলেট নগরের শেখঘাট কাজী পরিবারে ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি কবি লায়লা রাগিবের জন্ম। জানা যায়, তিনি দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর বংশধর। তার পিতার নাম আবু সাইয়েদ মোহাম্মদ ইউসুফ, মায়ের নাম লুৎফুন্নেসা। পিতামাতার তৃতীয় সন্তান কবি লায়লা রাগিবের পারিবারিক নাম লায়লা ইউসুফ। পিতার কর্মস্থল ছাতক শহরের প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। অতঃপর তিনি সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যায়ন করেন। জীবনের শুরুতে কবি লায়লা ইউসুফ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন।
১৯৮০ সালের ১ জুন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক কবি রাগিব হোসেন চৌধুরীর সাথে যুগল জীবনের নতুন অধ্যায়ে পদার্পন করেন। তাই পরবর্তীতে তিনি লেখালেখি সমাজসেবা, সাহিত্য আন্দোলনে কবি লায়লা রাগিব নামেই সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। মাত্র ছয় বছরের কবির আনন্দমুখর সংসার। এরই মধ্যে লেখক দম্পতির বাসা ও প্রেস হয়ে উঠেছিল সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতির আলোচনা, সম্পাদনা ও লেখক আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু।
কবির পিতামহ আবু ইউসুফ আহম্মদ ইয়াকুব। প্রপিতামহ মাওলানা আব্দুর রহমান ও তার ভাই মাওলানা আব্দুল কাদির মধ্যযুগে সিলেটের সাহিত্যের প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন। ভারতের কানপুর থেকে তাদের বই ১৮৬৫, ১৮৮২ ও ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয়।
লখনৌ, কলকাতা মাদ্রাসায় তাদের লিখিত আরবি, ফার্সি কিতাবসমূহ পাঠ্যতালিকা ছিল। মাওলানা ভ্রাতৃদ্বয়ের পিতা খান বাহাদুর আবু নছর মো. ইদ্রিস বাদশাহী আমলে সিলেটে কাজী ছিলেন। তার পূর্বপুরুষ মাওলানা আব্দুল করিম বাগদাদ থেকে পানিপথ হয়ে ভারতের হিরাতে বসবাস করেন। হিরাত থেকে বাদশাহী আমলে বিচারক হিসেবে তার পূর্বপুরুষের বাংলায় আগমন ঘটে। প্রথমে মাওলানা মো. সালেহ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে বসতি অতঃপর সিলেটে। কবির পূর্বপুরুষরাই সিলেট শহরের কাজিরবাজার ও তাদের বিশাল জমিদারির এক সীমানা সুরমা, কুশিয়ারা, বিবিয়ানা নদীর ত্রিমোহনায় বর্তমানে বানিয়াচং উপজেলার মার্কুলি নামক স্থানে কাদিরগঞ্জ বাজার ও ডাকঘর স্থাপন করেন।
কবি আব্দুল হালিম খাঁ তার মূল্যায়নধর্মী লেখায় লিখেছেন, ‘লায়লা রাগিব কবিতা আন্দোলনের একজন প্রতিভাবান নেত্রী এবং সমাজসচেতন কবি হিসাবে যে মতাদর্শ ধারণ করেছিলেন তা তাঁর সাহিত্যের সমস্ত অবয়বে ফুটে ওঠেছে। কাব্য বিচারে এবং মতাদর্শে তিনি বোদলেয়ারের সঙ্গে তুলনীয়।’
অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ এর সঙ্গে তাঁর কবিতার বিশাল ভান্ডারে সহজ সরল ছন্দ,উপমা নিয়ে প্রশ্ন করলে কবির সরল স্বীকারোক্তি সহজ সাবলীল ভাষায় কবিতা লিখার পদ্ধতি শিখেছি ১৯৭৯ সালে ক্ষণজন্মা এক মহিয়সী নারীর কাছ থেকে। তিনি কবি লায়লা রাগিব, যার একটি লাইন আমার লিখার জগতে আমুল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।’
১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে ১৭ সেপ্টেম্বর ১২ জন কীর্তিময়ী লেখিকার উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সিলেট লেখিকা সংঘ’। তখনকার রক্ষণশীল পারিবারিক, সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে এই কোমলমতি নারী লেখকদের উদ্যমী ও সাহসী পদক্ষেপ সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনে যুগান্তকারী ইতিহাসের জন্ম দেয়। ‘সিলেট লেখিকা সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কবি লায়লা রাগিব তার সাংগঠনিক যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। যা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কবি যখন বুঝতে পারেন সিলেটে অনেক মহিলা আছেন যারা লেখালেখি করেন কিন্তু এক সময় আর তাদের দেখা যায় না, উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে অনেকেই হারিয়ে যান সাহিত্যের পাতা থেকে। পুরুষদের সংগঠনেও লেখিকাদের তেমন বসার উন্মুক্ত পরিবেশ ছিলনা। তাই সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়াসে ১৯৮২ সালে ৭ সেপ্টেম্বর সিলেটের লেখিকাদের উদ্দেশ্যে প্রথম আহবান চিঠি প্রেরণ করেন। স্বামী কবি রাগিব হোসেন চৌধুরীকে নিয়ে লেখিকাদের বাসায় বাসায় গিয়ে তা পৌঁছে দেন। লায়লা রাগিবের লেখা চিঠি সংগঠনের প্রথম আহ্বান দলীল হিসেবে লেখিকা সংঘের স্মারক শুচিতে হুবহু ছাপানো হয়েছে।
অতঃপর ১৭ সেপ্টেম্বর কবির বাসভবনে ১২ জন লেখিকার উপস্হিতিতে সিলেটের বুকে কবি লায়লা রাগিবকে সভানেত্রী ও শাহেদা রহমান জেবুকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রতিষ্ঠিত হয় নারী লেখকদের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ‘সিলেট লেখিকা সংঘ’।
নানা প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে সিলেটের সৃজনশীল প্রতিভাময়ী লেখিকাদের উন্মুক্ত চেতনার প্রতিনিধিত্বশীল চারণ প্রতিষ্ঠান লেখিকা সংঘ আজও আপন আলোয়স গৌরবে এগিয়ে চলছে। সিলেট লেখিকা সংঘের সদস্যদের অনেকেই আজ দেশেবিদেশে প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা রাখছেন।
লায়লা রাগিবের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চারটি। প্রথম কবিতার বই ‘কিংখাবে মোড়া’। ১৯৭৮ সালের মে মাসে কবির বয়স যখন মাত্র ২২ বছর, তখন প্রকাশিত হয়। সত্তর দশকের কাব্যসাহিত্যে বহুল পঠিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯৬ এবং ফেব্রুয়ারি ২০০০ সালে বইটির তৃতীয় সংস্করণ পাঠকের হাতে তুলে দেয়া হয়। গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠন “উটঅখ” ৭। ‘বৃষ্টি আমার জন্মাবধি দুঃখ মুছে নাও’ (কবিতা) তার দ্বিতীয় গ্রন্থ। এটি অক্টোবর ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ‘একটি কবিতা’। হৃদয় নিংড়ানো কথার বিশুদ্ধতায় বৃষ্টির সাথে একান্ত আলাপন। বাদলা দিনে ঝুম বৃষ্টির শব্দে মনে মনে আওড়াই ‘বৃষ্টি আমার জন্মাবধি দুঃখ মুছে নাও’। কবির মুখখানা তখন খুব করে সামনে চলে আসে। এ লাইনটুকু সাধারণের মনে নাড়া দেওয়া এক সৃষ্টিশীল অনুভূতি। অসাধারণ শব্দশৈলী আর অনেকগুলো আলোচিত কবিতার সমন্বয় রয়েছে এ বইটিতে।
তৃতীয় গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত ডায়েরি’ (গল্প)। এটি ২০০৭ সালে ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত। ১৯৮৩ সালে লিখা ১১টি গল্প বাছাই করে রেখেছিলেন কবি। দীর্ঘ দেড় দশক পরে ৯টি গল্প দিয়ে প্রকাশিত হলো লায়লা রাগিবের ‘অসমাপ্ত ডায়েরি’। দুটি গল্প আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।এ গল্পগুলো অভিশাপ পত্রিকায় প্রকাশিত।
চতুর্থ গ্রন্থ ‘নিড়াঙ্গনে পাখি’ (প্রবন্ধ)।১৯৮৬ সালে জুলাই মাসে কবির মৃত্যু অল্প কয়েকদিন পর প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে কবি লায়লা রাগিবের পরিপক্ব লেখনির বহিঃপ্রকাশ মিলে। ১৫টি মৌলিক চিন্তাধারার নির্মাণ প্রবন্ধগুলো বিশেষ করে সুস্থ সুন্দর, সুশৃঙ্খল জীবন গঠনে আদর্শ নারীদের ভূমিকা, আধুনিক সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে সাহিত্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়গুলো লেখক তুলে ধরেছেন নানা আঙ্গিকে। সবকটি প্রবন্ধ সুখপাঠ্য, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা কথামালা।
কবি লায়লা রাগিবের অগ্রন্থিত লেখাগুলো ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সালে প্রফেসর নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত ‘লায়লা রাগিব রচনা সমগ্র’ নামে একটি মলাটে প্রকাশিত হয়েছে। বলা যায় এটি একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। লায়লা রাগিব সাহিত্য কর্মের জন্য ১৯৭৩ সালে ফেনী থেকে প্রকাশিত মহিলা পত্রিকা ‘কঙ্কন’ প্রবর্তিত ‘শহিদুল্লাহ কায়সার সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করে সাহিত্যক্ষেত্রে একটি প্রতিবাদী প্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে কবিতার জন্য ‘বিএনএসএ’ ইংল্যান্ড তাকে মরণোত্তর স্বর্ণপদক প্রদান করে।
কবি লায়লা রাগিব লিখেছেন,
‘আগরের সুগন্ধি পেলেই/
আমি মৃত্যুর হিম শীতলতা/ অনুভব করি।
এ গন্ধ কেন যে আমায়/ দুনিয়া ছাড়ার কথা/
ভাবিয়ে তুলে জানিনা।
চোখের সামনেভাসে/ লোবানের ধূপসাদা কাফন/ শোকাচ্ছন্ন মানুষের মুখাবয়ব/
শেষ বহনের খাটিয়া।’
উপরোক্ত কবিতা পাঠে কবির ভাবনায় ওপারে চলে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। হয়তো আঁচ করতে পেরেছিলেন।
লায়লা রাগিবের মৃত্যুর খবরে গণমানুষের কবি দিলওয়ার লিখেছেন- ‘তেমনি এক লেখিকা লায়লা রাগিব মাত্র ত্রিশটি বসন্তের উদয়আস্ত দেখা শেষ করেই যাকে চলে যেতে হল চিরন্তন উত্তরাধিকারের সন্ধানে। সত্য কথা বলা যদি ঐশী লোকের কোনরূপ ধ্রুপদী সংগীতের আলাপের সমান হয়, কল্যাণিয়া লায়লার মধ্যে সেরূপ এক আলাপের তীক্ষè তাগীদ ছিল।’
মৃত্যু কিছুদিন আগে কবির লেখা জীবনের শেষ চিঠিটি পড়ে অশ্রুসজল হয়ে উঠে আমার চোখ। হিমশীতল হওয়ার মতো লেখা। একেক করে জীবনের সকল লেনাদেনা, ভালোবাসা দিনগুলোর ছবি, স্বামী, পরিবার, সন্তানদের বর্তমান ভবিষ্যত, লেখক স্বামীর কাছে শব্দের শৈল্পিক ভঙ্গিমায় হৃদয়ের ব্যাকুল কথাগুলো তুলে ধরা, বুক ভরা কষ্ট আর যন্ত্রণার পাহাড় নিয়ে কবির লেখার নিপুণতা, আবেগময় বর্ণনা
পড়ে মনে হয় এ চিঠিই যেনো সহজিয়া ছন্দের কবিতা কিংবা গল্প নতুবা জীবনের নতুন মোড় নেওয়া উপন্যাসের অংশ।
কবি লায়লা রাগিব ১৯৮৬ সালে ৯ জুলাই ইন্তেকাল করেন। মাত্র ছয় বছরের সংসার জীবনে সবাইকে আপন করে নিতে পারা এই নারী নক্ষত্র পরপারে পাড়ি জমান মাত্র ৩০ বছর বয়সে। মৃত্যুকালে একমাত্র কন্যা রুবায়েত হাসিনা চৌধুরী জুমার বয়স ছিল তিন বছর আর একমাত্র পুত্র লবিদ হোসেন চৌধুরীর বয়স ছিল মাত্র এক বছর। কন্যা এবং পুত্র এখন বিবাহিত ও স্বস্ব অবস্থানে বিকশিত। জামাতা আ্যাডভোকেট জিয়াউর রহিম শাহীনও একজন সুলেখক।
১৯৮৬ সালের ১০ আগস্ট লায়লা রাগিব স্মরণে যে শোকসভা হয়, সম্ভবত সিলেটের সাহিত্যের ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে বড় শোকসভা। শোকসভার মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যক্ষ শ্রী কৃষ্ণকুমারপাল চৌধুরী। তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন-মৃত লায়লা জীবিত লায়লা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।
কবি নিজের কবিতা সম্পর্কে যে সত্যটুকু অকপটে বলে গেছেন, ‘একদিন বিশ্ব সাহিত্যে কালের ধোপে/ কবিতা আমার কথা কয়ে উঠবে/ আমি টিকে থাকবো জন্মাবদি জনমনে/ চির আদৃত চিরনন্দিত হয়ে/ তেমন উচ্ছ্বাভিলাষ বা উচ্চাকাঙ্খায়/ আবৃত হয়ে আমি তো কাব্য সাধনায় নিমগ্ন হইনি।’
কবিতা সম্পর্কে কবি সঙ্কোচ প্রকাশ করলেও বিবর্তনে লায়লা রাগিবের রচনাশৈলীর ব্যাপকতা বর্তমান প্রজন্মের ঠোঁটে তুলে ধরার অপরিহার্যতা রয়ে গেছে।
কবি লায়লা রাগিবের উত্তরসূরী হিসেবে সিলেটের নারী লেখকদেরও তার মতো এগিয়ে আসতে হবে। কবি লায়লা রাগিব আমাদের প্রেরণার বাতিঘর। ৪০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে কবি লায়লা রাগিবের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আমরা তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সিলেট লেখিকা সংঘ।



